
রাজধানীর আদাবরে মাইন্ড এইড হাসপাতালে ভর্তি মানসিকভাবে অসুস্থ এক জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপারকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ তুলেছে পরিবার। তার নাম আনিসুল করিম শিপন। গতকাল সোমবার সকালে হাসপাতালটিতে ভর্তির পর কয়েক মিনিটের মধ্যেই মারা যান তিনি।
পরিবারের অভিযোগ, ভর্তির পরপর হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শিপনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে।
এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হাসপাতালের ব্যবস্থাপকসহ ছয়জনকে আটক করেছে। তবে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের দাবি, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করায় মৃত্যুর আগে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন তারা।
আনিসুল করিম শিপন ৩১তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ৩৩তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। এক সন্তানের জনক এই পুলিশ কর্মকর্তা সর্বশেষ বরিশাল মহানগর পুলিশে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়ায়।
আনিসুল করিমের ভাই রেজাউল করিম বলেন, পারিবারিক ঝামেলার কারণে তার ভাই মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা (পরিবারের সদস্যরা) তাকে (শিপন) নিয়ে মাইন্ড এইড হাসপাতালে যান। কাউন্টারে যখন ভর্তির ফরম পূরণ করছিলেন, তখন কয়েকজন কর্মচারী তাকে দোতলায় নিয়ে যান।
এর কিছুক্ষণ পর তাদের জানানো হয় আনিসুল অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। এরপর তারা তাকে দ্রুত হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা করে শিপনকে মৃত ঘোষণা করেন।
শিপনের মৃত্যুর পর মাইন্ড এইড হাসপাতাল থেকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। সেখানে দেখা যায়, বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটের দিকে পুলিশ কর্মকর্তা শিপনকে টানাহেঁচড়া করে একটি কক্ষে ঢোকানো হয়। তাকে হাসপাতালের ছয়জন কর্মচারী মিলে মেঝেতে ফেলে চেপে ধরে। এরপর নীল পোশাক পরা আরও দুজন কর্মচারী তার পা চেপে ধরে। এ সময় মাথার দিকে থাকা দুজন কর্মচারী হাতের কনুই দিয়ে শিপনকে আঘাত করছিল। হাসপাতালের ব্যবস্থাপক আরিফ মাহমুদ তখন পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সবশেষে একটি নীল কাপড়ের টুকরা দিয়ে শিপনের হাত বাঁধা হয়। চার মিনিট পর যখন উপুড় করা হয়, তখনই তার শরীর নিস্তেজ ছিল। একজন কর্মচারী তখন শিপনের মুখে পানি ছিটায়। তাতেও তিনি নড়াচড়া করছিলেন না। এরপর কর্মচারীরা কক্ষটির মেঝে পরিষ্কার করে। সাত মিনিট পর সাদা অ্যাপ্রোন পরা একজন নারী ওই কক্ষে প্রবেশ করে। ১১ মিনিটের মাথায় কক্ষটির দরজা লাগিয়ে দেওয়া হয়। ১৩ মিনিটের মাথায় শিপনের বুকে পাম্প করেন ওই নারী।
রেজাউল করিম বলেন, তার ভাইয়ের রক্তচাপজনিত সমস্যা ছিল। কিছুটা হৃদরোগও ছিল। কিন্তু এ দুটির কোনোটিই প্রকট ছিল না। হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পিটুনিতেই তার ভাই শিপনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন রেজাউল।
পুলিশ কর্মকর্তা শিপনের মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানে আলম মিয়া বলেন, ‘হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের খাতায় লেখা রয়েছে ‘ব্রট ডেড’। অর্থাৎ সেখানে নিয়ে আসার আগেই তার (শিপন) মৃত্যু হয়েছিল। ’
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মৃত্যুঞ্জয় দে বলেন, ‘আনিসুলের মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাসপাতালের ছয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আটক করা হয়েছে। ’
আর মাইন্ড এইড হাসপাতালের সমন্বয়ক মো. ইমরান খান বলেন, ‘পুলিশ কর্মকর্তাকে জাতীয় মানসিক ইনস্টিটিউট থেকে আমাদের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। ভর্তির সঙ্গে সঙ্গেই তিনি খুব উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করছিলেন। একে-ওকে মারধর করছিলেন। তাকে শান্ত করার জন্য ওই কক্ষটিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ’
ঘটনার সময় তিনি হাসপাতালে ছিলেন না উল্লেখ করে ইমরান বলেন, ‘ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলেই জানা যাবে প্রকৃতপক্ষে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে। ’




