মোহা: সফিকুল ইসলাম: শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। একটি জেলার উন্নয়ন, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা মানুষের জীবনমান সবকিছুর পেছনেই শিক্ষার ভূমিকা গভীর। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই সেই কাজটি করতে পারছে? চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে একটু গভীরভাবে তাকালে সাফল্যের পাশাপাশি এমন কিছু প্রশ্ন সামনে আসে, যেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। বিদ্যালয় ও কলেজের সংখ্যা বাড়ছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, পরীক্ষার ফলাফলও কোনো কোনো বছর আশাব্যঞ্জক হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত মান কি সেই অনুপাতে বাড়ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু পরীক্ষার ফলাফল দেখলে চলবে না; দেখতে হবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের উপস্থিতি, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, পাঠদানের মান, প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, অর্থেও ব্যবহার, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং সর্বোপরি শিক্ষার্থীর নৈতিক ও মানবিক বিকাশ।
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী কোথায়? শিক্ষার প্রথম শর্তই হলো শ্রেণি কক্ষে উপস্থিতি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বিদ্যালয়ে যাওয়া যেন কেবল পরীক্ষার আগে একটি আনুষ্ঠানিকতা। নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না হয়ে কোচিং বা প্রাইভেট নির্ভও শিক্ষাব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক। আবার শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির পাশাপাশি শিক্ষক উপস্থিতির প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক যদি নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে না থাকেন, কিংবা ক্লাসে থেকেও কার্যকর পাঠদান না করেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে শুধু একটি ভবনে পরিণত হবে। শিক্ষার প্রাণ হলো শ্রেণিকক্ষ; শ্রেণিকক্ষ নিষ্প্রাণ হলে সুন্দর ভবন, সাইনবোর্ড কিংবা পরীক্ষার ফলাফল কোনোটিই শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না। একটি প্রতিবেদনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ হিসেবে পর্যাপ্ত পাঠদান না হওয়ায় তাদের প্রাইভেট পড়তে হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রাইভেট ও কোচিং কি বিদ্যালয়ের বিকল্প? প্রাইভেট ও কোচিং এখন অনেক পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
অভিভাবকেরা সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর পাশাপাশি আবার আলাদা অর্থ ব্যয় করে একই বিষয় পড়াাতে বাধ্য হচ্ছেন এটি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি প্রশ্ন।যদি বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়ে একজন শিক্ষার্থী তার পাঠ বুঝে নিতে না পারে, তাহলে দায় শুধু শিক্ষার্থীর নয়; প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসন সবার। প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থী কি বিদ্যালয়ে শিক্ষা পাচ্ছে, নাকি বিদ্যালয়ের বাইরে শিক্ষা কিনতে বাধ্য হচ্ছে?
প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু জবাবদিহি কতটা? চাঁপাইনবাবগঞ্জে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ম অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের(ডিআইএ) তদন্তে জেলার ২৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এটি কোনো ছোট বিষয় নয়। কারণ একটি বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাৎ বা প্রশাসনিক অনিয়ম মানে শুধু একটি হিসাবের খাতা ভুল হওয়া নয়। এর প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীর ওপর। বিদ্যাললয়ের উন্নয়নের টাকা যদি যথাযথভাবে ব্যয় না হয়, তাহলে শ্রেণিকক্ষ, পাঠাগার, বিজ্ঞানাগার, খেলাধুলা, শিক্ষা সামগ্রী কিংবা শিক্ষার্থীদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সুতরাং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা কোনো অতিরিক্ত সৌন্দর্য নয়; এটি শিক্ষার মৌলিক শর্ত।
অভিযোগ উঠলেই অপরাধী নয়, তদন্তই শেষ কথা তবে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা জরুরি। কোনো শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, কর্মকর্তা কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী বলা যায়না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হবে, নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের ঘটনাই দেখায় যে অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। যেমন শিবগঞ্জে শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরু হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। আবার নাচোলের একটি বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়ার ঘটনাও সংবাদে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করবে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ, জনমত নয়।
পরীক্ষার ফলাফল কি শিক্ষার প্রকৃত মানের আয়না? এসএসসি বা এইচএসসির ফলাফল শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু এটিই শিক্ষার একমাত্র মাপকাঠি নয়।
একজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেলেই কি সে সৎ, মানবিক, দায়িত্বশীল ও যুক্তিবাদী নাগরিক হয়ে গেল?
উত্তর অবশ্যই নয়। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া দরকার, কিন্তু তার পাশাপাশি দরকার চিন্তা করার ক্ষমতা, প্রশ্ন করার সাহস, সত্য-মিথ্যা যাচাই করার অভ্যাস, অন্যের প্রতি সম্মান, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ। আজ আমরা পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে উল্লাস করি, কিন্তু শিক্ষার্থীর আচরণ, মূল্যবোধ ও মানবিকতার অবনতি নিয়ম কতটা আলোচনা করি?
