slider

মদের টাকা জোগাতে গলা কেটে হত্যা

মোঃ মাসুদ, কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি : ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার কোন্ডা ইউনিয়নের জাজিরা এলাকার মঠবাড়িয়াতে মদের পার্টির টাকার প্রয়োজনে ১০ম শ্রেনীতে পড়ুয়া ইজিবাইক চালককে গলা কেটে হত্যা করেছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।

এবিষয়ে রবিবার (২১ মে) ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান পিপিএম-বার তার নিজ কার্যালয়ে দুপুর ১২টায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানান গত ১৯ মে আনুমানিক সকাল ৬ টার সময় দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানা পুলিশ খবর পায় যে, ঢাকা জেলার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানাধীন মঠবাড়ী পদ্মা রেলওয়ে সেতুর নিচে সাবেক চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন এর পরিত্যক্ত ইটের খোলার ভিতরে একজন ছেলের গলা কাঁটা লাশ পড়ে আছে, সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় এবং উপস্থিত লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে জানা যায় যে, মৃত দেহটি একই ইউনিয়নের জাজিরা গ্রামের মৃত সিদ্দিক মিয়ার ছেলে শাকিলের (১৮), ঘটনাস্থলে উপস্থিত শাকিলের পরিবারের সদস্যরা লাশটি শাকিলের মর্মে সনাক্ত করে এবং পুলিশকে জানায় যে নিহত শাকিল ১০ম শ্রেণীর একজন মেধাবী ছাত্র, তার বাবা ছোটবেলায় মারা যায়, বাসায় শাকিল তার অসুস্থ মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে থাকতো।

নিহত শাকিল নিজের পড়াশুনা পাশাপাশি অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা এবং সংসারের খরচ মিটানোর জন্য স্কুল শেষে প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত ইজিবাইক চালাতো, শাকিলের পরিবার পক্ষ থেকে জানা যায় প্রতিদিনের মতো শাকিল গত ১৮ মে বিকেলে ইজিবাইক নিয়ে বের হয় কিন্তু রাতে আর বাসায় ফিরে আসেনি।

লাশ উদ্ধার করে পুলিশ মৃতদেহের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করার সময় দেখতে পায় যে, মৃত শাকিলের গলা ধারালো অস্ত্র দ্বারা জবাই করে দেহ থেকে মাথা প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে এবং পিঠে এলোপাথাড়ি ১১টি চাকু মারার ক্ষত আছে এবং পেটের ডান পাশে চাকু মারার ফলে নাড়ি ভুড়ি বের হয়ে গিয়েছে। সুরতহাল শেষে পুলিশ শাকিলের মৃতদেহ ময়না তদন্তের জন্য মিটফোর্ড হাসপাতালে প্রেরন করে এবং পরবর্তীতে শাকিলের বড় বোন সীমা (২৪) বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

পুলিশ সুপার আরো বলেন চাঞ্চল্যকর এই নৃশংস হত্যাকান্ডের সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে হত্যাকান্ডের মূল রহস্য উদঘাটন ও ঘটনায় জড়িত আসামীদের দ্রুত গ্রেফতার করার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্-দক্ষিণ) আমিনুল ইসলাম এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কেরাণীগঞ্জ সার্কেল) শাহাবুদ্দিন কবীর, বিপিএম এর নেতৃত্বে একটি স্পেশাল টিম গঠন করে দেওয়া হয় এবং এই তদন্ত টিম নৃশংস এই ক্লু-লেস হত্যাকান্ডের মূল রহস্য উদঘাটনের লক্ষ্যে ঘটনার পর থেকেই ব্যাপক তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে, ক্রাইমসিন হতে তদন্ত টিম প্রাথমিকভাবে ধারনা করে যে, অজ্ঞাতনামা আসামীরা ইজিবাইক ছিনতাই এর উদ্দেশ্যে শাকিলকে নির্জন পরিত্যক্ত ইটখোলায় নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। তদন্ত টিম ঘটনাস্থল ও এর আশেপাশের এলাকায় তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোত্তম প্রয়োগ করে হত্যাকান্ডে জড়িত আসামীদের সনাক্ত করতে সক্ষম হয়। প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আসামীরা ইতিমধ্যে মোবাইল বন্ধ করে বিভিন্ন জেলায় পালিয়ে গেছে।

