বিবিধশিরোনাম

ডা. নীহার রঞ্জন এখন বিশ্ব মিডিয়ায়

মরিয়ম চম্পা
চিকিৎসক ডা. নীহার রঞ্জন দাস এখন বিশ্ব মিডিয়ায়। গত তিন মাসের মধ্যে তৃতীয় দফা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ইনডোর মেডিকেল অফিসার (মেডিসিন) হিসেবে দায়িত্বরত তিনি। বর্তমানে ওই হাসপাতালেই (আইসোলেশনে) চিকিৎসাধীন নীহার রঞ্জন। একবার করোনা সংক্রমণ হওয়ার পর দ্বিতীয় দফা কতোটা ঝুঁকি থাকে। কত দিন পর আবার আক্রান্ত হতে পারে। এমন অনেক গবেষণা হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। বলা হচ্ছে, একবার আক্রান্ত হওয়ার পর যে এন্টিবডি তৈরি হয় তা সামনের কয়েক মাস সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে।
তবে ডা. নীহার রঞ্জনের টানা তিন দফা সংক্রমণ নতুন এক গবেষণার বিষয়। তাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। ভয়েস অফ আমেরিকা, গ্লোবাল টাইমসসহ বিশ্ব গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
ডা. নীহার রঞ্জন দাসের সঙ্গে বিস্তারিত কথা হয় মানবজমিনের। তিনি বলেন, গত ১৮ই এপ্রিল জ্বর, মৃদু লক্ষণসহ প্রথমবারের মতো করোনা পজেটিভ আসে। ১২ই মে পরীক্ষার পর নেগেটিভ ফলাফল আসায় ১৯শে মে পুনরায় কাজে যোগদান করেন তিনি। প্রথমবার আক্রান্ত হওয়ার দুই সপ্তাহ পর থেকে শারীরিক দুর্বলতা শুরু হয়। এবং শুষ্ক কাশিটা নিয়মিত ছিল। এ সময় নন-কোভিডের ডিউটি চলছিল। কাজে যোগদানের দেড় মাস পর ৩০শে জুন হঠাৎ করে প্রচণ্ড গলাব্যথা এবং ১০২ তাপমাত্রায় জ্বর আসে। ১লা জুলাই করোনার উপসর্গ দেখা দিলে নমুনা পরীক্ষা করান। তখন দ্বিতীয়বার পজেটিভ আসে। ১৯শে জুলাই পরীক্ষার ফলাফল আবার নেগেটিভ আসে। এর কিছুদিন পর থেকে শারীরিক দুর্বলতা আবার দেখা দেয়। এর মাঝে আমাদের পরিবারের অনেকেই অসুস্থ ছিল। আমার বাবা-মা সিরাজগঞ্জে থাকাকালীন কোভিড পজেটিভ হন। এরপর আগস্ট মাসে কাজে যোগদান করি। তখন কোভিড ডিউটি শেষে কোয়ারেন্টিন থেকে আবার নন-কোভিডে ডিউটি করি। এভাবে চলতে থাকে। এর মাঝখানের সময়টাতে অর্থাৎ এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত আমার শ্বশুর, স্ত্রী (গর্ভবতী থাকাকালীন), বোন-বোনজামাইসহ পুরো পরিবার করোনা আক্রান্ত হন। এরপরে হঠাৎ করে প্রায় তিন মাসের কাছাকাছি সময়ে ১৪ই অক্টোবর আমার প্রচণ্ড মাথাব্যথা দেখা দেয়। টানা দুই দিন পরেও মাথাব্যথা কমেনি। ১৬ই অক্টোবর রাতে মাথাব্যথার সঙ্গে শরীর, মাংসপেশী, মেরুদণ্ডে ব্যথা, গলায় খুসখুসে কাশি, শরীরের তাপমাত্রা বাড়াসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। পরদিন সকালে ১৭ই অক্টোবর পুনরায় করোনা পরীক্ষা করতে দেই। রাতে রিপোর্টে তৃতীয় দফায় পজেটিভ আসে।
এই চিকিৎসক বলেন, এসময় কিছু খেতে পারতাম না। স্বাদ পেতাম না একদম মুখে। এরসঙ্গে শরীরের জয়েন্ট পেইন শুরু হলো। এসময় মোটামুটি বাসায় ছিলাম। স্যারদের তত্ত্বাবধায়নে হোম আইসোলেশনে প্রথমদিকে চিকিৎসা নিচ্ছিলাম। এ সময় ব্লাড টেস্টের রিপোর্ট ভালো আসে। এর কিছুদিন পরে বুকের সিটি স্ক্যান করালে রিপোর্টে দেখা যায় ফুসফুসের উভয় পাশে ২৪ শতাংশ জায়গা আক্রান্ত হয়ে গেছে। এসময় হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন চিকিৎসকদের পরামর্শে আবার হাসপাতালে ভর্তি হই। যেহেতু তৃতীয়বারের মতো আক্রান্ত হওয়ার কারো রিপোর্ট নেই তাই ঝুঁকি নিয়ে আর বাসায় থাকিনি। এই সময় পুনরায় ব্লাড টেস্ট করালে দেখা যায় শরীরে রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়তা করে যে উপাদান এটার মাত্রা ৭.