
শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ)সংবাদদাতা: চাঁপাইনবাবগঞ্জে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়েছে। তবে শহিদ মিনারে প্রবেশের গেইটে প্রশাসনের টাঙানো ব্যানারে জুলাই শহিদের ছবি থাকায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে অনলাইন ও অফলাইনে। বিশেষ করে ফেসবুকে শুরু হয়েছে নানা সমালোচনা। বিএনপির সমর্থকদের অনেককেই এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে।
মঙ্গলবার (২০ ফেব্রুয়ারী) দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ চত্বরে অবস্থিত শহিদ মিনারে ভাষা শহিদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন জেলা প্রশাসক মোঃ শাহাদাত হোসেন মাসুদ, পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস, বীর মুক্তিযোদ্ধা খাইরুল ইসলাম এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সহ অন্যান্যরা। নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের গেটে জেলা প্রশাসনের দেয়া ব্যানারে জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদ আবু সাইদের ছবি থাকায় অনেকেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলার জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন শহিদ দিবসের ব্যানারে তাদের ছবি না দিয়ে শহিদ আবু সাইদের ছবি দেয়া কোনভাবেই মানানসই নয়। বরং এটা ভাষা শহিদের প্রতি অসম্মান করা, অবজ্ঞা করা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ভাষা শহিদদের হেয় করে ২৪ এর জুলাই শহিদকে পরিকল্পিত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ করা হয়েছে। ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে কোথসও তাদের ছবি দেখা যায়নি। প্রথমেই চোখে পড়েছে জুলাই শহিদের ছবি। এ দৃশ্য কোনভাবেই কাম্য নয়।
অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে ২১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোঃ শাহাদাত হোসেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্য কর্মকর্তা ও শিশুরা বক্তব্য ও আবৃত্তি করেন। কিন্তু জেলা প্রশাসক শেষ পর্যন্ত স্ব-শরীরে উপস্থিত থাকলেও কোনো বক্তব্য দেন নি। এমনকি ভাষা শহিদদের স্মরণ ও শ্রদ্ধার কথা উচ্চারণ না করেই অনুষ্ঠান শেষ করে চলে যান। ফায়জার রহমান কনক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন,”আমি একজন ভাষা সৈনিক পরিবার এর সন্তান, আজকে যদি এই প্রতিবাদটা না জানাই তাহলে আমার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা এবং সর্বপরি বাংলা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা এই ভাষা’র অর্জনকে কোন কিছুর সাথে তুলনা করা যায় না৷ ভাষার জন্য জীবন দিতে হয়েছে এই রকম আর দ্বিতীয় নজির নাই৷ ক্ষমা কর সকল ভাষা শহীদ ও সকল ভাষা সৈনিক!
“মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও ভাষাসৈনিক (একুশে পদক প্রাপ্ত) ডা: আ.আ.ম.মেসবাহুল হক (বাচ্চু ডাক্তার) এর ছেলে মেসবাহুল সাকের মন্তব্য করেন, শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শহিদ মিনারে প্রবেশের গেইটে টাঙানো ব্যানারে ভাষা শহিদের ছবি না দিয়ে জুলাই শহিদের ছবি দেয়া মানে ইতিহাস বিকৃত করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা।
উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সারাদেশে জেলা প্রশাসক রদবদল করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় গত ১৫ অক্টোবর মোহাম্মদ সোলায়মানকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল সরকার। এক মাস শেষ হওয়ার আগেই স্থানীয় জামায়াতে-শিবির সমর্থকরা অভিযোগ তুলেন মোহাম্মদ সোলায়মান শেখ হাসিনার দোসর। কারণ উনি এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। সাবেক প্রধান উপদেষ্টার একান্ত সচিব শাব্বীর আহমেদ। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের সন্তান। তার পরিবার জামায়াতের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকার সুবাদে এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার একান্ত সচিবের প্রচেষ্টায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সোলায়মান ২৯ দিনের মাথায় বদলি করে বর্তমান জেলা প্রশাসক মোঃ শাহাদাত হোসেন মাসুদ চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিয়োগ দেয়া হয়। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক এমপি হারুনুর রশীদ এবং সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া নির্বাচন পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে বর্তমান জেলা প্রশাসক মোঃ শাহাদাত হোসেন মাসুদ জামায়াতের সাথে যোগসাজশ করে নির্বাচন পরিচালনা করেছেন এমন কথা বলেছেন। সচেতন মহলের অনেকই বলছেন, বর্তমান ডিসি জামায়াত শিবিরের নিবেদিত ব্যক্তি এবং মনে প্রাণের সমর্থক। সেটা তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। উনি ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের চেতনা পরিপন্থী মানুষ তা বুঝা যায়। কিন্তু উনার ব্যক্তিগত চেতনাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে প্রভাবিত করার যে ঘৃণ্য চেষ্টা করছেন তা অন্যায়। এ ধরনের আমলাদের অপচেষ্টায় দেশের ইতিহাস বারবার বিকৃত হয়।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের দাবি, ২১ ফেব্রুয়ারির সাথে ৩৬ জুলাই ফুটিয়ে তোলার উদ্যোগটি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নেওয়া হয়েছে।