চারিত্রিক অবক্ষয়ের সবচেয়ে বড় দিক হলো বর্তমান প্রজন্ম তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বড় হচ্ছে। হাতে স্মার্টফোন, সামনে অসীম তথ্যের ভার। কিন্তু তথ্য আর শিক্ষা এক জিনিস নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার,অশালীন কনটেন্ট, অনলাইন আসক্তি, সহিংসতার সংস্কৃতি, মাদক, কিশোর গ্যাং, পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের প্রবণতা এসবের বিরুদ্ধে পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু শিক্ষার্থীকে দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ একজন শিক্ষার্থী সমাজের বাইরে বেড়ে ওঠে না। সে পরিবার দেখে, শিক্ষক দেখে, রাজনীতি দেখে, সামাজিক আচরণ দেখে, চারপাশের দুর্নীতি দেখে। বড়রা যদি নিয়ম ভাঙাকে স্বাভাবিক করে তোলেন, তাহলে ছোটদের কাছ থেকে নৈতিকতা আশা করা কঠিন। শিশুকে আমরা যা বলি তার চেয়ে, সে আমাদের যা করতে দেখে তা অনেক বেশি শেখে।
শিক্ষকের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হবে শিক্ষকতা শুধু চাকরি নয়; এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে শিক্ষককেও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ, প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা দিতে হবে।
শিক্ষককে শুধু পরীক্ষার ফলাফলের জন্য দায়ী করলে হবে না। একজন শিক্ষককে জানতে হবে তার শিক্ষার্থী কেন ক্লাসে আসছে না, কেন পড়ার আগ্রহ হারাচ্ছে, কেন অনলাইনে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে, কেন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক যদি শুধু উপস্থিতি খাতা ও পরীক্ষার নম্বরে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে শিক্ষার মানবিক উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।
অভিভাবকের ভূমিকাও কম নয় অভিভাবকেরাও অনেক সময় সন্তানের ভালো ফলাফলকে শিক্ষার একমাত্র সাফল্য মনে করেন। সন্তান জিপিএ-৫ পেলেই যেন সব ঠিক। কিন্তু সন্তান মিথ্যা বলছে কি না, অন্যকে সম্মান করছে কি না, বই পড় ছে কি না, মানুষের কষ্ট বুঝছে কি না, সামাজিক দায়িত্ব পালন করছে কি না এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবককে সন্তানের ওপর শুধু ফলাফলের চাপ না দিয়ে তার চরিত্র গঠনে সময় দিতে হবে।
শিক্ষা প্রশাসনের করণীয় কী? চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরী, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ডিজিটালভাবে পর্যবেক্ষণ করা।বিদ্যালয়ের আর্থিক লেনদেন ও উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অভিযোগ উঠলে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রকাশ্য তদন্তের ব্যবস্থা করা, শ্রেণিকক্ষে প্রকৃত পাঠদান নিশ্চিত করে অপ্রয়োজনীয় কোচিংনির্ভরতা কমানো।, শুধু পরীক্ষার ফল নয় শিক্ষার্থীর আচরণ, সৃজনশীলতা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও সামাজিক মূল্যবোধকেও গুরুত্ব দেওযা, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়মে কার্যকর জবাবদিহির ব্যবস্থা করা, দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে পদমর্যাদা বা পরিচয় না দেখে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
শেষ কথা চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে এ কথা বলা যেমন সত্য নয়, তেমনি সবকিছু ভালো চলছে এ কথাও বলা যাবে না। এই জেলার অসংখ্য শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন। হাজার হাজার শিক্ষার্থী কঠোর পরিশ্রম করছে। অনেক প্রতিষ্ঠানও ভালো ফলাফল ও সুনাম ধরে রেখেছে। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, প্রশাসনিক দুর্বলতা, শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতি, অতিরিক্ত কোচিংনির্ভরতা এবং শিক্ষার্থীদের নৈতিক সংকট পুরো ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তৈরি করছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন বড় করলেই শিক্ষা বড় হয় না।
পরীক্ষার ফল ভালো হলেই জাতি শিক্ষিত হয় না । জিপিএ-৫ বাড়লেই মানুষের মান বাড়ে না। শিক্ষার আসল সাফল্য তখনই, যখন একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে এসে বলতে পারে—“আমি শুধু পরীক্ষায় পাস করিনি; আমি একজন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা পেয়েছি।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে এখন সেই পরীক্ষাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো আমরা কি শুধু সার্টিফিকেট তৈরি করছি, নাকি মানুষ তৈরি করছি? এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক,বিনোদপুর কলেজ,সাংবাদিক