৬ হয়ে গেছে। এরপর হাসপাতালে ভর্তি হয়ে রক্ত তরল করার ইনজেকশনসহ অন্যান্য ওষুধ নেই। এখনো হাসপাতালে আছি। ডা. নীহার রঞ্জনের স্ত্রী একজন পেশাদার শিল্পী এবং বর্তমানে ছায়ানটে গানের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। করোনা আক্রান্ত এই চিকিৎসক আক্ষেপ করে বলেন, সবকিছু বুঝেশুনে আমরা স্বাস্থ্য বিভাগে এসেছি। কিন্তু আমাদের কিছু অতৃপ্তির জায়গা আছে। এই যে এতো পরিমাণ চিকিৎসক মারা গেছেন যাদেরকে আমরা কখনোই আর ফেরত পাবো না। একজন অধ্যাপক তো এতো সহজে তৈরি হয় না। এক হাজারের উপর চিকিৎসক আক্রান্ত। স্বাস্থ্যকর্মী কয়েক হাজার। এ বিষয়ে আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কোনো ডকুমেন্ট এখন পর্যন্ত ঘোষণা করেনি। একবার শোক প্রস্তাব পর্যন্ত করা হয়নি। এ বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের। এই পরিমাণে সেবা দেয়ার পরেও এটা জনগণের মধ্যে কোনো প্রচার নেই। প্রণোদনা নয় বরং আমাদের এই কাজের জন্য যেটা দরকার সমাজে উৎসাহমূলক প্রচারণা। আমাদের কাজের স্মীকৃতি দেয়া। এবং স্বাস্থ্য বিভাগের অবশ্যই ঝুঁকি ভাতা চালু করা প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক উপদেষ্টা প্রফেসর ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, তার শরীরে যে ইমিউনিটি তৈরি হয়েছে এটা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়নি যে, কত দিন পর্যন্ত এই অ্যান্টিবডিটা শরীরে থাকবে। তবে করোনার জন্য স্থায়ী অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না এটা নিশ্চিত। দ্বিতীয়ত, এটা কত দিনের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে বা কত দিন পর্যন্ত প্রতিরোধ করবে- এটাও অনিশ্চিত।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সুলতানা শাহানা বানু বলেন, করোনাভাইরাস যেহেতু খুব দ্রুত পরিবর্তন হয় সুতরাং এই ইমিউনিটিটা সর্বোচ্চ দুই থেকে আড়াই মাস মানবদেহে থাকে। এখন যেটা দিয়ে তার ইনফেকশন হয়েছিল সেটা যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে সেটা শুধুমাত্র ওই ভাইরাসের সুরক্ষার ক্ষেত্রে কার্যকর থাকবে। ভাইরাসের চরিত্রগত পরিবর্তন হয়ে আবার তাকে তিন থেকে চার মাসের মধ্যে আক্রান্ত করতে পারবে।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও করোনার জাতীয় কমিটির সমন্বয়ক ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, এক্ষেত্রে তার পজেটিভ হওয়ার পরে আর নেগেটিভ হয়নি এটাও থাকতে পারে। কিন্তু দশ দিন পরে সেই ভাইরাসটি আর রেপলিকেট করতে পারে না। অর্থাৎ তার রোগ ফেরাতে পারে না। সেক্ষেত্রে দশ দিন পরে যেটা হয় সেই ভাইরাসটি ডেড থাকে। ডেড ভাইরাসও বহুদিন পজেটিভ দেখাতে পারে। সুত্র : মানবজমিন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button