sliderস্থানিয়

বদলে গেছে যমুনার চর: আধুনিক প্রযুক্তিতে ফসলের বাম্পার ফলন

মোঃ আব্দুর রব মনসুর, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর দুই পাড়ের বিশাল চরাঞ্চলজুড়ে এখন বিভিন্ন ধরনের ফসলের চাষাবাদ হচ্ছে। যে বালুচর এক সময় পতিত পড়ে থাকত, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তিতে দীক্ষিত হয়ে কৃষকরা সেখানে হরেক রকম ফসল ফলিয়ে এখন ভালো আয় করছেন। এর মাধ্যমে নদীভাঙনের শিকার কৃষকেরা সংসারের অভাব দূর করে সচ্ছলতা অর্জন করছেন।

যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার হাজার হাজার কৃষকের আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। তবে ভাঙনের পর জেগে ওঠা চরের পলি মাটিতে এখন নতুন সম্ভাবনার আলো দেখছেন স্থানীয় চাষিরা। কয়েক বছর আগেও যেসব বালুচর অনাবাদি পড়ে থাকত, এখন সেখানে ফসলের সবুজ সমারোহ। কৃষি বিভাগের আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও সহায়তার ফলে চরাঞ্চলের কৃষকদের চাষাবাদে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন তারা মৌসুম অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ফসল ফলিয়ে বিগত দিনের অর্থকষ্ট কাটিয়ে উঠছেন।

যমুনার দুই তীরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলজুড়ে এখন ভুট্টা, বাদাম, গম, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন ও ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির ব্যাপক চাষ হচ্ছে। নদী ও চরে নলকূপ বসিয়ে এসব ফসলি জমিতে দেওয়া হচ্ছে সেচ। চাষাবাদে গতি আনতে এখন ঐতিহ্যবাহী গরু-লাঙ্গলের বদলে ব্যবহৃত হচ্ছে পাওয়ার ট্রিলার ও বড় ট্রাক্টর।

কৃষি বিভাগের আধুনিক চাষাবাদ বিষয়ক প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে ভাগ্যবদল করছেন চরাঞ্চলের কৃষকরা। মৌসুমভিত্তিক ফসল ও সবজি চাষের পাশাপাশি মালচিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা এখন বাড়তি আয় করছেন। এতে চরের অনেক কৃষকই আর্থিকভাবে বেশ স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।

নাটুয়ার পাড়া চরের কৃষক আব্দুস সালাম জানান, বারবার নদীভাঙনে জমিজমা হারিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন। বর্তমানে তিনি চরের জমিতে বিভিন্ন ফসলের পাশাপাশি মৌসুমী সবজির চাষ করছেন। কৃষি কার্যালয় থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি এখন অধিক মূল্যের সবজি উৎপাদন ও ফসল চাষ করে মোটা অঙ্কের টাকা আয় করছেন। এতে তার সংসারের অভাব দূর হয়েছে এবং তিনি জমি থেকেই সরাসরি সবজি বিক্রি করতে পারছেন।

সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের নিশ্চিন্তপুর চরের কৃষক আকরাম হোসেন জানান, প্রতিবছর বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরই পলিমাটিতে মরিচ চাষ করেন তিনি। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় দুই বিঘা জমি থেকে লক্ষাধিক টাকার মরিচ বিক্রির আশা করছেন তিনি। দেশজুড়ে সুনাম থাকায় সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলে উৎপাদিত এই মরিচ কিনতে দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা আসছেন।

চরাঞ্চল থেকে ঘুরে এসে দেখা গেল, যে চরের বালু মাটিতে একসময় কোনো ফসল ফলানোর কথা ভাবাই যেত না, আজ সেখানেই ফলছে ‘গুপ্তধন’। বেলে-দোআঁশ মাটিকে কাজে লাগিয়ে কম সেচ ও নামমাত্র খরচে ভুট্টা ও চীনা বাদামের বাম্পার ফলন পাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা। ধু-ধু বালুচরের এই দুই ফসল এখন চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যবদলের নতুন হাতিয়ার।
যমুনার পলিমাটিতে কাঁচা ও লাল মরিচের পাশাপাশি উন্নত জাতের গমের বাম্পার ফলন চরের কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিচ্ছে।
আধুনিক কৃষি পরিকল্পনার মাধ্যমে এখন চরের একই জমিতে বছরে তিনটি ভিন্ন ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে।

কাজিপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, নদীভাঙন কবলিত এলাকার কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম মঞ্জুরে মওলা জানান, চরের পলিমাটিতে উন্নত মানের কাঁচা ঘাস জন্মানোয় গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ ও দুগ্ধ উৎপাদনে বিশেষ সুবিধা হচ্ছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, মানসম্মত বীজ সরবরাহ ও উন্নত বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এই যমুনার চর অঞ্চলই আগামীতে দেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button