
Shekhar Dutta : সকালে বিছানা ছেড়ে উঠতে একটুও ইচ্ছে করছিল না। হাড়কাপানো শীতের জন্য নয়। প্রতি সকালেই তো শীত থাকে। কিন্তু কেমন যেন একটা বিষন্নতা মনকে চেপে ধরেছিল। আজ আমাদের মানিকভাইয়ের মৃত্যুদিন। ষাটের দশকের প্রথম দিকে ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার পর থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত একসাথে কাজ করেছি জন্যই কেবল নয়, মৃত্যুর পর ঢাকা থাকলে প্রতি বছর মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে এবং মণি সিংহ-ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্ট অফিসে শ্রদ্ধার্ঘ জানাতে যাই। কিন্তু করোনার কারণে আজ সেখানে যেতে পারছি না। মন তো খারাপ হবেই। ইতোমধ্যে মৃত্যুদিনে মানিকভাইয়ের স্মরণ করে আভা উঠে গেছে। পুবের জনালার পর্দাটা টেনে দিয়ে গেছে।
সূর্যিমামা আজ দেখা দেবেন । আকাশ ছোঁয়া ভবন দুটোকে অতিক্রম করে তিনি সোনালী আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। চারদক নিস্তব্ধ। কুয়াশাচ্ছন্ন আলোকোজ্জ্বল সুন্দর মায়াময় আকাশ। মনে হলো চিরদিনের সাথী মাতুল যেন আমাকে বলছেন, ‘ওঠো মামা! আর কত বিছানায় থাকবে। জীবন ও মৃত্যু নিয়মে আবদ্ধ। আমারও তো একদিন মৃত্যু হবে। ভালো কাজ করলে, ভালো মানুষ হলে প্রয়াতদেরও মানুষ মনে রাখে। কিন্তু আমি যেদিন ধ্বংস হবো; সেইদিন কি আমাকে মনে রাখার মতো কাউকে তোমরা আমার নিয়ন্ত্রনের বাইরে অন্য কোনো গ্রহে রেখে যেতে পারবে?’ নীরব রইলাম। মনটাকে যথাসম্ভব হালকা করে বিছানা ছেড়ে উঠলাম।
সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিকের বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম রইলো রইলেন আমার আজ সকালের ভাবনাজুরে। মাঞ্জা’ (ইস্তারি করা। ওই শব্দটা মানিকভাই বলতেন) দেওয়া সাদা পাঞ্জবী-পাজামা-কালো ফ্রেমের চশমা পড়া, সিগারেটে লম্বা টান দেওয়া আর অনর্গল গল্প মেতে থাকা মানিকভাই হাসিমাখা মুখম-ল চোখের সামনে ভাসতে থাকলো। সহযোদ্ধা সাথী ও বন্ধু নারী নেত্রী ডা. ফওজিয়ার কথাও মনে পড়লো। আজ থেকে অর্ধশতক বছর আগে ৩১/১ হোসেনী দালান রোডের ছাত্র ইউনিয়নের অফিসে মানিকভাইয়ের সভাপতিত্বে সেক্রেটারিয়েট মিটিং-এ মানিকভাইয়ের সামনে ও ফৌজিয়ার পাশে বসে থাকার স্মৃতি তাড়া করে বেড়ালো। ভাবলাম ওই গল্প একদিন করতে হবে ফওজিয়ার সাথে।
বঙ্গবন্ধুর ‘মাইনক্যা’, মণি সিংহ-খোকা রায়-অনিল মুখার্জি-বারীণ দত্ত-জ্ঞান চক্রবর্তী প্রমুখ বিপ্লবীদের ‘মানিক’, মোহাম্মদ ফরহাদ ও সমসাময়িক প্রজন্ম সকলের ‘মানিক ভাই’, জয়া-গীতিদের ‘আব্বু’, আয়ান-আরিন-নৈঋত (প্রয়াত)-হৃদ- হৃদমাদের ‘নানু’ সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক বেঁচে থাকলে এখন বয়স হতো ৮০ বছরের কিছু বেশি। ১৩ বছর আগে মাত্র ৬৯ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হয়েছেন। বর্তমানকালে এটা তেমন কোনো বয়স নয়। কিন্তু দুরারোগ্য ক্যান্সার অকালে এই প্রিয় মানুষ ও নেতাকে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।
জীবন ও মৃত্যুর পাশাপাশি অবস্থান। এদুয়ের মাঝখানে একটা অদেখা-অচেনা-রহস্যময় দেয়াল বা রেখা রয়েছে। চিরকালের সেই দেয়াল মানিকভাইকে আমাদের থেকে পৃথক করে দিয়ে গেছে। ব্যক্তি মানুষের জীবন যখন চলমান থাকে, তখন তিনি সেই সময়জাত পরিবেশ-পরিস্থিতির গ-িতে থেকে নিজের চিন্তা ও সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করেন। এই কাজ যেমন নিজে বেঁচে থাকার জন্য তেমনি অপরের সুখ-শান্তির জন্যও। অপরের জন্য কাজ করার গ-ি বিশাল এবং কালের গ-ি ভাঙার কাজটা কালজয়ী। অমর কথাসহিত্যিক বঙ্গিমচন্দ্র বলেছেন, ‘পুষ্প আপনার জন্য ফুটে না, পরের জন্য তোমার হৃদয়-কুসুমকে প্রস্ফূটিত করিও।’
