
আমাদের দেশে নারীদের বিভিন্ন সামাজিক অধিকারের ক্ষেত্রে মানবাধিকার বিরাট লঙ্ঘন হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ও তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এডভোকেট সুলতানা কামাল।
রোববার (৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের শীতলক্ষ্যা এলাকায় রণদা প্রসাদ সাহা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আইন ও মানবাধিকার বিভাগ আয়োজিত “মানবাধিকার, সংবিধান এবং বাংলাদেশ” শীর্ষক সেমিনারে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে সুলতানা কামাল এ মন্তব্য করেন।
মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট সুলতানা কামাল নারী অধিকার প্রসঙ্গে আরো বলেন, আমাদের দেশের আইন, সামাজিক প্রথা ও চিন্তা-ভাবনাসহ সব কিছুর মধ্যে নারীদের বৈষম্য করা হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতে নারীদের অধিকার নিশ্চিত করা হলেও আমাদের দেশে নারীদের জন্য যে আইন রয়েছে তাতে এখনো বৈষম্য রয়ে গেছে। আইন দিয়েও এর কোন সংশোধন করা হয়নি।
বাংলাদেশের বাস্তবিক পরিস্থিতিতে এখনো মানুষকে নানা কারণে নানা বৈষম্যের স্বীকার হতে হচ্ছে উল্লেখ করে সুলতানা কামাল বলেন, সংখ্যালঘুরা, আদিবাসী বাঙালিরা, নারী-পুরষ বিশেষ কর দলিত গোষ্ঠীর লোকেরা এখনও বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছে। কোন সভ্য সমাজে এমন বৈষম্য থাকতে থাকতে পারেনা। এটি অসংবিধানিক। এটি দূর করা প্রয়োজন। তিনি দু:খ প্রকাশ করে জানান, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরে মানুষের মধ্যে নানা বৈষম্য দূর করতে বৈষম্য বিলোপ আইন তৈরী করার কথা থাকলেও মন্ত্রনালয় পর্যন্ত যাওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত সে আইনটি পাশ হয়নি। এজন্য সুলতানা কামাল দেশের আইন প্রণেতাদেরকেই দায়ী করেন।
সংবিধান প্রসঙ্গে সুলতানা কামাল বলেন, সংবিধানের প্রথম মূলনীতিতে ধর্মীয় নিরপেক্ষতার কথা থাকলেও সেখানে স্ববিরোধিতা রয়েছে। মানুষের বাক স্বাধীনতার বিষয়ে ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাকটসহ বিভিন্ন আইন তৈরী হলেও তা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। বাক স্বাধীনতাকে হরণ করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবী করেন।
মানবাধিকার প্রসঙ্গে সুলতানা কামাল বলেন, নাগরিকদের জীবন সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালিত করতে নিরাপত্তা অধিকার নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। মানবাধিকারের সূত্র অনুযায়ী, নিজেকেও বাঁচতে হবে এবং অন্যকেও বাঁচতে দিতে হবে। মানবাধিকারের ক্ষেত্রে এর থেকে আর বড় কিছু হতে পারে না। দেশের আইনের বিধানের বাইরে কোন নাগরিককে গ্রেফতার করা, নির্যাতন করা, দেশ থেকে বিতাড়িত করা, বেআইনী ঘোষণা করা এবং বিচার বহির্ভূত সকল হত্যাকান্ড মানবাধিকার লঙ্ঘন বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, সংবিধান মতে দেশের সকল মানুষের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, বাক স্বাধীনতা ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য প্রফেসর ড. মনীন্দ্র কুমরা রায়ের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরো বক্তব্য রাখেন প্রতিষ্ঠানটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়্যারম্যান রাজীব প্রসাদ সাহা এবং আইন ও মানবাধিকার বিভাগের প্রধান কাজী লতিফুর রেজা। সেমিনারে অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কুমুদিনি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য শ্রীমতি সাহা, পরিচালক সম্পা সাহা, মহাবীর পতি এবং উপদেস্টা আবু আলম মো: শহীদ খানসহ অন্যান্য সদস্যবৃন্দ।
মানবাধিকার প্রসঙ্গে সুলতানা কামাল আরো বলেন, বাংলাদেশের জেলখানাগুলোতে দুই তৃতীয়াংশ মানুষ বিনাবিচারে আটক রয়েছেন। জেলখানাগুলোর ধারণ ক্ষমতার তিন-চারগুন মানুষ বেশি জেলখানায় রয়েছে। তার মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ মানুষ বিনাবিচারে আটক। এরমধ্যে অনেক দোষী, অপরাধী কিংবা দুর্র্ধষ অপরাধী থাকলেও তাদের কোন বিচার হয়নি। তবে বন্দীদের মধ্যে একটি বড় অংশই কোন ধরণের অপরাধ না করেই জেলখানায় বন্দী হয়ে আছেন। বিনাবিচারে আটক করা যাবেনা, গ্রেফতার করা যাবেনা মানবাধিকারের সেসব কথাগুলো আমরা লঙ্ঘন করছি।
মানবাধিকার প্রসঙ্গে সুলতানা কামাল আরো বলেন, আমরা বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড প্রত্যক্ষ করছি। মানুষের মৃতদেহ বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে। কে বা কারা করছে সেটি আদালতের বিচার্য বিষয়। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন হত্যাকান্ডের বিচার হয়না। এমন অবস্থায় পৌঁছে গেছে মানুষ এখন আর ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করেনা।দুর্নীতি দমনের ব্যাপারেও আমরা খারাপ অবস্থানে রয়েছি। দুর্নীতি দমনে আমরা কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারিনি।
কোটা পদ্ধতি প্রসঙ্গে সুলতানা কামাল জানান, নানা বৈষম্য তৈরি হওয়ার কারণেই কোটা পদ্ধতি তৈরি হয়েছিলো। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা, নারী, আদিবাসী যারা কোন কারণে পিছিয়ে পড়েছিলো তাদেরকে সামনে নিয়ে আসার জন্যই কোটা পদ্ধতি চালু হয়েছিলো। ঐ সমান সুযোগ সবাইকে দিতে হলে কিছুটা কোটা পদ্ধতি না হলে সম্ভবপর হবে না। ঐতিহাসিকভাবে যারা পিছিয়ে পড়েছেন তাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে আসাতেও রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। তাই কোটা পদ্ধতি বাতিল করে দেয়াটাকে সমর্থন করা যায়না বলে মনে করেন এই মানবাধিকার নেত্রী।
সেমিনারে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রশ্ন তুলে ধরলে সুলতানা কামাল তার জবাব দেন। পাশাপাশি দেশের সংবিধান ও মানবাধিকার বিষয়ে অরো বিস্তারিত জ্ঞাণ অর্জনের জন্য তাদের পরামর্শও দেন তিনি।




