
পতাকা ডেস্ক : কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের ১৩টি দানবাক্স থেকে এবার রেকর্ড পরিমাণ ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা পাওয়া গেছে। এছাড়াও মিলেছে বিপুল পরিমাণ সোনা-রূপার অলঙ্কার ও বৈদেশিক মুদ্রা।
শনিবার (২৭ জুন) দিনব্যাপী গণনা শেষে এ তথ্য জানায় মসজিদ কর্তৃপক্ষ। দানবাক্স থেকে প্রাপ্ত অর্থ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
শনিবার সকাল ৭টায় কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন দানবাক্সগুলো খুলে দেন। পরে সেগুলো থেকে পাওয়া অর্থ ৪৩টি বড় বস্তায় ভরে মসজিদের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে গণনা করা হয়। রাত পৌনে ৯টার দিকে গণনার কাজ শেষ হয়।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও দানবাক্স খোলা কমিটির আহ্বায়ক মো: এরশাদুল আহমেদের তত্ত্বাবধানে দানবাক্সগুলো খোলা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো: ইশতিয়াক ইমন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো: শরিফুল হক, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুল হাসান মারুফ ও কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ ভূঁইয়াসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) সোহানা নাসরিন জানান, গণনা শেষে অর্থ রূপালী ব্যাংকে পাগলা মসজিদের হিসাবে জমা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত (গতকালের টাকা নিয়ে) দানবাক্স থেকে প্রাপ্ত অর্থের মধ্যে মসজিদের তহবিলে মোট ১৩০ কোটি তিন লাখ ৮৭ হাজার ৪৯৮ টাকা জমা রয়েছে। এছাড়া দানবাক্সে পাওয়া সোনা, রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রা সিলগালা করে জেলা ট্রেজারিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
পাগলা মসজিদে সাধারণত তিন মাস পরপর দানবাক্স খোলা হলেও এবার ছয় মাস পর খোলা হয়। দীর্ঘ সময় পর খোলা হওয়ায় দানবাক্সগুলোতে টাকা উপচে পড়ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এর আগে, সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর দানবাক্স খুলে ৩৫ বস্তায় ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৭৮ টাকা পাওয়া যায়। তারও আগে ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট ৩২ বস্তায় ১২ কোটি নয় লাখ ৩৭ হাজার ২২০ টাকা পাওয়া গিয়েছিল। ওই সময়ও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, সোনা ও রুপা পাওয়া যায়।
মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানায়, টাকা গণনার কাজে পাগলা মসজিদসংলগ্ন মাদরাসার ১১০ জন, আল-জামিয়াতুল ইমদাদিয়া মাদরাসার ৩০০ জন শিক্ষার্থী, পাগলা মসজিদের ৩৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রূপালী ব্যাংকের ১৩০ জন কর্মকর্তা অংশ নেন। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় অর্ধশত সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, দানবাক্স খোলা, অর্থ বস্তায় ভরা, গণনা এবং ব্যাংকে নিরাপদে পৌঁছে দেয়াসহ পুরো প্রক্রিয়ায় পুলিশ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। এ কার্যক্রম তিনি নিজেও সরাসরি তদারকি করেছেন।
পাগলা মসজিদে দান করলে মনের আশা পূরণ হয়— এমন বিশ্বাস থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এখানে দান করতে আসেন। মুসলমানদের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও এ মসজিদে দান করে থাকেন। নগদ অর্থের পাশাপাশি সোনা-রুপার অলঙ্কার, বৈদেশিক মুদ্রা, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, কোরআন শরিফ, মোমবাতি ও বিভিন্ন সামগ্রীও দান করা হয়।
তবে দানবাক্স খুলে টাকার পরিমাণ প্রকাশ করা হলেও প্রাপ্ত অলঙ্কার কিংবা নিলামে বিক্রি হওয়া হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলসহ অন্যান্য সামগ্রীর আর্থিক মূল্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না। এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের অনেকের দাবি, স্বচ্ছতার স্বার্থে দানবাক্সের টাকার হিসাবের পাশাপাশি নিলামকৃত সামগ্রী বিক্রি করে কত অর্থ পাওয়া যায়, সেই তথ্যও নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা উচিত।
এছাড়া পাগলা মসজিদের নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও দান করা যায়। ২০২৫ সালের ৪ জুলাই চালু হওয়া www.paglamosque.org ওয়েবসাইটে মসজিদের ইতিহাস, নামাজের সময়সূচিসহ বিভিন্ন তথ্য জানা যায় এবং ঘরে বসেই দান করার সুযোগ রয়েছে।
পাগলা মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাগলা মসজিদের টাকায় ২০০২ সালে মসজিদের পাশেই একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বর্তমানে এই মাদ্রাসায় ১৩০ জন এতিম শিশু পড়াশোনা করছে। মসজিদের টাকায় তাদের যাবতীয় ভরণপোষণ ও জামাকাপড় দেওয়া হয়। ওয়াকফ স্টেটের অডিটর দ্বারা প্রতি বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসে পাগলা মসজিদের আয়-ব্যয়ের অডিট করা হয়।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পাগলা মসজিদের অর্থায়নে কিশোরগঞ্জে ১০ তলাবিশিষ্ট একটি আধুনিক ইসলামী কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সেখানে এতিম ও আশ্রয়হীন শিশুদের শিক্ষা, আধুনিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা,পাঠাগার, ক্যাফেটেরিয়া, আইটি সেকশনসহ বিভিন্ন সুবিধা থাকবে। ইতোমধ্যে কমপ্লেক্সের নকশা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু হবে।




