দুর্গম চরাঞ্চলের মেধাবী মুখ আমির হামজার গল্পগাঁথা

জ.ই.আকাশ, হরিরামপুর(মানিকগঞ্জ)প্রতিনিধি :উপমহাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে চমক দেখালেন মানিকগঞ্জ জেলার অন্যতম পদ্মা অধ্যুষিত হরিরামপুর উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলের বাগডাঙ্গী বসন্তপুর গ্রামের এক হতদরিদ্র পরিবারে অদম্য মেধাবী ছাত্র আমির হামজা। তিনি চলতি বর্ষে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪তম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গ’ ইউনিটে ২৫৩ তম এবং ‘ঘ’ ইউনিটে ৬১তম মেধা তালিকায় স্থান লাভ করেন। তার এই সাফল্যে পরিবারসহ এলাকাবাসী গর্বে আনন্দিত ও উৎফুল্ল।
জানা যায়, চরাঞ্চলের একমাত্র বিদ্যাপীঠ আজিমনগর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আমির হামজা ২০১৮ সালের অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে মানিকগঞ্জ বেগম জরিনা ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হন। সেখানে ২০২০ সালে করোনাকালীন সময়ে সকল পরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অটোপাশের মাধ্যমে গ্রেট পয়েন্ট ৪.৫০ পেয়ে বানিজ্য বিভাগ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। পরবর্তীতে বিশ্ববদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুটো বিশ্ববিদ্যালয়েই মেধা তালিকায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তির সুযোগ পাম তিনি। আমির হামজার এই সাফল্যের কথা জানতে চরাঞ্চলের বাগডাঙ্গী বসন্তপুর গ্রামে তার বাড়িতে গিয়ে জানা যায় তার শিক্ষা জীবনের এক করুণ গল্পগাঁথা।
আমির হামজা চরাঞ্চলের এক হতদরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মৃত কুব্বাত আলী। মা মইফুল বেগম। বাবা পেশায় ছিলেন দিন মজুর। ৩ ভাই ২বোনের মধ্যে আমির হামজা সবার ছোট। মাত্র ২ বছর বয়সে বাবা হারায় আমির হামজা। মা মইফুল বেগম স্বামীর মৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করে ৫ সন্তানকে মানুষ করতে সংসারের হাল ধরেন। শুরু হয় তার জীবনযুদ্ধ। মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে, রাস্তায় রাস্তায় মাটি কেটে খেয়ে না খেয়ে সন্তানদের লালন পালন করেন। ২ মেয়েকে বিয়ে দেন। টাকার অভাবে আর কোনো ছেলেমেয়েকে তিনি প্রাইমারীর বেশি পড়াতে পারেননি। তবে আমির হামজা ছাত্র ভাল হওয়ায় তার পড়াশোনা বন্ধ করেননি। আমির হামজাও পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কামলা দিয়েছেন। বিভিন্নজনের দ্বারে দ্বারে হাত পেতেছেন পড়াশোনার খরচ চালাতে। মানিকগঞ্জে বেগম জরিনা ডিগ্রি কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি দুএকটা টিউশনি করলেও করোনাকালীন সময়ে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তার সে আয়ের পথও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে গ্রামে এসে চরে বিভিন্ন বাড়িতে সে কামলা দেয়। বড় ২ ভাই বিয়ে করে ভিন্ন সংসার করে। তারাও দিনমজুরের কাজ করে। নিজের বৌ বাচ্ছার খরচ জুটিয়ে মা কিংবা ছোট ভাইয়ের খরচ চালাতে পারে না। তাই বাধ্য হয়েই মা মাটি কেটে এবং আমির হামজা দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতো এবং পড়াশোনার টাকা জোগার করত। নিজের যখন খরচ চালাতে একেবারেই কষ্ট হতো তখন অন্যের কাছে সহযোগিতা চাইতো। এভাবেই বেড়ে ওঠে দুর্গম চরাঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থী আমির হামজা।