এমতাবস্থায়, হত্যাকান্ডে জড়িত আসামীদের দ্রুত গ্রেফতারের লক্ষ্যে জনাব শাহাবুদ্দিন কবীর, বিপিএম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, কেরাণীগঞ্জ সার্কেল এর সরাসরি তত্ত্ববধানে এবং জনাব শাহজামান, অফিসার ইনচার্জ, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা এর সার্বিক সহযোগিতায় জনাব মাসুদুর রহমান (ইন্সঃ) তদন্ত দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা এর নেতৃত্বে একটি চৌকষ আভিযানিক দল টানা ২৪ ঘন্টা ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে নৃশংস এই হত্যাকান্ডে জড়িত আসামী (১) ইব্রাহিম চান (২১)-কে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা হতে, (২) শারফাত (২০)কে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ হতে, (৩) সাব্বির হোসেন মেহেদী (২২) কে ধামরাই হতে এবং (৪) জনি (২০) কে সাতক্ষীরা হতে গ্রেফতার করে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার হওয়া আসামীরা হত্যাকান্ডের কথা স্বীকার করেন এবং পরবর্তীতে আসামীদের স্বীকারোক্তি ও দেখানো মতে হত্যাকান্ডের সময় ব্যবহৃত একটি রক্তমাখা সুইসগিয়ার চাকু, আসামীদের ব্যবহৃত রক্তমাখা সিএনজি ও লুন্ঠিত ইজিবাইকটি পুলিশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

তিনি আরো জানান আসামিরা সবাই মাদকাসক্ত এবং কিশোর গ্যাং-এর সক্রিয় সদস্য,আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গত ১৮ মে আসামিরা একটা ইজিবাইক ছিনতাই করে তার ব্যাটারী বিক্রির টাকা দিয়ে মদের পার্টি করবে মর্মে পরিকল্পনা করেছিল। সেই পরিকল্পনা মোতাবেক ঐদিন সন্ধ্যায় আসামিরা ইব্রাহিম চাঁনের সিএনজি নিয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কাউটাইল ঘাটে টার্গেট ইজিবাইকের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। পরবর্তীতে কোন টার্গেট ইজিবাইক না পেয়ে শরাফত ও জনি কাউটাল ঘাট এলাকা থেকে সামনে এগিয়ে গিয়ে শাকিলকে পায়। শাকিল জনির পূর্ব পরিচিত বিধায় শাকিলকে নির্জন জায়গায় ভাড়া করে নিয়ে যাওয়া সহজ হবে মনে করে আসামিরা শাকিলের ইজিবাইকটা ভাড়া করে।

জনি, শারফাত এবং সাব্বির শাকিলের ইজিবাইকে উঠে ঘুরতে ঘুরতে শাকিলকে নিয়ে মঠবাড়ী পরিত্যক্ত ইটখোলায় যায়,অপরদিকে ইব্রাহিম চাঁন সিএনজি নিয়ে ওদের পিছু পিছু আসে, তারপর ঘটনাস্থলে পৌঁছানো মাত্রই পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী শরাফাত সুযোগ বুঝে সুঁইচগিয়ার দিয়ে শাকিলের গলায় পাড় দেয়,এতে শাকিল ইজিবাইক থেকে পড়ে যায় এবং গলা চেপে ধরে চিৎকার শুরু করে, তখন জনি পেছন থেকে শাকিলের পিঠে এলোপাথাড়ি চাকু মারতে থাকে কিন্তু তারপরও শাকিল চিৎকার ও দাপাদাপি করতে থাকলে জনি, সাব্বির এবং ইব্রাহিম চাঁন শাকিলের মাথা ও হাত-পা চেপে ধরে এবং শরাফাত শাকিলকে সুইসগিয়ার দিয়ে মাথার সামনে-পেছনে জবাই করে মাথা প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলে,মৃত্যু নিশ্চিত করার পর শরাফত, জনি ও ইব্রাহিম চাঁন সিএনজিতে করে চলে যায় এবং সাব্বির ওদের পেছন পেছনে মৃত শাকিলের ইজিবাইক চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়ে।

মূলত আসামীদের মদের পার্টির টাকার জন্যই তারা পূর্ব পরিচিত ইজিবাইক চালক শাকিলকে হত্যা করে তার ইজিবাইক ছিনতাই করে বলে জানা যায়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button