বাস্তবে কখনও মানুষ সমষ্টির জন্য জীবন বিলিয়ে দেয়। সমষ্টি ক্ষুদ্র পরিসরের হতে পারে আবার দেশ ও বিশ্ব মানবতার মঙ্গলার্থেও হতে পারে। মানিক ভাই গ-িকে প্রসারিত করে দেশ অতিক্রম করে বিশে^র মেহনতী মানুষের মুক্তিসংগ্রামের সাথে যুক্ত করেছিলেন। তিনি বিশ^ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন-এর কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য হয়েছিলেন। পাকিস্তানের গ-ি ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অগ্রণী নায়কদের তিনি ছিলেন অন্যতম; জাতীয় বীর।
স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রণী নায়ক অনেকেই আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন করে সম্মানিত করতে পারি নাই, এটাই সত্য। রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান পাওয়ার বিষয়টা আজ অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলাদলি আর ব্যক্তিগত ধরাধরির পর্যায়ে চলে গেছে। তবে জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে যারা অগ্রণী ভূমিকা রেখেও রাষ্ট্র কর্তৃক মূল্যায়িত হননি; তাঁদের কোনো ক্ষতি আর হবার নয়, সর্বোপরি ইতিহাস রয়েছে তাদের পক্ষে। সেখান থেকে কেউ কাউকেই সরাতে পারবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্য বয়ে বেড়াবে জাতি। কেননা যে-জাতি জাতীয় বীরদের সম্মান করতে পারে না, সে জাতি লক্ষাভিমুখে চলতে পদে পদে ছোট-বড় হোঁচট খায়, কখনওবা জাতির গতি হয় উল্টোমুখী।
এটা তো ঠিক যে, সময়ই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। সময় সবসময়েই সমাজে দুই প্রান্ত সৃষ্টি করে; প্রগতিমুখী ও প্রতিক্রিয়ামুখী। যারা প্রগতির পক্ষে অবস্থান নেন, লড়াই করেন, বিজয়ী হন; তাদের জীবনই হয় সার্থক ও ধন্য। ষাটের দশকে লড়াই-সংগ্রামের দিনগুলোতে বাংলা মায়ের বুকে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী জনগণকে সাথে নিয়ে জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সময়কালের ইতিহাস রচনা করেছিলেন। নাম জানা না জানা ওইসব সোনার সন্তানদের মধ্যে প্রধানতম একজন হচ্ছেন সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক। মুক্তিযুদ্ধের ‘ ড্রেস রিহার্সেল’ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক। তিনি ছিলেন সময়ের উপযুক্ত, সার্থক, সাহসী ও উদাহরণস্থানীয় সন্তান।
দেশের কতক ঘটনা বালক মানিকের জীবনকে সম্পূর্ণভাবে ঘুরিয়ে দেয় এবং তার ফলেই সেই বালকটি ক্রমে রূপান্তরিত হন ছাত্রনেতা, শ্রমিকনেতা ও নন্দিত জননেতায়। ভারত ভাগ-বাংলা ভাগ যখন হয় তখন মানিকের বয়স ৯ বছর। পিতার কর্মস্থল ও জন্মস্থান জলপাইগুড়ির চা বাগানে তখন তিনি ক্লাস ফাইভে পড়েন। ভালোই ছিলেন সবাই মিলে সেখানে। পাকিস্তানে আসার ইচ্ছা ছিল না পরিবারটির। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়ে আততায়ীর গুলিতে মারা গেলেন চা বাগানের মালিক বিখ্যাত নবাব পরিবারের সন্তান চট্টগ্রামের মোশাররফ হোসেন সাহেব। ভয়ে জরোসরো হয়ে গেলো পরিবারটি। সাধে কি আর কেউ দেশ আর ভিটেমাটি ছাড়ে!
