জাপানীরা কেমন : পর্ব–৩৫
বার্ধক্যরোধ গবেষণা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে
পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশগুলিতে মানুষের বার্ধক্য-রোধে ব্যাপক গবেষণা চলছে এবং সাফল্যের ফল কয়েক বৎসরের মধ্যে সাধারণ মানুষ জানতে পারবেন। এই গবেষণার বিষয়বস্তুর উপর আমার পরীষ্কার ধারণা ছিল না।যেহেতু আমি একজন মাইক্রোবায়োলিষ্ট। যদিও এখন সরাসরি গবেষণার কাজে জড়িত নই। তবে পৃথিবীতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর যে গবেষণা চলছে সেদিকে নজর আছে। আমার বড় প্রিয় এই বিষটির অগ্রগমনের কথা যখন গোচরে আসে তখন সে বিষয়ে জানার জন্য বই-পত্র,বিজ্ঞান জার্নাল এবং নেট এ পড়ে যথাসম্ভব অবগত হওয়ার চেষ্টা করি। পৃথিবীতে মানুষ গবেষণা করে মহাশূন্য বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান ছাড়াও ইলেকট্রনিকস এর উপর অবিশ্বাস্য রকম সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু তবুও মনে হয় যে গবেষণায় মানুষ লক্ষ ভাগের একভাগও এগুতে পারেনি।অনেক কিছু জানার বাকি রয়েছে। তাইঅনেক অজানাকে জানতে প্রবল ইচ্ছা হয়।
মহাশূন্যে পৃথিবীর মতো আরেকটি গ্রহ আছে কি না তা জানার আগ্রহ জাগে। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই ভাবছি এবং দেখতে পাচ্ছি যে চিকিৎসা বিজ্ঞান এখনো অঙ্কুরে। তার আরো আগ্রগতির প্রয়োজন আছে, যদিও সে প্রয়োজন শীঘ্র মেটানো যাবে না জানি। তবুও আমাদের ক্ষুদ্র জীবনে নতুন আবিষ্কারের কথা শুনলে কিছুটা আশার আলো দেখি। আমার পিতা ফুস্ফুসের ক্যান্সারে ১৯৬৮ সালে পরলোক গমন করেছেন। তখন পত্রিকায় ঔষধ আবিষ্কারের খবর দেখে মনযোগ দিয়ে পড়তাম এবং মনে প্রাণে চাইতাম ক্যান্সারের নতুন ঔষধ যেন শীঘ্র বের হয়। যাই হোক, এখন পর্যন্ত ক্যান্সারের উপর সামান্য সাফল্য অর্জন করলেও মনে হয় এক দশমাংশ আগ্রগতি হয়েছে মাত্র। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের আরো অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে। তবে বর্তমানে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা ক্যান্সারের রুগ্ন ‘সেল বা কোষগুলি’ ঔষধ প্রয়োগেরমাধ্যমে নষ্ট করে দিয়ে রোগীকে সুস্থ করার প্রক্রিয়া অনেকটা আয়ত্বে নিয়ে এসেছেন। শুধু তাই নয়। রোগীকে সুস্থ করে সে রোগী যাতে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকেন, তাও আয়ত্বে নিয়ে এসেছেন। বিস্ময়ের ব্যাপার নয়কি? তদুপরি মানুষের হায়াত বৃদ্ধি করার চিকিৎসাও এখন হাতের নাগালে এসে গেছে। একথা এখন বিশ্বের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা দৃঢ়তার সাথে বলছেন।

