আইন আদালতশিরোনাম

মানসিক টর্চারে মৃত্যুর অভিযোগ ময়না তদন্তের জন্য কুয়েট শিক্ষকের লাশ উত্তোলন

ছাত্রলীগ নোতাকর্মীদের ‘মানসিক টর্চারে মৃত্যুর অভিযোগ ওঠা’ খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম হোসেনের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কবর থেকে থেকে উত্তোলন করা হয়েছে। বুধবার (১৪ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীর বাঁশগ্রাম গ্রাম থেকে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আহমেদ সাদাতের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে মরদেহ উত্তোলন করা হয়।
লাশ উত্তোলনের সময় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) খানজাহান আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রবির কুমার বিশ্বাস, ওসি (তদন্ত) ও তদন্ত কর্মকর্তা শাহরিয়ার হাসান, কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুজ্জামান তালুকদার, স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিনিধি, ড. সেলিম হোসেনের বাবা শুকুর আলিসহ এলাকাবাসীরা উপস্থিত ছিলেন।
ড. সেলিম হোসেনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড– বলে অভিযোগ করে সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে বিচারের দাবি জানিয়েছে সেলিমের স্বজন ও এলাকাবাসী। এ সময় সেলিমের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন সেলিমের স্বজন ও এলাকাবাসী। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী সেলিমের রহস্যজনক মৃত্যু মানতে পারছেন না কেউ। সবাই এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশ জানায়, তদন্তের স্বার্থে জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আহমেদ সাদাতের উপস্থিতিতে কবর থেকে সেলিম হোসেনের লাশ তোলা হয়। সেখানে চিকিৎসক, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের খানজাহান আলী থানা ও কুমারখালী থানার পুলিশ কর্মকর্তা এবং পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। লাশ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
এরআগে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অধ্যাপক ড. মো. সেলিম হোসেনের মৃত্যুকে অস্বাভাবিক হিসেবে চিহ্নিত করায় বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। বিষয়টি নিয়ে কুয়েটের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ায় মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয় করার জন্য খানজাহান আলী থানা পুলিশ থানায় সাধারণ ডায়েরি করে (জিডি)। এরপর ঘটনাটির তদন্ত ন্যস্ত করা হয়। খানজাহান আলী থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) শাহরিয়ার হাসানের ওপর । এরপর তিনি মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ময়নাতদন্তের আবেদন করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ড. সেলিম হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হয়নি। ফলে আদালত মরদেহ কবর থেকে তোলার অনুমতি দেননি। পরে আদালত থেকে জানানো হয়, বিষয়টি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের এখতিয়ারভুক্ত। এজন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এরপর খুলনা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন জানানো হয়। মরদেহ কুষ্টিয়াতে দাফন হওয়ার কারণে লাশ কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্তের জন্য কুষ্টিয়া জেলার ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করা হয়। ৬ ডিসেম্বর খুলনা জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদারের পাঠানো একটি চিঠি হাতে পান জেলা প্রশাসক সাইদুল ইসলাম।
সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনগত দিকগুলো খতিয়ে দেখেন এবং লাশ উত্তোলনের ব্যবস্থা করেন কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে খুলনা খানজাহান আলী থানা থেকে একটি দল কুষ্টিয়া পৌঁছায়। সূর্যাস্ত যাওয়ার কারণে তারা কবরস্থান পর্যন্ত যাননি।
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আহমেদ সাদাত জানান, খুলনা থেকে পুলিশের একটি দল কুষ্টিয়া পৌঁছায়। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কুমারখালী উপজেলার বাঁশগ্রামে কবর থেকে ড. সেলিম হোসেনর লাশ উত্তোলন করা হয়।
উল্লেখ্য, কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজান তার লোকজন নিয়ে গত ৩০ নভেম্বর ড. সেলিমের কক্ষে প্রবেশ করে অশালীন আচরণ এবং তাকে মানসিক নির্যাতন করেন। এর ফলে তিনি ৩০ নভেম্বর দুপুর ৩টায় মারা যান। ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক সেজানসহ উপস্থিত লোকজন তাদের মনোনীত প্রার্থীকে ডাইনিং ম্যানেজার নির্বাচন করার জন্য হল প্রভোস্ট ড. সেলিম হোসেনকে নিয়মিত হুমকি দিয়ে আসছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় ৩০ নভেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাদমান নাহিয়ান সেজানের নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগ কর্মীরা ক্যাম্পাসের রাস্তা থেকে ড. সেলিম হোসেনকে জেরা করা শুরু করেন। এরপর তারা ওই শিক্ষককে ধরে নিয়ে তার ব্যক্তিগত কক্ষে (তড়িৎ প্রকৌশল ভবন) প্রবেশ করেন।
সিসি টিভি ফুটেজে দেখা যায়, তারা আনুমানিক আধ ঘণ্টা ওই শিক্ষকের রুমে ছিলেন। পরে ড. সেলিম দুপুরে খাবার খেতে ক্যাম্পাস সংলগ্ন বাসায় যান। দুপুর ২টার দিকে তার স্ত্রী সাবিনা খাতুন রিক্তা লক্ষ্য করেন তিনি বাথরুম থেকে বের হচ্ছেন না। পরে তিনি দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করেন এবং খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেন। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক সেলিমকে মৃত ঘোষণা করেন। শিক্ষক সেলিমের মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদে দোষীদের চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের দাবিসহ সাত দফা দাবিতে গত ২ ডিসেম্বর দুপুরে একাডেমিক কার্যক্রম বর্জন করে শিক্ষক সমিতি। প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে কুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানান শিক্ষকরা। এ ঘটনায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত ১ ডিসেম্বর থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত কুয়েট বন্ধ ঘোষণা এবং ঐ দিন বিকাল টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১২ ডিসেম্বর ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি বৃদ্ধি করা হয়।
এদিকে, শিক্ষক সেলিম হোসেনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় গত ২ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজানসহ ৯ শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃতরা সবাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। এছাড়া পাঁচ সদস্যের নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ১০দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হলেও তারা এখনো রিপোর্ট জমা দিতে পারেনি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button