রাতারাতি ঘরবাড়ি যা আছে সব বিক্রি করে পরিবারটি চলে এলো পূর্ব পাকিস্তান। গ্রামের বাড়ি ফেনীতে যাওয়া ছাড়া উপায় রইল না। কিন্তু বেকে বসলেন ¯েœহময়ী কল্যাণময়ী মা। ফেনীর গ্রামের বাড়িতে চলে গেলে ভাই-বোনসহ সাথের খালাতো-মামাতো-ফুফাত ভাইদের লেখাপড়া হবে না। জোর করে মা গিয়ে উঠলেন ঢাকায় মামার বাড়িতে। কিছুদিন পর বাড়ি কেনা হলো গোপীবাগে। ভর্তি হলেন নবাবপুরের প্রিয়নাথ স্কুলে (পরে নবাবপুর গভর্নমেন্ট হাই স্কুল)। মা-ই যেন বুকের ধন মানিককে ‘মাইনক্যা’ হতে এগিয়ে দিলেন।
কিন্তু প্রিয়নাথ স্কুলে তিনি পড়তে পারলেন না। ১৯৫০ সালের দাঙ্গায় ধর্মান্ধ কসাইদের হাতে নিহত হলেন হেমন্তচন্দ্র বিশ^াসসহ অগণিত নিরীহ মানুষ। বন্ধ হয়ে গেলো প্রিয়নাথ স্কুল। এরপর তিনি লক্ষ্মীবাজার মুসলিম হাই স্কুলে ভর্তি হলেন অষ্টম শ্রেণীতে। ইতোমধ্যে ফাঁকা জায়গা পেলেই খেলাধুলা করা, গোপীবাগের বিশাল লাইব্রেরিতে বই পড়া, নাটকের প্রম্পটার-পরিচালক হওয়া, দেওয়াল পত্রিকা ‘সংকেত’ বের করা প্রভৃতিতে মেতে রইলেন। বই পড়ে হয়ে গেলেন ব্রিটিশ তথা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী।
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে যখন গুলিতে শহীদ হলো কয়েকজন, তখন স্কুল ছাত্র মানিক বন্ধুদের সাথে পাড়ায় লংজাম্প-হাইজাম্প খেলছিলেন। পরের দিন মিছিলে যোগ দিলেন। এভাবেই এক সময় জড়িয়ে পড়লেন বামপন্থী গণতান্ত্রিক যুবলীগের রাজনীতিতে। শুরু থেকেই গোপন পত্রিকা-বই পড়া, পোস্টার লেখা ও সাঁটা, মিছিলে যাওয়া, সেøাগান দেওয়া প্রভৃতি কাজের সাথে যুক্ত হলেন। এসবের মাধ্যমে দেশপ্রেম ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার পাঠ নিতে থাকলেন। এদিকে পরিবারের আর্থিক অনটন, বাস্তুচ্যুত পরিবারের এটাইতো ছিল নিয়তি। তাই ইন্টারমিডিয়েট পাশের পর লেখাপড়ায় গ্যাপ দিয়ে নিলেন ছোট্ট এক বেসরকারি চাকরি। এসবের ভেতর দিয়ে তখনকার সময়ের সব ধরনের অভিজ্ঞতায় পুষ্ঠ হয়ে পরে এক সময় ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে।
আইয়ুবের সামরিক শাসনের মধ্যে পূর্ব বাংলার তখন দমবন্ধ অবস্থা। ছাত্র-জনতার বুকে তুষের আগুন জ্বলছে। দেশমাতা তখন মানিককে তাঁকে মুক্ত করার মহাউৎসবে সামিল করলেন। এমন এক ইতিহাসনির্দিষ্ট সময়ে মানিকের মতো এমন একটি বন্ধু পরিবেস্টিত, কর্মচঞ্চল, পড়ুয়া, মেধাবী, উদ্যোগী, বিজ্ঞানমনস্ক, সাহসী ছেলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হলেন। তিনি জনপ্রিয় নেতা হবেন না তো কে হবেন? বিশ^বিদ্যালয়ের রাসটিকেট বা পুলিশের গ্রেফতার বা গুলির ভয় তুচ্ছ করে মানবমুক্তির সংগ্রামে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখা এমন অকুতভয় ছেলে ছাড়া কি কেউ করতে পারে!