সম্প্রতি আমেরিকা, ইতালি এবং জাপানে বিভিন্ন প্রাণীর আয়ু বৃদ্ধির উপর গবেষণা চালিয়ে এখন সফল্যের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এই সাফল্যের মাধ্যমে একটি অসুস্থ লোককে রোগমুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ ১০০ বৎসর পর্যন্ত সুস্থ রাখা যাবে। ক্যান্সার এবং আলঝেইমারের মতো কঠিন রোগ থেকেও রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব হবে। বার্ধক্যতা হল মানব জাতীর সবচেয়ে জটিল একটি সমস্যা এবং তা বিভিন্ন দুরারোগ্য রোগের জন্য ত্বরান্বিত হয়। অ্যামেরিকার National Institute of Aging এর পরিচালক এবং খ্যাতনামা বৈজ্ঞানিক ড. Felipe Sierra একজন জ্যেষ্ঠ বার্ধক্য নিরোধ গবেষক। তিনি বলেছেন, “এর উপর বিগত ২০ বৎসর যাবত গবেষণা চলছে। জটিল এই দুটি রোগের সফল চিকিৎসা করে রোগীকে সুস্থ করে এখন পরিপূর্ণ বয়স পর্যন্ত জীবিত রাখা সম্ভব হবে। এই রোগের সফল প্রতিষেধক বের করে সফল চিকিৎসা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।”
এই ব্যাপারে গবেষণা পৃথিবীর শুধু মাত্র একটি গবেষণা কেন্দ্রে হচ্ছে না। অন্যান্য উন্নত দেশের শীর্ষ গবেষণাগার গুলিতেও ব্যাপক কাজ চলছে। তন্মধ্যে আমেরিকা, ইতালি এবং জাপান অন্যতম।
এই গবেষণাতে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাতে ইঁদুর এবং বিভিন্ন রকম পোকা ব্যবহার করে দৃষ্টান্তমূলক সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এই সফল প্রচেষ্টার ফলে মানুষের হায়াত বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। ইঁদুর এবং পোকার বার্ধক্যের জন্য ১৭টি জিন (gene) দায়ি বলে জানা গেছে। একই ধরণের সতেরটি জিন মানব দেহেও রয়েছে। এক ধরণের পোকা, পোষাকি নাম, C. elegans এর পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, সে পোকাটির আয়ু দ্বিগুণ বাড়ানো সম্ভব। আর, ইঁদুরের আয়ু ৬০% বাড়ানো সম্ভব। আশার কথা যে এই জিনগুলিকে নিয়ন্ত্রণে এনে মানুষের আয়ু বৃদ্ধি করাও অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব হবে।
“আমরা জানি যে মানব দেহের কোষগুলি (cell) রোগাক্রান্ত হয়ে সেগুলি থেকে পুঁজ নির্গত হয় সে পুঁজ হল রোগের অন্যতম কারণ।” একথা বলেছেন Washington School of Nutritional Science এর Professor Luigi Fonta, St Luis of Brescia in Italy.
“যখন কেউ না খেয়ে দীর্ঘ সময় থাকে, তখন দেহে বিপাকিয় (metabolic) পরিবর্তনের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় ও নষ্ট কোষ বা সেলগুলিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। এই পদ্ধতিকে প্রাকৃতিক পরিষ্কার প্রক্রিয়া বলা হয়।”
দীর্ঘদিন যাবত ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তা প্রমাণীত হয়েছে। কিন্তু উপবাসের মাধ্যমে ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত কষ্টকর। তবে এখন ক্যালোরি কমাবার ঔষধ আবিষ্কৃত হয়েছে। এই ঔষধ সেবনের মাধ্যমে ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ড. Sierra একথা বলেছেন। সম্প্রতি কুড়িটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গিয়েছে যে, সাতটি ইঁদুর দীর্ঘ জীবন অর্জন করেছে। Dr, Sierra ব্যাখ্যা করে বলেন, “যে ২০টি ‘অণু’ ইঁদুরগুলিতে প্রয়োগ করা হয়েছে। সেগুলির মধ্যে সাতটি অণু ইঁদুরের দীর্ঘ জীবন অর্জনে ফলপ্রদ হয়েছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর যেটি সেটার নাম ‘rapamycin’(sirolimus), সেটা দেহের যে অংশ কেটে ফেলে দিয়ে সেখানে ভিন্ন প্রাণীর দেহের অংশ (অর্গান) সংযোজনে সাহায্য করে।