২০১৫ সালে প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠেছিলো হিমালয়-কন্যা নেপাল। যার কম্পন এসে নাড়া দিয়েছিলো বাংলাদেশেও। দেশজুড়েই বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া যায় সে ভূমিকম্পে। সেই সাথে হেলে পড়ে বেশ কিছু ভবনও। ওই ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানানো হয়েছিলো। কিন্তু সেই পদক্ষেপ আসলে কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে? এক প্রতিবেদনের এসব নানা তথ্য তুলে এনেছে বিবিসি বাংলা।
বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, পদক্ষেপ বাস্তবায়নের হিসেব কষলে অগ্রগতি এতটুকুই এখন বাংলাদেশে বাড়ি নির্মাণে ভূমিকম্প ঝুঁকি আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
যদিও ২০০৪ সালেই জাতিসংঘের সহায়তায় সরকার ও কিছু সংস্থা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিতে গুরুত্ব দেয়া শুরু করেছিলো এবং সেই পরিকল্পনায় ভূমিকম্পের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিলো। পরে ২০০৯ সাল নাগাদ দেখা যায়, ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতায় প্রয়োজনীয় জনবল ও উপকরণই নেই ফায়ার সার্ভিস বিভাগের।
তবে ফায়ার সার্ভিস এখন অনেক বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে বলে দাবি কর্তৃপক্ষের। ভূমিকম্পজনিত আগুন বা অন্য বিপর্যয়ে তারা আরো বেশি সক্রিয়তা দেখাতে পারবে। প্রায় এক লাখ স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে, যাতে প্রয়োজনের সময় তারাও কাজে হাত লাগাতে পারেন।
নেপালের ভূমিকম্পের ভয়াবহতায় তখন বাংলাদেশ জুড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দেয়। কারণ এরপর বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কয়েক দফায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিলো ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার। সিদ্ধান্তটি এখনো বাস্তবায়িত না হলেও এ সম্পর্কিত কিছু কাজ চলছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া ওই বৈঠকে ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এনডিএমআইএস) নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরির সিদ্ধান্তও হয়েছে বলে তখন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব জানিয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের পর ঢাকা শহরে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে প্রয়োজনীয় খোলা জায়গাও নেই।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, ‘এমন অনেক বিষয়েই এখনো কোন দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘বিল্ডিং কোড খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হলেও সেগুলোর গেজেট হয়নি। বিল্ডিং কোড সহজবোধ্য করে মানুষের কাছে পৌঁছানো দরকার ছিলো যাতে করে ভবন নির্মাণের সময় মানুষ সত্যিকার অর্থেই সতর্ক হওয়ার গুরুত্ব বুঝতে পারে। কিন্তু এ কাজটিও করা হয়নি এখনো।’
তিনি আরো বলেন, ‘আবার প্রস্তুতি বা যা কাজ হচ্ছে তার লক্ষ্য শহর এলাকা। কিন্তু ভূমিকম্পের জন্য শহর ও গ্রাম এলাকায় সমান গুরুত্ব দেয়া উচিত।’
একটা কক্ষ কতটুকু বড় হলে দরজার সংখ্যা বাড়ানো দরকার যাতে দুর্যোগজনিত আগুনের সময় সহজেই মানুষ বের হয়ে আসতে পারে – এ ধারণাটি এখনো জনপ্রিয় হয়নি বলেও জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ড. হাফিজা খাতুন বলেন, ‘সচেতনতা তৈরির মতো রুটিন কিছু কাজ চলছে ভূমিকম্প বিষয়ে এবং এর বাইরে বড় ধরণের কাজ বলতে ফায়ার সার্ভিসের কিছু যন্ত্রপাতি দেখা যাচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আসলে যখন ঘটনা ঘটে নানা উদ্যোগ নেই আমরা, যা পরে ভুলে যাই। রুটিন কাজ হলো সচেতনতা । এটি নিয়ে অনেক কাজ হয়। এমনকি বিল্ডিং কোডের পরিবর্তনগুলোও এখনো চূড়ান্ত করে মানুষকে জানানো হয়নি।’
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ঢাকার মধ্যে বড় ভূমিকম্প সৃষ্টির মতো ভূতাত্ত্বিক অবস্থা না থাকলেও সিলেট এবং চট্টগ্রামে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলেও ঢাকায় ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হবে।
জানা গেছে, নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর বিশ্বব্যাংক ও জাইকার সহায়তা বাংলাদেশে ভবন পর্যবেক্ষণ ও অবস্থা যাচাই করার জন্য বেশ বড় ধরণের কর্মকাণ্ড শুরু হয়। যার আওতায় সরকারি ভবন বিশেষ করে স্কুল, হাসপাতাল ও ফায়ার সার্ভিস ভবনগুলো পর্যবেক্ষণের কাজ শুরুর পাশাপাশি রাজউকের মাধ্যমে প্রাইভেট ভবনগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজ শুরু হয়ে।
