পুলিশে নিয়োগ বাণিজ্য ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে সংস্থাটির সদর দপ্তর। যার চিত্র দেখা যায় এবারের পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে। এজন্য রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সুপারদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন পুলিশের বর্তমান মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী।
সেই মোতাবেক ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিল পুলিশ সদর দপ্তর। ঘুষ লেনদেন বন্ধে ৬৪ জেলায় ৫ স্তরের নজরদারি শুরু হয়। আর এই প্রক্রিয়া চলমান ছিলো পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায়।
এর পরেও দেশের ১২ জেলায় সক্রিয় প্রতারক ও ঘুষ চক্রের সদস্যরা নিয়োগ প্রত্যাশীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। কিন্তু পুলিশের তৎপরতায় অনেকেই ধরা পড়েন অর্থ হাতিয়ে নেয়ার আগেই। এসব প্রতারক চক্রের সদস্যদের পাশাপাশি নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের শতাধিক পুলিশ সদস্যের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে আসে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র মতে, কনস্টেবল পদে নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত থাকায় টাঙ্গাইল, গাজীপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, বগুড়া, খুলনা, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, নড়াইল, কুষ্টিয়া, রংপুর ও গাইবান্ধায় মামলা হয়েছে। এই ১২ জেলায় করা ১৮ মামলায় ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর মধ্যে বগুড়াতেই ৫টি মামলা করা হয়। আর দুটি করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও খুলনায় এবং বাকী গুলোতে একটি করে মামলা হয়। মামলা গুলো করা হয় দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪১৭ ও ৪২০, ১৭০, ১০৯ ও ৩৪ ধারায়।
এদিকে ২১ জুন টাঙ্গাইলে কনস্টেবল পদে চাকরি দেয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা নেয়ার অভিযোগে পুলিশের এসআই মোহাম্মদ আলী এবং কথিত সাংবাদিকের স্ত্রী শাহানাতুল আরেফিন সুমিকে গ্রেপ্তার করে জেলা পুলিশ। মূলত কনস্টেবল পদে নিয়োগ বাণিজ্যের জন্য এটাই ছিলো প্রথম গ্রেপ্তারের ঘটনা।
এরপর তদবির করতে গিয়ে সাময়িক বরখাস্ত হন ঝিনাইদহ পুলিশের কনস্টেবল আবদুল হাকিম। এর দু’দিন পর কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশ ও রংপুর রেঞ্জে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর আগেই অনিয়মে জড়ানোর অভিযোগে ৫ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় জেলা পুলিশ। এর মধ্যে দু’জন পুলিশ কর্তাকে তাৎক্ষণিক বদলি ও তিনজন সিভিল স্টাফকে বরখাস্ত করা হয়।
এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় অনিয়ম ধরা পড়ে মাদারীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) সুব্রত কুমার হালদারের দেহরক্ষী কনস্টেবল নুরুজ্জামান সুমনকে যখন ঘুষের টাকাসহ আটক করে পুলিশ সদর দপ্তরের বিশেষ টিম। এ সময় পুলিশ লাইন্সের মেস ম্যানেজার জাহিদ হোসেন, টিএসআই গোলাম রহমান ও পুলিশ হাসপাতালের স্বাস্থ্য সহকারী পিয়াস বালার কাছ থেকেও ঘুষের ৭২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র আরো জানায়, উদ্ধারকৃত টাকা লেনদেনের ঘটনার সাথে এসপি সুব্রত কুমার হালদারও সম্পৃক্ত ছিলেন বলে প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের ওই বিশেষ টিম। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
রবিবার (১৪ জুলাই) রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে উপ-সচিব ধনঞ্জয় কুমার দাস স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে অভিযুক্ত এসপি সুব্রত কুমার হালদারকে বদলি করে পুলিশ সুপার উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক রংপুর রেঞ্জের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
এ দিকে কুড়িগ্রামে নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রিপন কুমার মোদককে খাগড়াছড়ি ও এসআই আবু তালেবকে বরিশাল রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়। এছাড়া তাদের সবার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলে আরো কঠোর শাস্তির দেয়া হবে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত আইজিপি (হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। আমরা আমাদের মত চেষ্টা করেছি। নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো শুরু থেকেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অনিয়ম খুঁজে বের করতে গোয়েন্দা টিম জেলায় জেলায় কাজ করেছে। ন্যূনতম অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৫০ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। পুলিশ সদর দপ্তর এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেবে না।’
বাংলা



