মোঃ আব্দুর রব মনসুর, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: যে যমুনা একদিন সর্বগ্রাসী রূপে কেড়ে নিয়েছিল ভিটেমাটি, ভাসিয়ে নিয়েছিল জীবনের সঞ্চয়; সেই যমুনাই আজ ফিরিয়ে দিচ্ছে বুকভরা আশা। মহাস্রোত যমুনার রুদ্র গ্রাসে সর্বস্ব হারানো চরের মানুষের জীবনে এখন নতুন আশার আলো হয়ে উঠেছে বিন্দু বিন্দু তিল। রাক্ষুসে নদীর বুকে জেগে ওঠা পলিযুক্ত উর্বর মাটি আর প্রকৃতির অনুকূল হাওয়া মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে কৃষকের ঘামে। আর তাতেই যমুনার ধূ ধূ চরাঞ্চলে মূর্ত হয়ে উঠেছে এক সোনালী বিপ্লব—তিল চাষের বিপ্লব।
কিছুদিন আগেও যে চোখগুলোতে ছিল শুধু হারানোর জল, আজ সেখানে চিকমিক করছে নতুন স্বপ্ন। নদী যে পলি ফেলে গেছে, তা যেন কেবল মাটি নয়, বরং প্রকৃতির আশীর্বাদ। এই উর্বর পলিতেই বোনা হয়েছিল তিলের বীজ। কম পরিশ্রম, নামমাত্র খরচ আর প্রকৃতির পরম যত্নে চরের বুকে এখন সবুজের সমারোহ। যমুনার বুক চিরে জেগে ওঠা চরের কৃষকেরা মেহনত আর ভালোবাসায় ফলিয়েছেন বাম্পার ফলন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চরাঞ্চলে তিল চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৪৯০ হেক্টর। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে প্রায় ৫০০ হেক্টর জমিতে তিলের আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উৎপাদিত তিলের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৫৪২ টন।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই তৈলবীজ চাষ যেন তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। অল্প খরচে এত চমৎকার ফলন হবে, তা হয়তো অনেকেই ভাবেননি। তার ওপর বাজারে মিলছে কাঙ্ক্ষিত ও আশানুরূপ দাম। ফলে, প্রতি বছরের চিরচেনা অভাব আর কষ্টের গ্লানি মুছে চরের কৃষকদের ঘরে ঘরে এখন বইছে আনন্দের হাওয়া। দিন দিন এই রূপালী ফসল চাষে আগ্রহ বাড়ছে শত শত কৃষকের। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমি থেকে ৫ থেকে ৬ মণ তিল পাওয়া যাবে। বাজারে প্রতি মণ তিল ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তেকানীচর এলাকার তিলচাষি আকরব হোসেন ও আললাম হোসেন জানান, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার তিলের ফলন অনেক ভালো হয়েছে। মনসুর গ্রামের চাষি জবার হোসেন বলেন, ‘উচ্চফলনশীল বীজ ব্যবহার করায় এবং চরের পলিমাটির গুণের কারণে খুব বেশি সার-কীটনাশক ছাড়াই ভালো ফলন পেয়েছি। বর্তমান বাজারদর ভালো থাকায় খরচ বাদে বেশ লাভ থাকবে। সরকারি সহায়তা পেলে আগামীতে চাষ আরও বাড়াব।’
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শরিফুল ইসলাম জানান, তিল একটি লাভজনক তৈলজাত ফসল। কম উর্বর ও চরাঞ্চলের পলি মাটিতে এটি খুব সহজেই ফলানো সম্ভব। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ ও উন্নত বীজ দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই তিল চাষই চরাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক ভাগ্য বদলে একটি বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
যমুনা হয়তো একূল ভেঙে ওকূল গড়ে, কিন্তু চরের এই সংগ্রামী মানুষগুলো প্রমাণ করেছেন—ভাঙনের শেষ যেখানে, আশার শুরু ঠিক সেখান থেকেই। যমুনার বালুচরে আজ তিলের হাত ধরে রচিত হচ্ছে এক নতুন জীবনকাব্য।