নারীরা এখন আর কোনো কাজে পিছিয়ে নেই বলা হয় আমাদের সমাজে। কিন্তু আজ থেকে শত বছর আগেও নারীরা নানা রকম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ গুলো করেছে, তার মধ্যে একটি হলো গুপ্তচরবৃত্তি। গোপন তথ্য হতিয়ে নিতে তারা ব্যবহার করতেন নানা ধরণের কৌশল। এখন হোক তা প্রেমের ফাঁদ আবার প্রয়োজনের হয়ে ওঠেন ভয়ংকর ও দুর্ধর্ষ।
ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা টেলিগ্রাফ প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিভিন্ন দেশের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির কাজ করেছেন এমন ৫ জন দুর্ধর্ষ নারীর গল্প তাদের প্রতিবেদনে তুলে ধরেছন।
মাতা হারি
আজ থেকে ১০২ বছর আগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল মাতা হারির। আজও তাকে ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বা কুখ্যাত নারী গুপ্তচর বলা হয়। এখন পর্যন্ত মাতা হারিকে নিয়ে ২৫০টিরও বেশি উপন্যাস, টিভি সিরিজ, ছবি এবং মঞ্চনাটক তৈরি হয়েছে।
তিনি ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য এক রূপসী। তার নাচের সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশটি ছিল নাচতে নাচতে ধীরে ধীরে শরীরের সমস্ত কাপড় খুলে ফেলা। শেষে শুধু বক্ষবন্ধনী আর কয়েকটি গহনা অবশিষ্ট থাকত শরীরে। নগ্নতাকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন শিল্পের পর্যায়ে। তার এই অভিনব ‘নগ্ন’ নাচ দেখার জন্য বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, জেনারেল, শিল্পপতিরা উন্মুখ হয়ে থাকতেন। এক সময় তিনি পুরুষদের কাছে খুবই মোহনীয় এবং কামনার মানুষ হয়ে উঠলেন। মাতা হারিও তাদের সঙ্গে তৈরি করতেন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এভাবে তিনি যেসব গোপন তথ্য জানতে পারতেন তা হাতবদল করতে গিয়ে হয়ে ওঠেন এক ভয়ংকর গুপ্তচর।
মাতা হারি কিন্তু তার আসল নাম নয়। ১৮৭৬ সালে নেদারল্যান্ডসে জন্মের পর বাবা-মা তার নাম রাখেন মার্গারেথা। কিশোরী বয়সে তার বাবা হঠাৎ ধনসম্পদ হারিয়ে সংসার ত্যাগ করেন আর কিছু দিন পরে মাও মারা যান। এমন অবস্থায়, আত্মীয়-স্বজনের কাছে আশ্রয় পান তিনি। এরপর ১৮ বছর বয়সে রুডলফ জন ম্যাকলিওড নামে ডাচ সেনার সঙ্গে বিয়ে করে ইন্দোনেশিয়ার জাভায় চলে যান। কিন্তু নির্যাতন চালানোর কারণে একসময় স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হন। ২৭ বছর বয়সে প্যারিসে তিনি বেছে নেন নর্তকীর জীবন। সেখানেই তার নাম হয় মাতা হারি। তার নাচের ধরন সে সময় প্যারিসে বেশ জনপ্রিয় হয়।
১৯০৫ থেকে ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সেলিব্রেটির মর্যাদা লাভ করেন। ফ্রান্সের প্রথম সারির কূটনীতিক থেকে শুরু করে জার্মানির যুবরাজ পর্যন্ত ছিলেন মাতা হারির স্বপ্নে বিভোর। তার নাম তখন সকল পুরুষের মুখে মুখে। বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তার জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগায় জার্মানি। তাকে ফরাসিদের গোপন তথ্য দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। তিনি বহু সেনাসদস্য, রাজনীতিবিদ, অভিজাত ও শিল্পপতিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ করেন।
কিন্তু এক সময় তাকে সন্দেহ হলে ফরাসি গুপ্তচর বিভাগের জর্জ লুডোক্স তাকে ফ্রান্সের হয়ে গুপ্তচর হওয়ার প্রস্তাব দেন। এটিই তার জন্য কাল হয়। বলা হয় ডাবল এজেন্ট হিসেবে কাজ করতে গিয়ে ১৯১৭ সালে মাতা হারি গ্রেপ্তার হন। তার কাছে থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে জার্মান চেক পাওয়ার অভিযোগে তার বিচারের করা হয়। ডাবল এজেন্টের ভূমিকা পালন করা এবং জার্মানিদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ধরা পড়ায় ১৯১৭ সালে ফায়ারিং স্কোয়াডে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
ভার্জিনিয়া হল