মিলন ঘটলো মোহাম্মদ ফরহাদ-সাইফউদ্দিন মানিকের। ষাটের একুশে ফেব্রুয়ারি ও একষট্টির রবীন্দ্র জন্মশতবাষির্কী পালন, বাষট্টি-চৌষট্টির ছাত্র আন্দোলন, চৌষট্টির দাংগা ও পয়ষট্টির ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও কর্মতৎপরতা, ছিষট্টির ৬-দফা আন্দোলন, ঘূর্ণীঝড়-জলোচ্ছাসে মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রভৃতি সাইফউদ্দিন মানিককে পোড় খাইয়ে সংগ্রামী ছাত্রনেতা হিসেবে পরিণত করে তুললো। এরপর পরিবারিক মানিক নামটিকে যথার্থ প্রমাণ করে উনসত্তরে বাঙালি জাতির গণঅভ্যুত্থানের প্রধান নেতাদের একজন হয়ে উঠলেন। পড়ে হলেন শ্রমিক নেতা, একসময় জাতীয় নেতা।
ওই অগ্নিঝড়া দিনগুলো আর সেই সাথে তাঁর সুদীর্ঘ বর্ণাঢ্য সংগ্রামী জীবনের সবটাই এখন ইতিহাস। আমাদের দেশের জাতীয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে এমন নেতা বিরল, যিনি ছাত্র-সাংস্কৃতিক-শ্রমিক আন্দোলনে জাতীয়ভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ক্রীড়া-সংস্কৃতি-রাজনীতি যে অঙ্গনে যখন ছিলেন সেই অঙ্গনেই তিনি ছিলেন মধ্যমণি। ইতোমধ্যে বুড়িগঙ্গা দিয়ে অনেক পানি বঙ্গোপসাগরের দিকে বয়ে গেছে। সময়ের বিবর্তনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত বিপ্লবের পটভূমিতে সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার বিপর্যয় ও ঠা-াযুদ্ধ যুগের অবসানের ভেতর দিয়ে নব্বইয়ের দশকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্বপ্নভঙ্গ হলো। এতে বাস্তব পরিস্থিতি ও চিন্তা চেতনার তখন আমূল পরিবর্তন ঘটে। এর প্রভাব পড়ে আমাদের দেশের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোতে। সবচেয়ে বেশি পড়ে আন্তর্জাতিক দল হওয়ায় কমিউনিস্ট পার্টিতে। তখন তিনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান নেতা।
বিশ^ ও জাতীয় প্রেক্ষাপটে যখন এমন অবস্থা এবং জাতীয় নেতাদের একজন, তখন ৮, ৭ ও ৫ দলের যুগপৎ আন্দোলনে দেশে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হলে স্বৈরাচরের পতন হয়। লক্ষনীয় এই যে, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি আর ব্যাপ্তি ও গভীরতা আর প্রভাবের তুলনায় কম হলেও নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক। এটা ছিল মানিক ভাইসহ তাঁর প্রজন্মের জাতীয় মূলধারা রাজনীতির সহযোদ্ধাদের পরম পাওয়া এবং মানিক ভাইয়ের বিশেষ সৌভাগ্য। গণঅভ্যুত্থাণের ভেতর দিয়ে স্বৈরাচারের পতন দেশের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। নির্বাচনের মুখোমুখি হয় জাতি। এতে সবচেয়ে কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়ে কমিউনিস্ট পার্টি।
কেননা যে দলটি দেশের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখলো, সেটি কর্মীভিত্তিক দল হওয়ায় এবং জনসমর্থন বেশ সীমিত থাকায় নির্বাচনের মাঠে নেমে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো। কতটা দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, তা অনুধাবন করা যাবে একশীলা চরিত্র বৈশিষ্টের কমিউনিস্ট পার্টির চার মার্কা নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ভেতর দিয়ে। প্রকৃত বিচারে আন্তর্জাতিকভাবে বাম ও কমিউিনিস্ট রাজনীতির আমূল পরিবর্তন ও ঝড়ো আবাহাওয়ার মধ্যে জাতীয় রাজনীতিতে কমিউনিস্ট পার্টির এই হাল দলের ভাঙনকে অনিবার্য করে তোলে। তারপর তিনি বিকল্প ধারা গড়ে তোলার লক্ষ্যে গণফোরাম করে রাজনীতির পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নামেন।
এই সময়ে বিএনপি ছিল ক্ষমতায়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাথে যুগপৎ আন্দোলনের সময় সাইফউদ্দিন মানিকের একটা দেশি হিসাবে নৈকট্য দাঁড়িয়েছিল। তিনি তাঁকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রীপদ নিতে বলেছিলেন। কিন্তু তা তিনি দৃঢ়ভাবে হাস্যরসের ভেতর দিয়ে প্রত্যখ্যান করেছেন। ওই দিনগুলোতে তিনি বঙ্গবন্ধুর ¯েœহ-আদর ও ‘মাইনক্যা’ ডাক স্মরণে এনে নিকট সাথীদের বলতেন, সারা জীবন বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে ছিলাম। পাকিস্তানি মার্কা জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধেইতো আমাদের আজন্ম লড়াই। জাতীয় চারনীতি ও বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয় নাই। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার হলো না। মূলধারার বাইরে গিয়ে রাজনীতি করা আর পরাজিত হওয়া এক কথা। নিয়ত ঠিক রাখতে হবে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিয়ত তাঁর ঠিকই ছিল।
