হরিরামপুরে ইছামতী নদীর একাল সেকাল

জ.ই.আকাশ, হরিরামপুর (মানিকগঞ্জ) : বাংলাদেশ নদী মাতৃক দেশ। তার মধ্য অন্যতম একটি নদীর নাম ইছামতী। এই ইছামতী নদী দেশের বিভিন্ন জেলায় বিস্তৃত রয়েছে। এটি মানিকগঞ্জের পদ্মা যুমনা অববাহিকায় প্রবাহিত অন্যতম শাখা নদী হিসেবে পরিচিত। এক সময়ের রমরমা ভরা যৌবনা প্রমত্ত এ নদীটির একটি অংশ, মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার বাহাদুরপুর পয়েন্টে পদ্মা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। এই ইছামতী নদী দিয়েই এক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এ উপজেলার হাটবাজারগুলোতে মালামাল আনা নেয়া হত। হাজার মন মাল বোঝাই বড় বড় নৌকায় পাল তুলে, মাঝি মল্লারা সাড়ি গান গাইতে গাইতে ছুটে চলতো দূরদূরান্তে। কিন্তু এখন আর মাঝি মল্লার মুখে শোনা যায় না কালজয়ী সেই ভাটিয়ালি গান, “মন মাঝি তোর বইঠা নেরে আমি আর বাইতে পারলাম না”। দেখা যায় না, বিভিন্ন রঙবেরঙের পাল উড়ানো সেই হাজার মন মাল বোঝাই বড় বড় নৌকা (ছান্দি নৌকা)। এখন আর চোখে পড়ে না, জোসনা রাতে নদীর বুকে, মৃদু ঢেউয়ে দোল খাওয়া, ছোট্ট ছোট্ট সেই ডিঙ্গি নৌকা। নাব্যতার অভাবে হারিয়ে গেছে এ অঞ্চলের অন্যতম বিনোদন ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ। এক সময় বর্ষা মৌসুম আসতেই না আসতেই গ্রামের মানুষগুলো অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনতো কবে কোথায় নৌকা বাইচের আয়োজন করা হবে। এই নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করেই দূরান্ত থেকে ছুটে আসা দর্শনার্থীদের মন মাতানো মিলন মেলায় পরিণত হত। কিন্তু কালের বিবর্তনে গ্রামীন জনপথ উন্নয়নের পাশাপাশি এবং নদীর নাব্যতা হ্রাসে হারিয়ে গেছে গ্রামাঞ্চলের সর্বকালের সাংস্কৃতিক বিনোদন ঐতিহাসিক নৌকা বাইচ। এছাড়াও রাস্তা ঘাট আধুনিকায়নের ফলে এ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি বড় বড় খাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, বিল বাওড়ে মিঠাপানির মাছও এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। ফলে গ্রীষ্মকালে মিঠা পানির মাছ যেন এ অঞ্চলের মানুষের কাছে সোনার হরিণ।
আশির দশকের প্রমত্ত ইছামতির নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় এখন নদীর বুকে অনেক জায়গায় চলছে চাষাবাদ।
অথচ নব্বই দশকের গোড়ার দিকেও এ নদীটি ছিলো উত্তাল ভরা যৌবনা। একটু বাতাসেই নদীর বুকে ঢেউয়ে আচড়ে পরত ছোট বড় মাঝারি আকারের নৌকা। কালে কালে নদীর বুকে পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়ায় নাব্যতা হ্রাস পায়। ফলে ইছামতী হারিয়ে ফেলে তার আপন সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য। নাব্যতা সংকটে নদীর তলদেশে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় নদী তীরবর্তী এলাকার কৃষকেরাও চাষ করতে পারছেন না ইরি ও বোরো ধান।
এতে করে দিনে দিনে ধান চাষে অনেকটাই বিমুখ হয়ে পড়েছে নদী তীরবর্তী এলাকার কয়েক হাজার কৃষক।
মানিকগঞ্জ জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাইন উদ্দিন জানান, “ইছামতী নদীর নাব্যতা সংকটে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। এর ফলে হরিরামপুরের বাহাদুরপুর থেকে শিবালয়, ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলার শেষ সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ৩৮ কিলোমিটার নদী খননের কাজ করা হয়।”
এতে নদীর বিভিন্ন স্থানের প্রস্থতা ও তলদেশের গভীরতার ওপর নির্ভর করে খননের কাজ করা হয় বলেও তিনি জানান।
তবে এতেও যেন আশানুরূপ নদীটির নাব্যতা রোধ হয়নি। ফলে চলতি মৌসুমেই দেখা যায়, বর্ষার পানি চলে যেতে না যেতেই অনেক জায়গায় পানি শূণ্য হয়ে নদীর বুকে চর পড়ে গেছে। এতে করে বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট বাশের সাকো নির্মান করা হয়েছে নদী পারাপারের জন্য। কোথাও কোথাও নদীর দুপারে ফসলের চাষ করা হয়েছে এমন দৃশ্যও নজরে পড়ে।
দেশের নদ-নদীর তথ্যানুযায়ী জানা যায়, এই ইছামতি নদী বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। নদীটি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। যার দৈর্ঘ্য ৩৩৪ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ৩৭০ মিটার।
এই ইছামতী নদী বাংলাদেশের উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের মানিকগঞ্জ, ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জ জেলার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। যার দৈর্ঘ্য ১২৯ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৭২ মিটার।
বাংলার বিখ্যাত বারো ভূঁইয়ার অন্যতম ঈশা খাঁ’র নামানুসারেই এই ইছামতী নদীর নামকরণ করা হয় বলেও জানা যায়।
এখন কৃষিকে রক্ষার পাশাপাশি মিঠা পানির মাছের চাহিদা পূরণ করতে এবং ইছামতীর ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে ধারাবাহিক খননের বিকল্প নেই বলে দাবী করেন এলাকাবাসী।