( অন্যথায় ভিন্ন অর্গান বা অংশ কে গ্রহণ না করে পরিত্যাগ করতো।) এই পদার্থটি ইঁদুরের জীবন ২৫% দীর্ঘায়ীত করেছে। একই ধরণের ফলাফল অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর বেলাতেও পাওয়া গেছে। কিন্তু এর প্রয়োগে অনেক পার্শ-প্রতিক্রিয়া (সাইড এফেক্ট) লক্ষ করা গেছে। কিন্তু সে ধরণের প্রতিক্রিয়া অত্যান্ত পীড়িত রোগীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে। Dr. Sierra বলেন, “কিন্তু একই পরীক্ষা স্বাস্থ্যকর লোকের উপরও করা হয়েছে, তাদের কোন পার্শ-প্রতিক্রিয়া হয় নি। তিনি বলেন, “এটি একটি অলোকিক ধরণের ঔষধ।”

অন্যান্য আরো ফলদায়ক ড্রাগ রয়েছে যা বয়স্কদের দেহে প্রয়োগ করে যে সকল দেহ-কোষ বার্ধক্যের জন্য দায়ী, সেগুলিকে বিভক্ত করতে না পারলেও – তা দিয়ে কোষগুলিকে ধ্বংস করা যায়।
Mayo clinic of Minnesota তে গবেষণারত বৈজ্ঞানিকগণ বলেছেন যে বয়স্ক ইঁদুরের দেহে জেনেটিক পদ্ধতিতে বার্ধক্যের জন্য দায়ী কোষগুলিকে বের করা যায়।
Dr. Sierra বলেছেন, “এটি এক বিস্ময়, সে বৃদ্ধ ইঁদুরগুলিকে জেনেটিক পদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসা চালিয়ে সুস্থ করে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে এবং সেই ইঁদুরগুলির স্বাস্থ্য অনেক ভাল ছিল!”
এখন পর্যন্ত ১৫ থেকে ২০টি Senolytic drug বার্ধক্যনিরোধ গবেষণায় পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। Dr. Sierra বলেছেন, “আমি বিশ্বাস করি যে সেগুলির মধ্য থেকে কয়েকটি চিকিৎসার জন্য ফলদায়ক ড্রাগ বের হবে!”
তিনি আরও বলেন, “এ জন্যই আমি বলি এটা হল জমানার একটি উত্তেজনাপূর্ণ চিকিৎসার ক্ষেত্র!”
অ্যামেরিকার কালিফোর্নিয়াতে অবস্থিত Salk Institute এর Juan Carlos Izpisua Belmonte হলেন একজন প্রজনন বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ (Geneticist)। তিনি বলেছেন, “বার্ধক্য প্রতিরোধে বিজ্ঞান অনেক অগ্রগতি লাভ করেছে। এখন আমাদের হাতে রয়েছে শ্লথ করে আয়ু প্রলম্বিত করার পদ্ধতি!”
অন্যান্য গবেষকদের সাফল্য এবং তার নিজের গবেষণার ব্যাপারে তিনি বলেন, “কেমন করে মানুষের দেহ-কোষগুলিকে প্রাক প্রোগ্রাম পদ্ধতিতে সুস্থ রেখে মানুষের তারুণ্য কাল দির্ঘায়ীত করা যায়, সে বিষয়টি।”
বার্ধক্য প্রতিরোধে সম্প্রতি একটি নজিরবিহীন পরীক্ষা চালানো হয়েছে অ্যামেরিকার উপজাতি ‘আমিশ’ দের উপর। (আমিশ উপজাতীর উপর নিম্নে সংক্ষিপ্ত ধারণা দেওয়া হয়েছে।) এই পরীক্ষায় একটি মাত্র জিনের শক্তিশালী প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। সেটি হল ‘মিউট্যান্ট জিন’ যেটি আমিশদের বয়োবৃদ্ধির জন্য প্রয়োগ করা হয়েছে – তাতে উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া গিয়েছে।
