নওগাঁয় নির্মাণ শ্রমিকের নিরাপত্তা উপেক্ষিত

নওগাঁ প্রতিনিধি : নওগাঁয় একটি বহুতল ভবনে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই কাজ করছেন শ্রমিকরা।
নওগাঁয় গত ছয় বছরে প্রায় ৩০ জন নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য ‘লোভী মালিকদের’ আইন না মানার প্রবণতাকে দায়ী করা হলেও সেদিকে নজর নেই কর্তৃপক্ষের।
একজন শ্রমিকের কর্মকালীন সময়ে কী কী নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে, সে বিষয়ে জাতীয় বিল্ডিং কোডে বিস্তারিত বলা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকছে।
নওগাঁ সদর ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ হাবিবুর রহমান মিঠু বলেন, “মালিকরা নিরাপত্তা দিতে নারাজ। আজকে কোনো শ্রমিক যদি বলে আমাকে নিরাপত্তা দেন, কালকে তাকে দিয়ে কাজ করাবে না।”
ওই অভিযোগ অস্বীকার করে মালিকরা বলেছে, নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলেই ‘অন্যান্য খাতের তুলনায় এই খাতে দুর্ঘটনার হার কম’।
শ্রমিক নিরাপত্তার বিষয়টি যাদের দেখার কথা, সেই কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর বলছে লোকবল সঙ্কটের কথা।
নওগাঁ ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন হিসাবে ইমারত নির্মাণ শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার।
নওগাঁ জেলা গৃহ নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক মোঃ আতিকুর রহমান বিদ্যুৎ বলেন,গত ২০১৪ হইতে আজ অবধি আমার কাছে যে তথ্য রয়েছে তারমধ্য শর্ট সার্কিটে ৫ , দড়ির ভাড়া ছিড়ে ৪,ওয়াল ভেঙ্গে ৬,সাদ ঢালাই খুটি ভেঙ্গে ৬,সেফটি ট্যাংক ৯, সর্বমোট ৩০ জন নির্মাণ শ্রমিক মারা গেছেন কাজের সময় দুর্ঘটনায়।
তিনি আরো বলেন, কোন মালিক পক্ষ বা প্রতিষ্ঠানে যে কাজগুলী শ্রমিক করে নিরাপত্তা রক্ষার কোন সুরক্ষা ও নিরাপত্তা সামগ্রী গ্লাভস, বিশেষ নিরাপত্তা চশমা,প্রদান করেন না।
বিনিত আবেদন শ্রমিকদের নিরাপত্তার সার্থে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এগিয়ে আসবেন।
এ্যাড. মহসিন রেজা বলেন, লক্ষ করছি যে নওগাঁ মফস্বল শহর হলেও ধনী- ব্যাক্তির ধনসম্পদ বৃদ্ধির জন্য আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শ্রমিকদের এবং পৌর আইন ও অন্যান্য আইন অমান্য করছে।অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্মাণ শ্রমিকরা কাজ করছেন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে। প্রায়ই দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হচ্ছে; আহত হচ্ছেন অনেকে।
রাজমিস্ত্রি জোগাড়দার আব্দুর রহমান বলেন,গত আগষ্ট মাসে দোগাছি এক ভবনের গাঁথুনি দেওয়ার সময় মাচা ভেঙে নিচে পড়ে যান নির্মাণ শ্রমিক সিদ্দিক। এরপর তার ওপর দেয়াল ভেঙে পড়ে মৃত্যু হয়।
আল্লাহর নামে কাজ করি ভয় নাই।
তবে বয়স হইছে তাই কোন সুরক্ষা ও নিরাপত্তা সামগ্রী দিলে ভালো হয়।
ওই দুর্ঘটনায় প্রাণে বাঁচলেও কোমরে চোট পান কবির। এখন আর ভারি কাজ করার ক্ষমতা না থাকায় তিনি তার উপযোগী কাজ খুঁজে দিতে অনুরোধ করেন এই প্রতিবেদককে।
তিনি বলেন, যে ভবনে তিনি নির্মাণ কাজে ছিলেন, সেখানে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থাই ছিল না।
“কনট্রাকটর দড়ি আর বাঁশ দিয়ে বলে মাচা বানিয়ে কাজ কর। আমাদের নিরাপত্তায় আর কিছুই দেয় নাই।”
জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুযায়ী, কাজের সময় একজন শ্রমিকের মাথায় হেলমেট পড়া বাধ্যতামূলক। যারা কংক্রিটের কাজে যুক্ত, তাদের হাতে গ্লাভসও পড়তে হবে।

চোখের জন্য ক্ষতিকর কাজ যেমন ড্রিলিং, ওয়েল্ডিং, ঢালাইয়ের সময় শ্রমিকদের চশমা ব্যবহার বাধ্যতামূলক। ওয়েল্ডার ও গ্যাস কাটার ব্যবহারের সময় রক্ষামূলক সরঞ্জাম যেমন গ্লাভস, নিরাপত্তা বুট, এপ্রন ব্যবহার করতে হবে।
ভবনের উপরে কাজ করার সময় শ্রমিকের নিরাপত্তায় বেল্ট ব্যবহারও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে।
তবে নওগাঁর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ জায়গায় উপেক্ষিত রয়েছে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি।
বৃহঃবার দয়ালের মোড়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনে গিয়ে দেখা যায়, সপ্তম তলায় রড বাঁধাইয়ের কাজ করছেন দুই শ্রমিক। ছাদের একেবারে প্রান্তে দাঁড়িয়ে কাজ করলেও তাদের কোনো নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। ওই ভবনের চারপাশে কোনো নিরাপত্তা বেস্টনিও করা হয়নি।
তাদের মধ্যে পুতুল রাণী নামে এক নারী শ্রমিক বলেন, “এভাবে কাজ করতে করতে অভ্যাস হইয়া গেছে। কোনো সমস্যা হয় না।”
সদর হাসপাতাল রোডে কর্মরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করছেন।রাস্তার অংশে গার্ডার ওঠানোর সময় কয়েকজন শ্রমিককে বিনা হেলমেট, নিরাপত্তা বেল্ট ছাড়াই কাজ করতে দেখা গেল বৃহঃবার ।
মুক্তির মোড় এলাকার নির্মাণাধীন টাওয়ারে গিয়েও শ্রমিকদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা যায়নি। পাশের আরেকটি ভবন থেকে দেখা যায়, টাওয়ারের ১০ তলার ছাদ ঢালাইয়ের জন্য জড়ো হওয়া শ্রমিকদের সঙ্গে বিল্ডিং কোড অনুযায়ী নিরাপত্তা উপকরণও ছিল না।
নওগাঁ গৃহ নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ মোসাদ্দুর রহমান রকেট বলেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, শ্রম আইন সব জায়গায় শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে বলা থাকলেও ঠিকাদার ও উপ ঠিকাদাররা কখনও অবহেলা, কখনও অতি লোভের কারণে তা এড়িয়ে যায়।