১৯৩৩ সালে তুরস্কে শিকার করতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত গুলি লাগে এক তরুণীর পায়ে। ২৭ বছর বয়সী সেই তরুণী তখন ছিলেন তুরস্কের ইজমির শহরে আমেরিকান দূতাবাসের ক্লার্ক। গুলির পর হাঁটুর নিচের অংশ পুরোটাই কেটে ফেলে দিয়ে কাঠের নকল পা লাগানো হয়। সেই নকল পা নিয়েই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়টাতে ফ্রান্সে গুপ্তচরবৃত্তি করেছেন মিত্রশক্তির পক্ষ নিয়ে। নাৎসিদের ঘুম হারাম করে দিয়েছিলেন, শত্রুপক্ষের কাছে তিনি ‘দ্য লিম্পিং লেডি’ নামে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু শত চেষ্টার পরও নাৎসি বাহিনী তাকে ধরতে পারেনি। অন্য ধাতুতে গড়া সেই তরুণীর নাম ছিল ভার্জিনিয়া হল।
১৯০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরের এক ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। স্নাতক সম্পন্ন করেন ওয়াশিংটন ডিসির আমেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে। পা হারানোর পর ক্লার্কের চাকরি ছেড়ে প্যারিসে চলে যান। সেই সময়টাতে ইউরোপ জুড়ে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তিনি সে সময় যুদ্ধের ময়দান থেকে আহত সৈন্যদের অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে আসতেন নিরাপদ জায়গায়। ফ্রান্সের পরাজয়ের পর তিনি ইংল্যান্ডে পালিয়ে যান। এ সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল গুপ্তচরবৃত্তির জন্য ‘স্পেশাল অপারেশন্স এক্সিকিউটিভ’ বা এসওই গঠন করেন। সেখানেই যোগ দেন ভার্জিনিয়া। জারমেইন ছদ্মনামে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য ফরাসি-আমেরিকান রিপোর্টার হিসেবে যান ফ্রান্সে। সেখানে তিনি তার দায়িত্ব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পালন করেন। যেমন, মিত্রবাহিনীর বিমানচালকদের প্যারাস্যুট দিয়ে নামার নিরাপদ জায়গা চিনিয়ে দেওয়া, কারাগার ও ক্যাম্প থেকে যুদ্ধবন্দিদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করা।
সে সময় ওই এলাকার দায়িত্বে আসেন গেস্টাপোর কুখ্যাত ক্লস বার্বি। তিনি ঠিকই খুঁজে বের করেন এক খোঁড়া মহিলা এসবের জন্য দায়ী। তিনি ভার্জিনিয়ার ছবি পুরো ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে দেন এবং ধরিয়ে দেওয়ার কথা জানান। ভার্জিনিয়া তখন ফ্রান্স ছেড়ে স্পেনে পালান। সেখান থেকে লন্ডনে। তারপর আবার স্পেনে।
সেখান থেকে এক সময় আবার তিনি ফ্রান্সে যান, সেটা ১৯৪৪ সালে। তবে এবার এক খোঁড়া বৃদ্ধার ছদ্মবেশে। সেখানকার একটি গ্রামে তিনি গরু পরিচর্যা করতেন, পনির বানাতেন। সে সময় তার কাজ ছিল রেডিও অপারেটর হিসেবে তথ্য পাচার করা এবং জার্মানদের আক্রমণ করার জন্য একটি বাহিনী গড়ে তোলা। ভার্জিনিয়া তার বাহিনী নিয়ে চারটি সেতু ধ্বংস করেন, মালবাহী রেলগাড়িকে লাইনচ্যুত করেন, বিভিন্ন স্থানের রেললাইন মারাত্মকভাবে ধ্বংস করেন এবং টেলিফোন লাইনও বিচ্ছিন্ন করে দেন।
যুদ্ধ শেষ হলে তিনি বিয়ে করেন সিআইএর আরেক এজেন্ট পল গয়লটকে। এরপর তিনি সিআইএর বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৬ সালে বাধ্যতামূলক অবসরের পূর্ব পর্যন্ত সিআইএতেই কাজ করেন। ১৯৮২ সালে তিনি মারা যান।
তার জীবনী নিয়ে লেখা হয়েছে অনেক বই। তার মধ্যে অন্যতম হলোÑ ‘উলভস অ্যাট দ্য ডোর’, ‘এ ওমেন অব নো ইম্পরট্যান্স’। তাকে নিয়ে বানানো হয়েছে চলচ্চিত্রও।
ক্রিস্টিনা স্কারবেক
বিখ্যাত জেমস বন্ড সিরিজের কথা মনে আছে? বলা হয়ে থাকে সিরিজের অমর স্রষ্টা ইয়ান ফ্লেমিং তার প্রথম বইয়ের একটি চরিত্র ভেসপার লিন্ড সৃষ্টির অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন ক্রিস্টিনার জীবন থেকে। ব্রিটিশ স্পেশাল অপারেশনের হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বেশ কিছু সাহসী অভিযান পরিচালনা করেন ক্রিস্টিনা স্কারবেক। দুর্দান্ত মেধাবী এই গুপ্তচরকে বিশ্বযুদ্ধের পর হত্যা করা হয়। আবার এমনও বলা হয় তিনি নিজেই আত্মহত্যা করেছেন।
