
ফাহিমা আক্তার সুমি : সোহাগী সামিয়া। নিরাপদ সড়কের দাবি আদায়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সামনে থেকে। নানা স্লোগানে মুখরিত করেন রাজপথ। তার অগ্নিঝরা স্লোগানে উদ্দীপ্ত হন সহপাঠীরা। ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে আসা সোহাগীকে নিয়ে নানা বিভ্রান্তিও ছড়ানো হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এসব উপেক্ষা করে তিনি আন্দোলনে অটল। জানিয়েছেন- বিভ্রান্তি ছড়িয়ে তরুণদের কণ্ঠ রোধ করা যাবে না।
মানবজমিনকে সোহাগী জানিয়েছেন, মায়ের কাছ থেকেই প্রথমে শিখেছেন প্রতিবাদের এই ভাষা।
শৈশব- কৈশোর থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তার। অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেয়া তার রক্তে মিশে আছে। স্কুল জীবন থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছেন। দুই বোনের মধ্যে সোহাগী বড়। এইবার খিলগাঁও মডেল কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন তিনি। বাবা শামসুল হক ব্যবসায়ী। ঢাকার রামপুরায় পরিবারের সঙ্গে থাকেন তিনি। নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় যুক্ত হন রাজনীতিতে। তিনি সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের ঢাকা মহানগরের দপ্তর সম্পাদক। সেখান থেকে বিভিন্ন যৌক্তিক আন্দোলনে রাজপথে নেতৃত্ব দেন। ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় রাজপথে নেমেছিলেন।
সোহাগী সামিয়া বলেন, আমাকে নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে নানা গুজব রটানো হচ্ছে। আমার পরিচয় নিয়ে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। আমি নাকি শিক্ষার্থী নই, আমি বহিরাগত, আমার বয়স নাকি ৩০ বছর, আমি নাকি আন্দোলনে উস্কানি দিচ্ছি। এসব মিথ্যা কথা। আমি এবার খিলগাঁও মডেল কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। আমি সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের ঢাকা মহানগরের দপ্তর সম্পাদক। তবে আমি নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দেইনি। আমি শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনে নেমেছি। আমাকে নিয়ে এসব কথা যারা বলছেন তাদের বলতে চাই, এভাবে মিথ্যা কথা বলে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না। রাজনীতি করি এগুলো সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি করার কিছু নেই। আমি নিজেই বুক ফুলিয়ে গর্ব করে বলছি হ্যাঁ আমি ছাত্রফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত। এখানে তাদের সমস্যাটা কোথায়? তারা বলেছে- আমি বাম রাজনীতি করি এটা মিথ্যা কিছু বলেনি, কিন্তু তারা বলছে- আমি ছাত্রী নই এটা ভুল বলেছে। এই ভুল বলার পেছনে তাদের বড় একটি উদ্দেশ্য আছে। তারা তাদের উদ্দেশ্য অনুযায়ী কাজ করবে আর আমরা আমাদের উদ্দেশ্য অনুযায়ী নিরাপদ সড়কের দাবিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাবো। এভাবে উস্কানিমূলক কথা বলে আমাদের কণ্ঠস্বর রোধ করা যাবে না।
তিনি বলেন, পরপর সড়কে দুই শিক্ষার্থী মারা যাওয়ার পর ৩০শে নভেম্বর থেকে এই আন্দোলন শুরু করেছি- এখনো অব্দি চলছে। প্রতিনিয়ত সড়কে মানুষ মারা যাচ্ছে। প্রতিবন্ধকতার তো শেষ নেই। অনেকে অনেক ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে, অপপ্রচার চালাচ্ছে। কোনো কিছু না পেয়ে আমার পেছনে লাগছে আন্দোলনটাকে নষ্ট করার জন্য। অনেকে চায় না আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাই। আমাদের দাবি পূরণ করি। এই মহলটি কারা? কি উদ্দেশ্য এমন করছে? ২০১৮ তেও আমি ছিলাম। তখন সবে মাত্র দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করি। আমি সংগঠন করি ২০১৭ সাল থেকে। তখন আমি খুব ছোট। সংগঠনও আমাকে প্রতিবাদের ভাষা শেখায়। তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। রাজপথ থেকে কীভাবে প্রতিবাদী হতে হয় সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট তা আমাকে শিখিয়েছে। এটার পেছনে বড় একটা অবদান আমার সংগঠনের।