“মানব দেহে আবিষ্কৃত প্রথম এই মিউট্যান্ট জিনটি জীববিজ্ঞানসংক্রান্ত বয়সের উপর বহুমুখী প্রভাব রেখেছে!” একথা বলেছেন, North West University of Chicago এর জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক Douglas Vauhan।
এই মিউট্যাশনের ক্রিয়াতে PAI-1 নামক একটি প্রোটিন হ্রাস পায় এবং বৃদ্ধরা উত্তম স্বাস্থ্য অর্জন করে।
মিউট্যাশন এর ফলে আমিশ উপজাতীদের গড় আয়ু ৭১ বৎসর থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৮৫ বৎসরে গিয়েছে।
যে অণুটির প্রভাবে তা সম্ভব হয়েছে তার উপর এখন জাপানে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে।
“আমি মনে করি যে বয়োবৃদ্ধি রোধের মূল পদ্ধতি সম্পর্কে অদূর ভবিষ্যতে আরও অনেক আবিষ্কার দেখতে পাব,” Vaughan বলেন। তিনি আরো বলেন, “বয়োবৃদ্ধি রোধে ঔষধ বের করার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চলছে এবং আমি মনেকরি যে বয়োবৃদ্ধি রোধে এবং বয়োবৃদ্ধিজনক রোগের জন্য ২০ থেকে ৩০ বৎসরের মধ্যে একাধিক ঔষধ আবিষ্কৃত হবে! কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই সাফল্য চীরিদিন বেঁচে থাকার জন্য নয়। মানুষ যেন রোগমুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে, সে জন্য এই গবেষণা চলছে। দীর্ঘায়ু হল একজন লোক যাতে কোন কঠিন রোগ থেকে আরোগ্যলাভ করে একজন সুস্থ মানুষের মত তার জীবনকে উপভোগ করতে পারে। কিন্তু ১০০ বৎসরের বেশি নয়,” তিনি বলেন।

(আমিশ উপজাতি ইয়ুরোপের জার্মানী এবং হল্যান্ডের উত্তরাঞ্চল থেকে অ্যামেরিকা এবং ক্যানাডাতে গিয়েছে। তারা ১৬৯৩ সালে জ্যাকব আম্মান এর নেতৃত্তে একমত হয়ে আধুনিক জমানার খৃষ্টান ও গীর্জার শিক্ষাকে পরিহার করে। এক কথায় যারা জ্যাকব আম্মানের খৃষ্ট ধর্ম শিক্ষাকে অনুসরণ করে আলাদা জীবন যাত্রায় বিশ্বাসী তারাই আমিশ জাতী। তারা প্রাচীন জীবন যাত্রার পদ্ধতিকে ধরে রেখেছে এবং আধুনিক জীবন যাত্রা থেকে নিজেদের আলাদা রেখেছে। উদাহরণ, তারা গাড়ি ব্যবহার না করে ঘোড়ার গাড়িতে চলাফেরা করে। ঘোড়ার গাড়ির চাকায় টায়ার না লাগিয়ে ইস্পাত লাগিয়ে চালায়। চাষাবাদ করে এবং তাদের নিজস্ব নীতিতে চলে। বিদ্যুৎ ব্যবহার করে না, তারা বিদ্যুতকে শয়তান মনে করে। টেলিভিশন ও অন্যান্য বেদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে না। সাদাসিদা কাপড় পরে। আমিশ পুরুষরা গোঁফ রাখে না কিন্তু দাঁড়িরাখে। মহিলারা অলংকার পরে না। তারা নির্দিষ্ট গির্জায় জার্মান ভাষাতে প্রার্থনা করে। খৃষ্টান ধর্মে বিশ্বাসী, যেমন, প্রোটেস্ট্যান্ট, ব্যাপ্টিস্টদের থেকেও আলাদা থাকে। বর্তমান যুগে অ্যামেরিকায় এমন জাতী আছেঅনেকে হয়তো জানেন না। তারা সরকারকে ট্যাক্স দেয় না। কিন্তু যারা সরকারী চাকুরী করে তারা ট্যাক্স দেয়। প্রতি পরিবারে পাঁচ থেকে ছয় জন সন্তান রয়েছে।)
সোর্সঃ বিভিন্ন গবেষণা জার্নাল এবং ইন্টারনেট