এসব প্রকল্পের সাথে জড়িত আছেন বুয়েটের শিক্ষক মেহেদী হাসান আনসারী। তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় রাজউকের আওতাধীন ভবন এসেসমেন্ট কাজ চলছে আর জাইকার অর্থায়নে সরকারি ভবনগুলো নিরীক্ষা করা ও মজবুত করার কাজ চলছে।’
জানা গেছে, শুধু ঢাকাতেই প্রায় পাঁচ হাজার হাসপাতাল, স্কুল, ফায়ার সার্ভিস ভবনসহ সরকারি ভবনগুলো পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
আনসারীর মতে, ‘এসেসমেন্ট প্রতিবেদন কয়েক মাসের মধ্যেই চূড়ান্ত হবে, তবে প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্প ও ভূমিকম্পজনিত দুর্ঘটনা প্রতিরোধে খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই এই ভবনগুলো।’
তিনি বলেন, ‘৬০০ স্কুলকে টার্গেট করা হয়েছে এসেসমেন্টের জন্য এবং এর মধ্যে দুশো স্কুলের এসেসমেন্ট শেষ হয়েছে।’
আনসারী জানান, মোট চারটি বিষয়কে সামনে রেখে ভূমিকম্প জনিত দুর্ঘটনা থেকে ভবন ও জানমাল রক্ষার কাজ চলছে। এগুলো হলো :
১. রাজউক, সিটি কর্পোরেশন ও ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়ানো। এজন্য প্রশিক্ষণ ও কমিউনিকেশন শক্তিশালী করণের পাশাপাশি ব্যাকআপ কমিউনিকেশন তৈরি করা। যাতে করে ভূমিকম্প হলে স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে গেলেও ব্যাক-আপ সক্রিয় থাকে।
২. একটি জরুরি সমন্বয় অপারেশন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা। আপাতত ঢাকা সিটি কর্পোরেশন উত্তর ও দক্ষিণ, ফায়ার সার্ভিস এবং সিলেট সিটিতে এটা করা হচ্ছে। এই সমন্বয় কেন্দ্রগুলো ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভবনে থাকবে যাতে বিপযর্য়কালে এর কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আর এখান থেকেই দুর্যোগ পরবর্তী সব কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সব ধরণের তথ্য এখানেই আসবে এবং এখান থেকে দেয়া হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এখান থেকেই কাজ করবেন। সর্বশেষ সব তথ্য এসব কেন্দ্রর স্ক্রিনে সার্বক্ষণিক দেখানো হবে। ফায়ার সার্ভিসের একটি ভবনই করা হচ্ছে ভূমিকম্প প্রতিরোধ উপযোগী করে।
৩. দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের দক্ষতা বাড়ানো। এজন্য সেখানে একটি ইন্সটিটিউট হবে এবং একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ তৈরি হবে এই ইন্সটিটিউটেই।
৪. পুরো কাজগুলো ঠিক মতো হচ্ছে কিনা তা দেখভাল করবে পরিকল্পনা কমিশন।
আনসারী জানিয়েছেন, সরকারি অর্থায়নে অন্তত একশ কোটি টাকা খরচ করে ফায়ার সার্ভিসের জন্য নানা উপকরণ কেনা হয়েছে, ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যেগুলোর খুব প্রয়োজন ছিলো।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহাদৎ হোসেন বলেন, ‘বিল্ডিং কোডকে শক্তিশালী করা হয়েছে এবং ভূমিকম্প সহনীয় অবকাঠামো নির্মাণে জোর দেয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা একই সাথে পূর্বাচলে তিন একর জায়গায় মানবিক সহায়তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজ করছি। যাতে বড় দুর্যোগ হলে সেখান থেকেই জরুরি অপারেশন্স চালানো সম্ভব হয়। আর এয়ারপোর্টের কাছে বিবেচনায় সেখানে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি নিয়ে এখন কাজ চলছে।’
তার ভাষ্য, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য অবকাঠামো বিশেষ করে স্কুল, ঘরবাড়িকে ভূমিকম্প সহনীয় করে গড়ে তোলার সংস্কৃতি তৈরি করা। সে লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে।’
কতটা হয়েছে পরিবর্তন ?
বুয়েটের সঙ্গে যৌথভাবে সরকারের সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি সিডিএমপির এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাড়ে সাত মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকার ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়বে। যেখানে তৈরি হবে সাত কোটি টন কংক্রিটের স্তূপ।
এমন ভয়াবহ আশংকার বিপরীতে প্রস্তুতি কতটা সম্পন্ন হয়েছে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘ঘরবাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এখন অনেকেই ভূমিকম্প বা এ ধরণের দুর্যোগের বিষয়টি বিবেচনা করে প্রকৌশলীদের সহায়তা নিয়ে ঘরবাড়ি নির্মাণে উৎসাহিত হচ্ছে। এ ধরণের ভবন গত দশ বছরে অনেক বেড়েছে।‘
যদিও এরপরেও দেশে বিপুলসংখ্যক অনিরাপদ হাউজিং আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় করণীয় হলো বিদ্যমান ভবনগুলোকে ভূমিকম্প সহনীয় করে তোলা। এটি অল্প সংস্কার ও অল্প ব্যয়েই সম্ভব। কিন্তু এজন্য সরকারিভাবেই প্রচার ও সহায়তায় এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় এখনো বহু মানুষ ঝুঁকিতেই থেকে যাবে।’