আমির হামজার মা মইফুল বেগমের কাছে জানতে চাইলে ছল ছল নয়নে বলেন, “আমির হামজার মাত্র ২ বছর বয়সে হাপানির রোগে ওর বাবা মারা যায়। তারপর থেকে ছোট পাঁচটা ছেলেমেয়ে নিয়া কিভাবে যে চলছি, তা একমাত্র ওপরে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেনা। রাস্তায় মাটি কাইটা খাইয়া না খাইয়া ওরে পড়াশোনা করাইছি। অনেকেই ওর খরচ দিয়া সাহায্যও করছে। আইজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাইছে। এ গর্ব আমার একার না, পুরা চরবাসীর গর্ব। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ চালানো আমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই আমি সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।”
আমির হামজা আবেগে আপ্লূত হয়ে বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়াটা ছিল হাজারটা স্বপ্নের মধ্যে একটা দুঃস্বপ্ন। যা কখনও কল্পনাই করি নাই। আল্লাহর কাছে কোটি কোটি শুকরিয়া। তবে সমাজের বিত্তবানদের কাছে আমি একটু সহযোগিতা কামনা করছি। আমি যদি ভালো কোনো জায়গায় যেতে পারি, আমার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারি, তবে আমাকে মানুষজন এতোদিন যেভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, তদ্রুপ আমিও যেন ভবিষ্যতে কাউকে না কাউকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারি। এজন্য আমি সকলের সহযোগিতাসহ দোয়া কামনা করছি।”
আজিমনগর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী আসমা আক্তার জানায়, “আমির হামজা ভাই আমাদের বিদ্যালয়সহ পুরো চরাঞ্চলের গর্ব এবং অহংকার। আমরা যেন তার মতো এই বিদ্যালয় এবং চরাঞ্চলের সুনাম ধরে রাখতে পারি।”
সহকারি শিক্ষক দিলীপ কুমার রায় বলেন,
“আমির হামজা আসলে একটা জিনিস প্রমাণ করেছে যে, মানুষের ইচ্ছা শক্তি থাকলে সবকিছু জয় করতে পারে। ওর সামনে আরও ভাল ছাত্র ছিল। তারা হারিয়ে গেছে। কিন্তু ওর টার্গেট ও ধরে রাখতে পেরেছে বলেই আজ ও সফলকামী হতে পেরেছে এবং দেশের সর্বাচ্চ বিদ্যাপীটে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছে।”
প্রধান শিক্ষক চৌধুরী আওলাদ হোসেন বিপ্লব জানান, যখন থেকে আমির হামজা আমাদের বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তখন ওর মেধা দেখেই আমরা ওকে টার্গেট করে পড়াশোনা করাই। আমাদের লক্ষ উদ্দেশ্যই ছিল যে, আমির হামজা যেন একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছেতে পারে। সে জন্য আমরা শুরু থেকে ওর প্রতি বিশেষ নজর রাখি এবং পড়াশোনা করাই। নিতান্তই হতদরিদ্র পরিবার থেকে আসা আমির হামজা। ওর মধ্যে যে উদ্দীপণা ছিল আমরা সেটাকে কাজে লাগাতে পেরেছি। যার ফলশ্রুতিতে আজ সে দেশের দুটি শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে চান্স পেয়েছে। আমরা আশা করব এখানেই শেষ নয়, সে যেন ভবিষ্যতে সরকারি কোনো উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসে।”
বিদ্যালয় পরিচালনা পর্যদের সভাপতি হান্নান মৃধা জানান, “এই চরাঞ্চলের ছেলেমেয়ের শিক্ষার সুবিধার্থে ২০০৩ সালে এডিপি’ র সহযোগিতায় এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করি। ফলে দুর্গম চরাঞ্চল হওয়া স্বত্ত্বেও এখানে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে পারছে। এখানকার অনেক ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হয়ে বিভিন্ন স্থানে আছে। সদ্য আমাদেরই বিদ্যালয়ের ছাত্র আমির হামজা। সে একেবারে দরিদ্র পরিবারের ছেলে। বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও চান্স পেয়েছে। এটা ওর পরিবারসহ সমগ্র চরবাসির গর্ব। আমাদের বিদ্যালয় থেকে ওকে পূর্বে অনেক সহযোগিতা করা হয়েছে। ওর জন্য যতটুকু সম্ভব আমার সহযোগিতা ছিল এবং এখনও থাকবে।”




