বিবিধশিরোনাম

মেয়েদের স্বাবলম্বী করতে পাকিস্তানি ইলেকট্রিশিয়ান বাবার সংগ্রাম

দক্ষিণ করাচি শহরের ছোট্ট একটি দোকান। সেখানে কাজে খুব মনোযোগী দুই কিশোরী। ইলেকট্রিক তার ও ব্যাটারির চার্জার মেরামত করছে তারা। এই কাজে তাদের প্রেরণা বাবা নাসিব জামাল।
অনেক চড়াই-উতরাই পার হওয়া জামাল একজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান। এই কাজে দুই দশকের অভিজ্ঞতা তার। নিজের দক্ষতা বিলিয়ে দিচ্ছেন তার আট কন্যার মাঝেও। মেয়েদের কিছু দিতে পারেন বা না পারেন কারিগরি দক্ষতাটুকু শিখিয়ে দিতে চান, যাতে তারা ভবিষ্যতে স্বাবলম্বী হতে পারে।
সেই লক্ষে অনেকটাই সফল জামাল। তার আট কন্যার মধ্যে ছয়জনই এখন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান। কন্যাদের কর্মক্ষম করে গড়ে তুলতে পারায় যারপরনাই খুশি এই বাবা।
“আমার যখন চারটি কন্যা সন্তান হলো, তখন বিষয়টি আমার মাথায় আসে: তাদেরকে কেন আমি শিক্ষিত করব না?”- আরব নিউজকে বলেন খয়বর পাখতুনখাওয়া রাজ্যের তর ঘর এলাকা থেকে এসে করাচিতে বসত গড়া জামাল।
“অর্থনৈতিক সংকটের কারণে আমি তাদেরকে পড়াশোনার যথাযথ সুযোগ দিতে পারতাম না। তখন আমি ভাবলাম, আমি তাদেরকে অন্তত কারিগরি দক্ষতার শিক্ষা দিতে পারি।”
জামালের ছোট দুই মেয়ে এখনো ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ শিখছে। চারজন এরই মধ্যে ভালোভাবে কাজ শিখে ফেলেছেন এবং এতে গর্বের শেষ নেই তাদের বাবার।
“আমার মেয়েরা সমাজে নিজেদের একটা অবস্থান তৈরি করছে এবং পাকিস্তানে নারীদের জন্য সুনাম অর্জন করছে।”
জামালের পরিবারের বাসস্থান কসবা কলোনির কাছেই ২০১৩ সালে বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহত হন আব্দুল ওয়াহেদ খান নামের একজন সমাজসেবক, যিনি একটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন।
জামালের মতোই জীবিকার সন্ধানে পাকিস্তানের সহিংসতাপূর্ণ উত্তরাঞ্চল থেকে চলে আসা ওয়াহেদ খানের ইচ্ছা ছিল করাচির বস্তিগুলোতে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটাবেন।
শিক্ষানুরাগী সেই সমাজকর্মীর মৃত্যু এখনো নাড়া দেয় জামালকে, “আমাদের সন্তানদের শিক্ষিত করার জন্য ওয়াহেদ খান তার জীবন উৎসর্গ করেছেন।”
নিজের মেয়েদের কারিগরি শিক্ষায় দীক্ষিত করার ক্ষেত্রে রক্ষণশীল প্রতিবেশী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সমালোচনা কম পোহাতে হয়নি বলে জানালেন জামাল।
“আপনি যখন আপনার সন্তানকে কারিগরি শিক্ষা বা পড়াশোনায় পাঠাবেন তখন পরিবারের কিছু মানুষ এটার বিরোধিতা করবে। তখন এসব সমালোচনায় কান দেওয়া উচিত হবে না আপনার।”
বাবা হিসেবে জামাল চান, এসবের বিরুদ্ধে অন্তত তার মেয়েরা অন্যদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিক।
কারিগরি দক্ষতা অর্জন করা দুই কন্যাকে জামাল এরই মধ্যে বিয়ে দিয়েছেন এবং তারা খুব ভালো আছেন। বিষয়টাকে নারীর ক্ষমতায়ন হিসেবে দেখছেন জামাল।
“আমি সন্তানদের ভবিষ্যৎ পর্যবেক্ষণ করব। আমি তাদের দক্ষ করে তুলব, যাতে তারা দেশ এবং নিজেদের সেটি কাজে আসে। এটি তাদের আত্মবিশ্বাস দেব এবং সাহসী করে তুলব।”
জামাল জানালেন, তার মেয়েরা প্রতিদিন স্কুলেও যায়। কিন্তু করোনাভাইরাস সংকটের কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় আপাতত তারা তাকে ব্যবসায় সহযোগিতা করছে।
জামাল বলেন, “আমি সৌর বিদ্যুতের বাতি সংযোগের কাজ করি। যখন আমি বাড়ির বাইরে থাকি বা শহরের বাইরে থাকতে হয় তখনো দোকান নিয়ে আমাকে চিন্তা করতে হয় না।”
“স্কুল থেকে ফিরেই তারা দোকান খুলে। এমনকি আমি তিন দিনের জন্য চলে গেলেও তারা দোকান-ব্যবসার ও বাড়ির দেখভাল করতে পারে।”
জামালের ১০ বছর বয়সী কন্যা জাভেরিয়া জানায়, ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ তার কাছে প্রথমে ‘কিছুটা কঠিন মনে হতো’। এখন সে কাজ শিখে গেছে।
ক্রেতার হাতে মেরামত করা একটা ব্যাটারি দিতে দিতেই হেসে হেসে জাভিরিয়া বলে, “কাজটি আমি বাবার কাছ থেকে শিখেছি। আমি লাইট, স্পিকার মেরামত করি। ব্যাটারির চার্জারও মেরামত করতে পারি।”
মেয়ে বলেই তাদের বাড়ির চার দেয়ালের আটকে রাখা উচিত নয় জানিয়েছেন জামাল- “আপনি যদি মেয়েদের নিজেদের প্রত্যয়ী এবং আস্থাশীল করাতে চান তবে তাদের ঘর থেকে বের করতে হবে। তাদের ওপর আস্থা রাখতে হবে।” দেশ রূপান্তর

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button