
এম.হাসান আলী : আব্দুর রাজ্জাক বুড়িগঙ্গা নদী তীরবর্তী কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া গ্রামে ১৯১৪ সালে জানুয়ারিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মারা যান ১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে। ঢাকার ডুফেরিন হোস্টেলে অবস্থান করে গভর্নমেন্ট মুসলিম হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন করেন। ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে অধ্যাপক রাজ্জাক প্রথম বিভাগে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৩১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৩৬ সালে তিনি প্রথম শ্রেণীতে এমএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এর কিছুদিন পর বিভাগটি অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান নামে দুটি আলাদা বিভাগে পরিণত হলে অধ্যাপক রাজ্জাক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগদান করেন।
অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে বলা হয় জ্ঞানতাপস। এ সম্পর্কে ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সালাহ্উদ্দীন আহমদ বলেছেন, “ তিনি (অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক) জ্ঞানের তপস্যা ও সাধনা করে জ্ঞান অর্জনে সারাজীবন অতিবাহিত করেছেন, সেজন্যই তাকে ‘জ্ঞানতাপস’ বলতে হয়। ” অধ্যাপক সালাহ্উদ্দীন আহমদ আরো বলেছেন, ‘ তাকে বাংলার মনীষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বলে অভিহিত করলে বোধহয় ঔদ্ধত্য হবে না। ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে তিনি যে পড়াশোনা করেছেন সেটা দেখে মনে হয় তিনি একটি জীবন্ত জ্ঞানভাণ্ডার।’
আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন চিন্তাচেতনার দিক দিয়ে উদার, মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক। । ১৯৭১ সালে তিনি দেশ ছেড়ে যাননি। তিনি তার গ্রামের বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে পাকিস্তানের সামরিক আদালত তাকে ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে ‘জাতীয় অধ্যাপক’ হিসেবে ভূষিত করেন। ওইদিন একসঙ্গে তিনজনকে এ পদবিতে সম্মানিত করা হয় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ও ড. কাজী মোতাহার হোসেন। ১৯৫৬-৫৮ সময়কালে যখন আতাউর রহমান খান পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সে সময় অধ্যাপক রাজ্জাক পূর্ব পাকিস্তান পরিকল্পনা বোর্ডের সদস্য ছিলেন।
যদ্যপি আমার গুরু বইতে লেখক আহমদ ছফা বলেন প্রফেসর আবদুর রাজ্জাককে যদি একটা মাত্র পরিচয়ে শনাক্ত করতে হয়, আমার ধারণা ‘ঢাকার পোলা’ এর চাইতে অন্য কোনো বিশেষণ তার সম্পর্কে প্রযোজ্য হতে পারে না। তিনি ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ থানায় জন্মগ্রহণ করেছেন। সেটাই তাকে ঢাকার পোলা বলার একমাত্র কারণ নয়। ঢাকার যা-কিছু উজ্জ্বল গৌরবের অনেক কিছুই প্রফেসর রাজ্জাকের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে। তিনি সবসময়ে ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলেন। ঢাকাইয়া বুলিতে যে একজন সুশিক্ষিত সুরুচিসম্পন্ন ভদ্রলোক মনের গহন ভাব অনুভাব বিভোব প্রকাশ করতে পারেন এবং সে প্রকাশ কতটা মৌলিক গুণসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে, রাজ্জাক সাহেবের মুখের কথা যিনি শোনেননি, কোনোদিন বুঝতে পারবেন না। ঢাকার পুরোনো দিনের খাবারদাবার রান্নাবান্না যেগুলো হারিয়ে গেছে অথবা হারিয়ে যাওয়ার পথে প্রফেসর রাজ্জাক তার অনেকগুলোই ধরে রেখেছেন। তার বাড়িতে এখনও প্রায় প্রতিদিনই কমপক্ষে একটা দুটো পদ ঢাকার খাবার রান্না করা হয়। খাওয়াদাওয়া, বান্নাবান্না, আচার-আচরণের ঢাকাইয়া বৈশিষ্ট্যগুলো প্রফেসর রাজ্জাক এবং তার পরিবার অতি সযত্নে রক্ষা করে আসছেন। নানা দেশের খাবার এবং রান্নাবান্নার প্রতি প্রফেসর রাজ্জাকের বিলক্ষণ অনুরাগ আছে। তার বাড়িতে বিদেশী খাবার রান্না হয় না এমন নয়। কিন্তু দেশীয় খাবার, বিশেষ করে পুরোনো দিনের খাবারের মর্যাদার জায়গাটি ভিনদেশী খাবার কখনো অধিকার করতে পারেনি। ঢাকার পুরোনো দিনের খাবারদাবারের প্রতি তার যে মমত্ববোধ, সেটা আমার কখনো অন্ধ ঐতিহ্যপ্রীতি মনে হয়নি। ঢাকার খাবারের কদর তিনি করেন, কারণ ওগুলো যথার্থই ভালো। উৎকর্ষের দিক দিয়ে পৃথিবীর অন্য যে-কোনো দেশের খাবারের সমকক্ষ।
ঢাকার খাবার এবং ঢাকাব বুলি নয় শুধু, তার চরিত্রের আঁশে শীষে আরও এমন কতিপয় বৈশিষ্ট্য আছে যে-কেউ রাজ্জাক সাহেবের সংস্পর্শে এসেছেন, নিশ্চয়ই উপলব্দি করতে সক্ষম হবেন, এই মানুষের জন্ম ঢাকা ছাড়া অন্য কোথাও সম্ভব ছিল না। তিনি যখন বাজার করতে যেতেন, সব সময়ে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরতেন। কখনো গলায় চাদর থাকত, কখনো থাকত না। তার মুখের ভাষা, খাবার এবং পোশাক আশাক সবকিছুর মধ্যে এমন কতিপয় স্থানীয় বৈশিষ্ট্য মূর্ত হয়ে ওঠে, অন্য যে-কোনো মানুষের বেলায় সেটা বাড়াবাড়ি মনে হত। রাজ্জাক সাহেবের বেলায় সেটা মোটেই মনে হয় না এবং এটাই আশ্চর্যের।
তথ্য কৃতজ্ঞতা : দৈনিক বনিক বার্তায় প্রকাশিত মো. সাইদুজ্জামান, বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব ও অর্থমন্ত্রীর লেখা ও লেখক আহমদ ছফার যদ্যপি আমার গুরু বই থেকে।