প্রকৃত বিচারে তত্ত্বকথা বা কোনো মতবাদের বেড়াজাল নয়, নিজের সংগ্রামী জীবনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সহজাত বিবেচনায় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ গরীর শ্রমিক-কৃষক-ক্ষেতমজুরদের দুঃখকষ্ট বিবেচনায় নিয়ে সাম্যের আদর্শে তিনি ছিলেন স্থির, শিকড় থেকে কখনও বিচ্যুত হননি এবং তাঁর সাথীরাও বিচ্যুত হোক চাননি। তিনি সুদৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে কোনো ভবিষ্যৎবক্তা না হয়ে সবিনয়ে কমিউনিস্ট পার্টির ভাঙনের দিনগুলোতে কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় সভাপতির ভাষণে যা বলেছিলেন এর মূল কথা হলো: বিদ্যমান বিশ^ ও জাতীয় বাস্তবতায় দলের ভেতরে ভিন্নমত বা দ্বিমত হওয়া কোনো অস্বাভাবিক নয়। ভাঙন অনিবার্য হয়ে গেছে। যদি জাতীয় ভিত্তিতে দল করার বিষয়ে আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা না টেকে এবং কমিউনিস্ট পার্টির বিপ্লবের কর্মসূচি জয়যুক্ত হয়, বঙ্গভবনে লাল পতাকা ওড়ে, আমরাই হবো সবচেয়ে খুশি। আবার নত মস্তকে বিপ্লব জিন্দাবাদ দিয়ে পার্টির পেছনে সমবেত হবো। তবে এই কথা বলেই তিনি ও তাঁর সাথীরা বসে থাকেননি।
তিনি তাঁর সাবেক দল কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়ে আসা বিভিন্ন চিন্তা-দল-মতের সাথীদের একত্র রাখার উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে তোলেন ‘মণি সিংহ- ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্ট’। যে প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে, রাজনৈতিক- সামাজিক অঙ্গনে ‘জাতীয়তাবাদ গণতন্ত্র সামজিক ন্যায়বিচার ও সাম্য প্রতিষ্ঠা’র জন্য স্বউদ্যোগে এবং ওই ধরণের ‘সকল প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানসমূহকে সহযোগিতা ও উৎসাহ প্রদান এবং আর্থিক ও বৈষয়িক সাহায্য প্রদান।’ প্রসঙ্গত বলতেই হয়, রাজনীতিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা কিংবা মণি সিংহ-ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্ট নিয়ে অগ্রসর হওয়ার জন্য অনিবার্য কারণে তেমন সুযোগ ও সময় তিনি তেমন পান নাই।
হঠাৎই তিনি দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং অকালে শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেন। সার্বিক বিচারে তিনি যেমন কালের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন, তেমনি কাল পরিবর্তনের বলি তথা ভাগ্যহতদেরও একজন। দেশকে স্বাধীন করার সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে সামনের সারিতে থাকলেও স্বাধীন দেশকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখতে পারেননি। মানিকভাইয়ের ভাষায়ই বলতে হয়, ‘সাইডলাইনে’ তাকে খেলতে হয়েছে। প্রকৃত বিচারে মানিক ভাইয়ের জীবন ও কর্মের ইতিহাস হচ্ছে দেশের একটি কালপর্বের ইতিহাস।
মণি সিংহ-ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্টের প্রকাশনা সংস্থা সমাজ বিকাশ প্রকাশনী — তম মৃতুদিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ‘ সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক ’ স্মারকগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করছে। স্মারক গ্রন্থটির যদি বিশেষভাবে তরুণদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে অতীতের শিকড়ের সন্ধান তারা পাবেন এবং মানিক ভাইয়ের আদর্শ জাতীয় চার মূলনীতির সার্বিক বাস্তবানের সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার অনুপ্রেরণা লাভ করবেন। মানিকভাইয়ের প্রতি জানাই সশ্রদ্ধ প্রণতি । শেখর দত্ত ঃ ফেইসবুক ওয়াল থেকে