তার আসল নাম ক্রিস্টিনা গ্রানভিলে। ১৯০৮ সালে পোল্যান্ডের এক সচ্ছল পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন উচ্চপদস্থ একজন ব্যাংকার। মাত্র ২০ বছর বয়সে ক্রিস্টিনা বিয়ে করেন। তবে তার সেই বিয়ে সুখের হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পোল্যান্ডের আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগে ঢুকে পড়েন।
ক্রিস্টিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বেশ কিছু সাহসী অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। সে জন্য তিনি ছিলেন নাৎসিদের মোস্ট ওয়ান্টেড লিস্টে। তার সবচেয়ে সাহসী অভিযান ছিল এক উদ্ধার অভিযান। ঘটনাটি ফ্রান্সের। ১৯৪৪ সালের আগস্ট মাস, ক্রিস্টিনা ফ্রান্সের এক গেস্টাপো নিয়ন্ত্রিত জেলখানায় ঢুকে পড়েন। সেই জেলে বন্দি থাকা ৩ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত স্পাইকে মুক্ত করে আনেন।
তার গুপ্তচরবৃত্তির বিশেষত্ব ছিল সেনা সদস্যরা কখন কোন পথ পাড় হবে সে সম্পর্কে নিখুঁত তথ্য জোগাড় করা। তার দেওয়া তথ্য ধরেই হামলা পরিচালনা করা হতো। একবার তথ্য নিয়ে পালানোর সময় নাজিদের হাতে গ্রেপ্তার হন। তবে তিনি কারাগার থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন।
১৯৪১ সালে আরেকবার শত্রুর হাতে ধরা পড়েন ক্রিস্টিনা। সে সময় তিনি নিজের জিহ্বা কামড়ে রক্ত বের করে আটককারীকে জানান তিনি যক্ষ্মায় আক্রান্ত। নানা সময় নানাভাবে বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজ করে গেছেন ক্রিস্টিনা।
একসময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। তাকে তার সাহসিকতার জন্য দেওয়া হয় বিভিন্ন পদক ও সম্মাননা। কিন্তু তখনো ব্রিটিশ নাগরিকত্ব তিনি পাননি। নানা কারণে তিনি বেশ এলোমেলো জীবনযাপন করছিলেন। ১৯৫২ সালের একসময় নেন সমুদ্রগামী এক জাহাজে স্টুয়ার্ডসের চাকরি। চাকরিতে প্রবেশের আগের রাতে তিনি ছিলেন লন্ডনের একটি হোটেলের কক্ষে। সকালে হোটেল কক্ষ থেকে তার রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। কেউ বলেন, তিনি নিজে আত্মহত্যা করেছিলেন। কেউ বলে তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে।
ন্যান্সি ওয়েক
ব্রিটিশ এজেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কাজ করেছেন। ১৯৪২ সালে গেস্টাপো বাহিনীর মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার শীর্ষে ছিলেন ন্যান্সি ওয়েক। তার মাথার দাম ঘোষণা করা হয়েছিল ৫০ লাখ ফ্রাঙ্ক। জার্মানরা তাকে ডাকত সাদা ইঁদুর (ডযরঃব গড়ঁংব) নামে।
১৯১২ সালের ৩০ আগস্ট নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনে জন্মগ্রহণ করেন ন্যান্সি। তার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল সাংবাদিক হিসেবে। ফরাসি এক শিল্পপতিকে বিয়ের পর তিনি সাংবাদিকতাকে বিদায় জানান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়টাতে তিনি যোগ দেন ব্রিটিশদের পক্ষে অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে। ফ্রান্সে আহত ব্রিটিশ সৈন্যদের গোপনে পরিবহনের কাজ করতেন। পাশাপাশি যুদ্ধাহতদের সেবা, তাদের পালাতে সাহায্য করা, গোপন বার্তা বহন করা এমনকি সৈন্যদের বিভিন্ন ধরনের নকল কাগজপত্র যেমন- পাসপোর্ট, ভিসা, পরিচয়পত্র তৈরি করে দিতেন।
তার দায়িত্ব তিনি এত সুচারুরূপে করতেন যে কেউ তাকে সন্দেহ পর্যন্ত করতে পারেনি। তিনি গড়ে তোলেন সাত হাজার যোদ্ধার একটি দল। এ দলটি প্রায়ই গেস্টাপোদের ওপর হামলা চালাত। গোপন তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হঠাৎই একবার ধরা পড়েন ন্যান্সি। কিন্তু নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সেখান থেকে ছাড়াও পেয়ে যান।
নিজের কৌশল সম্পর্কে ন্যান্সি বলেছিলেন, আমি যখন জার্মান বাহিনীর তল্লাশি চৌকি পার হতাম তখন মুখে পাউডার মেখে, মদ খেয়ে মাতাল হওয়ার ভান করতাম এবং জার্মানদের বলতাম, তোমরা আমাকে সার্চ করতে চাও?
