ঘিওরে দেড়শ বছরের সম্প্রতির মিলনমেলা

আব্দুর রাজ্জাক, মানিকগঞ্জ : গত দু বছর করোনার ধাক্কা সামলিয়ে নব উদ্যোমে মানিকগঞ্জের ঘিওরে অনুষ্ঠিত হলো জমকালো আয়োজনে সম্প্রতির মেলা। দেড়শ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই সম্প্রতির মেলায় হাজারো মানুষের মিলন মেলায় পরিনত হয়। ব্যতিক্রমী আয়োজনে এই মেলা সারাদেশে সুনাম কুড়িয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় শুরু হয়ে এই মেলা চলবে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত। উপজেলার ডিএন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবের আমেজে মুখরিত আবহমান বাংলার চিরচেনা এই মেলা বিজয়া দশমীর মেলা হিসেবেও পরিচিত।
আয়োজকরা জানান, উপজেলা সদরের সবগুলো দূর্গোৎসবের প্রতিমা বিসর্জনের আগে পুরাতন ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে স্কুল মাঠে জড়ো করেন। পুরো মাঠ ভরে যায় প্রতীমায়। শেষবারের মতো দুর্গা প্রতিমা দর্শন করতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

বিসর্জনের আগে হিন্দু নারীদের উলুধ্বণী আর কান্নায় চারিপাশের পরিবেশ শোকের ছায়া নামে। মূলত এ উপলক্ষে এখানে বসে মেলা। বিসর্জনের পর মূহূর্তেই আনন্দ আর গান বাজনার মূর্ছনায় মেতে ওঠে হাজারো মানুষ। মেলায় অন্য ধর্মের হাজারো মানুষের ঢল নামে। কেউ প্রশ্ন করেনা কিসের মেলা, কার মেলা? ধর্মীয় সম্প্রীতির এই উজ্জল নজিরের ঐতিহ্য সুদীর্ঘ দিন যাবত চলে আসছে।
বুধবার সন্ধ্যায় দেখা যায়, হরেক রকমের নিত্য প্রয়োজনীয় পসরা, তৈজসপত্র, মুখরোচক খাবার দোকান, কসমেটিকস, প্রায় অর্ধশত প্রকারের মিষ্টান্ন ভান্ডারসহ নানারকম দোকান বসেছে। বেচাকেনাও হচ্ছে প্রচুর।
মেলায় আগত চন্দ্রিমা সরকার বলে, ছোটবেলা থেকেই আমি বিজয়া দশমীর দিন এই মেলায় আসি। এখানে বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে অনেক আনন্দ হয় এবং বিসর্জনের আগে শেষবারের মতো অনেকগুলো দূর্গা প্রতিমা দর্শন করি।
ঘিওর উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারন সম্পাদক সুব্রত কুমার শীল গোবিন্দ বলেন, চারপাশের অমানিশা, ক্লেদ, হিংস্রতা, ধর্মান্ধতা আমাদের ঘিওরে স্পর্শ করে না। এখানে বসে বিজয়া দশমীর সম্প্রীতির মেলা সব ধর্মের মানুষের উপস্থিতিতে সরগরম থাকে পুরো এলাকা। এ ঐতিহ্য দেড়শত বছরেরও বেশি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী বিপ্লব কুমার সাহা বলেন, বিজয়া দশমীর দিন হিন্দু, মুসলমান, ধনী, দরিদ্র নির্বিশেষে মেলার আনন্দ উপভোগ করতে সমবেত হয় এই স্কুলের মাঠে। এখানে বসে হরেক রকম দেকানপাট। বিজয়া দশমীর রাতে একযোগে উপজেলা সদরের সবগুলো মন্টপের দেবী দূর্গা ধলেশ্বরীর জলে বিসর্জন দেয়া হয়। তখন এক হৃদয় বিদারক ঘটনার অবতারনা হয়।
ঘিওর উপজেলা সদর ইউপি চেয়ারম্যান অহিদুল ইসলাম টুটুল বলেন, দীর্ঘদিন যাবৎ বিজয় দশমীর দিন এখানে সম্প্রীতি মেলা বসে। আনন্দে মেতে উঠে সব ধর্মের মানুষ। কেউ প্রশ্ন করেনা কিসের মেলা, কার মেলা? সবাই বলে সম্প্রিতীর মিলন মেলা।
ঘিওর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আমিনুর রহমান বলেন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে এই মেলার উচ্ছ্বাস স্বাক্ষর রেখেছে অনন্য এক সম্প্রীতির। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলে এক প্রাণে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সার্বক্ষণিক দেখভাল করেছে পুরো অনুষ্ঠানটি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদুর রহমান বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রতীর এমন মিলন মেলা সত্যিই বিরল। ধর্মের বিভেদ, বিভাজন কোনদিনই এই মেলার সার্বজনীনতায় দেয়াল তুলতে পারেনি।
মেলায় উপস্থিত ছিলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদুর রহমান, ঘিওর থানা অফিসার ইনচার্জ মোঃ আমিনুর রহমান, উপজেলা পুজা উদযাপন কমিটির সভাপতি এ্যাডভোকেট শচিন্দ্র নাথ মিত্র, সাধারণ সম্পাদক সুব্রত কুমার শীল গোবিন্দ, ঘিওর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ অহিদুল ইসলাম টুটুল, ঘিওর প্রেস ক্লাব সাধারন সম্পাদক রাম প্রসাদ সরকার দীপু, ঘিওর থানার এস আই মনিরুল ইসলাম প্রমুখ।