সোহাগী বলেন, আন্দোলনের শুরু থেকেই পরিবারের সদস্যসহ আমাকে বিভিন্ন ভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে। খিলগাঁওয়ের একটি মহল আমার আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিত সবাইকে ধরে ধরে জিজ্ঞেস করছেন আমি কোথায় থাকি? এরপর তারা অনেকে বলছে আমার নামে মামলা করবে, আমাকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাবে। আমার ফোনে মেসেজের মাধ্যমে বিভিন্ন হুমকি বার্তা পাঠানো হচ্ছে। আমাকে রাস্তায় ধরে মারবে- একথাও লিখে পাঠানো হচ্ছে। এমন হুমকি ধমকি প্রতিনিয়ত পাচ্ছি। এমনকি আমার সংগঠনের যারা আছেন তাদেরকেও হুমকি দেয়া হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের প্রতিও মামলা করার হুমকি দেয়া হচ্ছে। আন্দোলনে বাধা আসবেই। যুগে যুগে যত যৌক্তিক আন্দোলন হয়েছে বাধা ছাড়া কোনো আন্দোলন সফল করা সম্ভব না। আমরাও বাধার সম্মুখীন হচ্ছি। বাধাগুলোকে আমরা মোকাবিলা করবো। শিক্ষার্থীরা সবাই মিলে প্রতিহত করবো। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ও রাস্তায় যে লুটপাট ও দুর্নীতি হয়েছে এর বিরুদ্ধে আমরা কর্তৃপক্ষকে লাল কার্ডও দেখিয়েছি।
মাকে সরাসরি ফোন দিয়ে অপরিচিত একজন বলে, আপনার মেয়ের নামে মামলা হবে। তখন আমার মা বলে মামলা করে দেন। আমার মেয়েকে আমি যৌক্তিক আন্দোলন থেকে ফিরে আসতে বলবো না।
সোহাগী বলেন, দেশের রাস্তাগুলো মারাত্মক বিপজ্জনক। আমরা যখনই বের হচ্ছি দেখি কোথাও আসলে কোনোরকম শৃঙ্খলা নেই। বেপরোয়া ভাবে গাড়ি চালাচ্ছে। সেটা শুধু বাসচালক নয়, যেকোনো গাড়ির চালকই এই কাজটা করছে। চালক, ট্রাফিক পুলিশ থেকে শুরু করে সড়কের সঙ্গে সরাসরি যারা যুক্ত একদম গোড়া থেকে সব জায়গায় দুর্নীতি। আমাদের ১১ দফা যে দাবি আছে তা কেন্দ্র করে সড়কে যত ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি হয় সেগুলোর বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। চালকদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামাগার দিতে হবে। এগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে আমার মনে হয় সড়কে শৃঙ্খলা চলে আসবে। চালকদের লাইসেন্স না থাকায় তাদের দোষ দেয়া যাবে না। তারা দারিদ্র্যতার সঙ্গে দিনাতিপাত করে। তাদের দারিদ্র্যতার সুযোগ নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। যে প্রতিষ্ঠানগুলো লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ দিবে তারা এই সুযোগে নিচ্ছে। চালকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।
আন্দোলনের সফলতা সম্পর্কে সোহাগী বলেন, দুর্নীতি, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনা তো একদিনে তৈরি হয়নি। আন্দোলন যদি না চালানো হয় তাহলে প্রথাটাও ভাঙা যাবে না। মালিক সমিতি সারা দেশে মহানগরগুলোতে হাফ পাস নিশ্চিত করেছে। যেটা আগে ঢাকাতেও নিশ্চিত ছিল না। আমরা মনে করছি সেটা আন্দোলনের কারণেই হয়েছে। তারা আরও বলেছেন, জানুয়ারিতে চালকদের ডোপ টেস্ট করানো হবে। এই ডোপ টেস্টটা আমরা আমাদের ১১ নম্বর দাবিতে রেখেছি। তার মানে আমাদের আন্দোলনের কারণে এই উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আমি মনে করি আন্দোলন যদি দীর্ঘায়িত করা হয় তাহলে আমাদের ১১ দফা দাবিও সফল হবে। যতদিন আমাদের দাবি পূরণ না হবে ততদিন আন্দোলন চালিয়ে যাবো।
আন্দোলনের কারণে পড়াশোনায় কোনো প্রভাব পড়ছে কিনা সে সম্পর্কে তিনি বলেন, পড়াশোনা ঠিক রেখে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। আন্দোলন আমার রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। আমার প্রতিষ্ঠান থেকে আমাকে শিক্ষকরা কোনো বাধা দিচ্ছেন না বরং অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন। কিন্তু অন্যদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা অনেককে বাধা দিচ্ছেন। ভবিষ্যতে আমি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকবো। সমাজের সকল কাজে অংশগ্রহণ করবো। পাশাপাশি আমি শিল্পী হতে চাই। গান গাইতে অনেক ভালোবাসি। এই গানকে জনগণের জাগরণে কাজে লাগাবো।
সরকার এবং প্রশাসনের কাছে আমাদের একটাই চাওয়া- ১১ দফা দাবি যেন দ্রুত মেনে নেন। এবং আপামর জনগণের প্রতি আহ্বান জানাই, তারা যেন আমাদের অনুপ্রেরণা দেন। আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদেরও সমর্থন আশা করছি। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
মানবজমিন