সেখান থেকে ফিরে যোগ দেন ব্রিটেনের স্পেশাল অপারেশনস এক্সিকিউটিভ (এসওই)-তে। ন্যান্সির খোঁজ না পেয়ে তার স্বামীকেও হত্যা করা হয়েছিল।
যুদ্ধের পরপরই ওয়েক অনেক পুরস্কারে ভূষিত হন। তার মধ্যে জর্জ মেডেল, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা পুরস্কার, মেদেলি দে লা রেসিস্টেন্স এবং তিনবার ক্রোইস ডি গ্যারে। যুদ্ধ শেষ হলে ব্রিটিশ বিমান মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি নেন ন্যান্সি। ২০১১ সালের ৭ আগস্ট ৯৮ বছর বয়সে মারা যান এই দুঃসাহসী নারী গোয়েন্দা।
নূর ইনায়েত খান
শিশুদের জন্য গল্প ও ছড়া লিখতেন নূর ইনায়েত খান। তিনিই একসময় হয়ে ওঠেন দুর্ধর্ষ এক গোয়েন্দা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনী দখলকৃত ফ্রান্সে যুক্তরাজ্যের স্পেশাল অপারেশন্স এক্সিকিউটিভের (এসওই) হয়ে কাজ করেন এই দুঃসাহসী নারী।

নূর ইনায়েত খানের মা আমেরিকান, বাবা ভারতীয়। বাবা হযরত ইনায়েত খান ছিলেন সুফিবাদের শিক্ষক। ১৯১৪ সালে রাশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন ও ফ্রান্সে বেড়ে ওঠেন নূর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নূর ইনায়েতের পরিবার চলে আসে লন্ডনে। কিন্তু তারপর আবার ফ্রান্সে ফিরে যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে নূর ও তার ভাই বেলায়েত নাৎসিদের বিরুদ্ধে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। তখন ফ্রান্স ছিল মিত্রশক্তির অন্তর্ভুক্ত। নূর যোগ দেন উইমেন’স অক্সিলিয়ারি এয়ার ফোর্সে। প্রথমে তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় অয়্যারলেস অপারেটর হিসেবে।
নূর ছিলেন খুবই নরম প্রকৃতির। তাই তার উচ্চপদস্থরা ধারণা করেছিলেন নূর গোয়েন্দা হিসেবে সফল হবেন না। কিন্তু তার কাজের দক্ষতা দেখে স্পেশাল অপারেশন এক্সিকিউটিভ (ফ্রান্স) শাখায় গুপ্তচর হিসেবে নূরকে পাঠানো হয়। সেখানে তার সাংকেতিক নাম ছিল ‘মেডেলিন’। প্যারিসে যখন অয়্যারলেস অপারেটররা একের পর এক গ্রেপ্তার হচ্ছিল নূর তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই জার্মানদের সঙ্গে মিশে যেতেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, পার্টিতে তাকে হরহামেশাই দেখা যেত। আর প্রতি মুহূর্তের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাঠাত লন্ডনে।
এক সময় নূর ধরা পড়েন। নূরের ওপর চলে অমানুষিক অত্যাচার। কিন্তু তিনি একটি তথ্যও ফাঁস করেননি। কোমল নূর তখন এতটাই কঠোরভাবে সব মুখ বুজে সহ্য করেন যে নাৎসিরা তাকে ‘ভয়ংকর বিপজ্জনক’ নাম দিয়েছিল। হাতে-পায়ে বেড়ি পরিয়ে প্রচণ্ড অত্যাচার করা হতো তাকে। একসময় আরেক সঙ্গীসহ তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ডাকাও কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে এবং পরবর্তী সময়ে সেখানেই তাদের মেরে ফেলা হয়।
১৯৪৯ সালে মরণোত্তর জর্জ ক্রস সম্মানে ভূষিত হন নূর। এটিই ব্রিটেনের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান। পৃথিবীতে মাত্র চার জন নারী এখন পর্যন্ত এই সম্মান পেয়েছেন।
বাংলা




