বাউ ব্রো ব্রয়লারে দেশী মুরগির স্বাদ পাবেন দেশবাসী

কথায় আছে, বাঙালি অনেক ক্ষেত্রে বিদেশী জিনিস পছন্দ করলেও মুরগি কেনার সময় ঠিকই খোঁজেন দেশীজাত। কিন্তু উৎপাদনে স্বল্পতার কারণে বাজারে দেশী মুরগির দাম খুবই চড়া। একটি ৮৫০-৯৫০ গ্রাম ওজনের দেশী মুরগির দাম ৪০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের ক্রয় ক্ষমতার প্রায় বাইরে চলে গেছে। দেশী মুরগির স্বাদ দরিদ্র লোকজন প্রায় ভুলতে বসেছে। কিন্তু আবারো ব্রয়লারের চেয়ে কম দামে দেশী মুরগির স্বাদ পাবেন দেশবাসী।
এমনই সুখবর দিচ্ছেন বাংলাদেশ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের একদল গবেষক। ইতোমধ্যেই বাণিজ্যিকভাবে জাত দুটির উৎপাদন শুরু হয়েছে। দীর্ঘ ৮ বছর ধরে নিরলসভাবে গবেষণা করে বর্তমানে আমাদের দেশে প্রচলিত ব্রয়লার (মাংস উৎপাদনকারী) মুরগীর মাংসের চেয়ে অধিক স্বাদের জাত উদ্ভাবনে গবেষণায় সফলতা লাভ করেছেন বাকৃবির গবেষকরা। শুধু তাই নয় ব্রয়লারের মাংস হবে দেশী মুরগির মত শক্ত ও সুস্বাদু। এছাড়া বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্রয়লার উৎপাদনেও কমবে খরচ, বাড়বে উৎপাদন। মাংস হবে স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ। এমনি সব গুণাগুণ বিশিষ্ট বাউ-ব্রো-হোয়াইট ও বাউ-ব্রো-কালার নামে উন্নত জাতের ব্রয়লারের দুইটি জাত উদ্ভাবন করেছেন গবেষক দল যা বাংলাদেশে প্রথম।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মো. আশরাফ আলী ও প্রফেসর ড. মো. বজলুর রহমান মোল্যা দীর্ঘদিন গবেষণা করে বাউ-ব্রো সাদা এবং বাউ-ব্রো রঙিন জাতের মুরগি উদ্ভাবন করেছেন। মুরগির জাত দুটি এখন টেকসই প্রযুক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা।
গত রোববার সকাল সাড়ে ১১ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদের কাজি ফজলুর রহিম সম্মেলন কক্ষে বাউ-ব্রো মুরগি সম্প্রসারণ ও বিপণনের ওপর কর্মশালা এবং মতবিনিময় অনুষ্ঠানে আয়োজন করা হয়। কর্মশালায় উদ্ভাবিত মুরগির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা হয়।
কর্মশালা ও মতবিনিময় সভায় অনুষদের ডিন এবং মুরগীর জাত উদ্ভাবনের প্রধান গবেষক প্রফেসর ড. মো. আশরাফ আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলন প্রফেসর ড. মো. আলী আকবর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পল্লীকর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) মহাব্যবস্থাপক শরীফ আহমেদ চৌধুরী, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজেএফ) কর্মসূচি পরিচালক কাজী এম কমরউদ্দিন এবং বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) পরিচালক অধ্যাপক এম এ এম ইয়াহিয়া খন্দকার।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্পের প্রধান গবেষক প্রফেসর ড. মো. আশরাফ আলী। মূল প্রবন্ধে তিনি জানান, প্রচলিত ব্রয়লারের প্রতি অনেক ভোক্তার অনাগ্রহের কারণে ২০০৯ সালে গবেষণা শুরু করি। ২০১৪ সালে নতুন দুটি জাতের সঙ্গে দেশবাসীকে পরিচয় করিয়ে দিই। এ পর্যন্ত আরো গবেষণা করে বর্তমানে জাত দুটি একটি স্থায়ী জাতে রুপ লাভ করেছে।
তিনি জানান, রঙিন জাতটির মাংসের স্বাদ ও রং একেবারে দেশি মাংসের মতো। আর সাদা জাতটির মাংস ব্রয়লারের চেয়ে শক্ত ও সুস্বাদু। সাদা জাতটির উৎপাদন খরচ গড়ে কেজি প্রতি ৮৬ টাকা এবং রঙিন জাতটি কেজিপ্রতি ১০৯ টাকা। আর বাজারে জাত দুটির বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি যথাক্রমে ১২৫ ও ১৬০ টাকা।

মুরগীর জাত উদ্ভাবনে সহকারী গবেষক প্রফেসর ড. মো. বজলুর রহমান মোল্যা বলেন, ব্রয়লারের মতো মুরগির বাচ্চা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে না খামারিদের। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে দেশেই সাশ্রয়ী দামে বাচ্চা উৎপাদন করা যাচ্ছে। ব্রয়লারের বাচ্চা উৎপাদনে আমাদের নিজস্ব কোন প্যারেন্ট স্টক না থাকায় বাইরের দেশ থেকে প্যারেন্ট স্টক আমদানীতে প্রতিবছর ব্যয় হয় প্রায় ৯০ কোটি টাকা। দেশীয় মুরগির জার্মপ্লাজম ও প্রচলিত উন্নত জাতের সিনথেটিক ব্রয়লারের সমন্বয়ে উদ্ভাবিত নতুন ব্রয়লারের জাত দুইটি দেশে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করলে দেশে প্রতি বছর ৯০ কোটি টাকা আমদানী খরচ সাশ্রয় হবে।
ড. মোল্যা আরও জানান, সুনির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসা ছাড়া জাত দুটিতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নেই। ফলে এ মাংস স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ। বর্তমানে দেশের নয়টি জেলায় বিভিন্ন খামারে এই মুরগিগুলো পালন করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে গত দুই বছরে ৭৫ জন খামারিকে এই মুরগি লালন-পালনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এখন দরকার সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে জাতগুলো সম্প্রসারণ ও বিপণন।
কর্মশালা ও মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিজ্ঞানী ও গবেষক, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সরকারি-বেসরকারি পোল্ট্রি খামারের কর্মকর্তা, ডিম ও মুরগি উৎপাদনকারী খামারিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ভিসি প্রফেসর ড. মো. আলী আকবর বলেন, প্রচলিত ব্রয়লার দিয়ে দেশি মুরগির মাংসের চাহিদা মেটানো কঠিন। এ জায়গা থেকেই গবেষকেরা জাত দুটি উদ্ভাবন করেছেন। দেশে বাচ্চা উৎপাদন এবং দেশীয় আবহাওয়ায় পালনযোগ্য এ জাত দুটি খুব কম সময়ে জনপ্রিয়তা পাবে বলে আশা করা যায়। এতে দেশি মুরগির স্বাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।




