সিঙ্গাইরের “পান বাবু”: এক চেয়ারেই ১৬ বছর

আব্দুর রাজ্জাক, মানিকগঞ্জ: প্রকৃত নাম নিখিল চন্দ্র শীল হলেও সিঙ্গাইরবাসি তাকে পানবাবু নামেই চেনেন। কারণ সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের অফিস সহকারি কাম কম্পিউটার অপারেটরের ঘুষের পরিমাণ শুরু হয় পান দিয়ে। তার কাছে কেউ এলে অন্তত পানের টাকা না দিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান না। হাট বাজার ইজারা, দরপত্রের জামানত গ্রহণ ও উত্তোলনে উৎকোচ গ্রহণ, সরকারি বিশেষ কর্মসূচী ও জাতীয় দিবস উদযাপনের জন্য বিশেষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে লুটপাটসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পানবাবুর দীর্ঘ ১৬ বছরের চাকরিজীবনে ১৫জন উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসেছেন-গেছেন। কিন্তু তিনি রয়েছেন বহাল তবিয়তে। ভুক্তভোগিরা জানতে চান, পানবাবুর এতো ক্ষমতার উৎস কী?
“শ্বশুর বাড়ি মধুর হাড়ি”- প্রাচীনকাল থেকে মানুষের মুখে মুখে চলে আসা এ প্রবাদ বাক্যটিকে যথার্থতা দিতে যেন প্রাণপন চেষ্টা করছেন নিখিল চন্দ্র শীল। তবে এই নিখিল শ্বশুর বাড়িতে মধুর হাড়ি পেয়েছেন কিনা তা জানা না গেলেও মানিকগঞ্জের সিংগাইরে মধুর জ্বলা পেয়েছেন ঠিকই। নিখিল কোন অদৃশ্য শক্তির জোরে দীর্ঘ ১৬ বছর একই পদে বহাল আছেন। তা নিয়ে সিংগাইরবাসীর মধ্যে কৌতুহলের যেন শেষ নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, নিখিলের এ দীর্ঘ চাকুরীকালে ১৫ জন উপজেলা নির্বাহী অফিসার বদল হয়েছেন। কিন্তু তিনি রয়েছেন বহাল তবিয়তে। তিনি শক্ত খুঁটি গেরে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নিখিল চন্দ্র শীল গত ১৯৯৯ ইং সালের ১৪ ডিসেম্বর অফিস সহকারি কাম কম্পিউটার অপারেটর (গোপনীয় সহকারি) পদে চাকুরীতে যোগদান করেন। তারপর থেকেই একই কর্মস্থলে দাপটের সঙ্গে চাকুরী করছেন। দীর্ঘ ১৬ বছরের চাকুরীকালীন সময়ে তার ৩ বার বদলী হয়েছে। কাজের কাজ হয়নি কিছুই। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একই কর্মস্থলে ৩ বছর পর্যন্ত থাকা গেলেও নিখিলের ১৬ বছর চলমান এখন উপজেলার সরকারি অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে গলার কাটা। কর্মস্থলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। প্রতিবছর বিভিন্ন হাট বাজার ইজারা, দরপত্র থেকে শুরু করে জামানত গ্রহণ ও উত্তোলনে উৎকোচ গ্রহণ, সরকারি বিশেষ কর্মসূচী ও জাতীয় দিবস উদযাপন গুলোতে বিশেষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে লুটপাট এবং সরকারি কোয়ার্টারে সাব-লেটের রমরমা ব্যবসার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সরকারি ভবনের সংস্কার কাজ এমনকি উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার সময় আসামীদের কাছ থেকে তার ব্যক্তিগত ফি বাবদ জনপ্রতি পাঁচশ থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়ার অসংখ্য ঘটনা এখন জনগনের মুখেমুখে।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, নিখিল চন্দ্র শীল তিনি সামান্য অফিস সহকারি কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকুরী করে মানিকগঞ্জ জেলা শহরের জয়রা রোডে ৫ শতাংশ জমি ক্রয় করে নির্মানাধীন ৫তলা ভবনের ৩ তলা সম্পন্ন করেছেন। এছাড়াও নামে বে-নামে সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন। তার কাছে সিংগাইরবাসী রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার অভিযোগ করে বলেন, ইউএনও অফিস চালাচ্ছেন নিখিল বাবু। তার সাথে থাকা পানের কৌটায় অথবা পান খাওয়ানোর নামে পানের খিলিতে টাকা না পড়লে কোন ফাইল নড়ে না। জনশ্র“তি রয়েছে কেউ উনার কাছে গেলে পানের টাকাটা হাতিয়ে নিতে কখনই ভুলে যান না। এজন্য তাকে পানের খিলি বা পান বাবু বলে অভিহিত করেন। অনেকে তাকে দেখলে গানের টানে বলেন, “যদি সুন্দর একটা লোকও পাইতাম, সদর ঘাটের পানের খিলি তারে বানায় খাওয়াইতাম”. অতি ক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উধর্ক্ষতন কর্তৃপক্ষের কাছে তার বদলী দাবী করছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযুক্ত নিখিল চন্দ্র শীলের কাছে এ সংক্রান্তে জানতে চাওয়া হলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে বলেন, আমি যাই করি না কেন আপনার সঙ্গে তো কোন বেয়াদবি করিনি। আমার মেয়েটা ক্লাস নাইনে পড়ে। এ সময় আমার কোন ক্ষতি করবেন না প্লিজ।
সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমার জানামতে নিখিলের মতো অনেকেই উপজেলার অন্যান্য অফিসে একই কর্মস্থলে ২০ বছর যাবৎ কর্মরত আছেন। তার অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয় আমার জানা নেই। বদলী করা উধর্ক্ষতন কর্তৃপক্ষের ব্যাপার।
এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস বলেন, উনি কি এখনও ইউএনও অফিসে আছেন ! আচ্ছা, আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি।




