sliderমতামতশিরোনাম

কমরেড অমল সেন, তেভাগার লড়াই ও কমিউনিস্ট আন্দোলন : পরিচ্ছেদ-৫

বিমল বিশ্বাস

আন্দোলনের পটভূমি :

কমরেড অমল সেন ১৯৩৩ সালে এগারোখান আসেন। সভ্যপদ পেয়েছিলেন ১৯৩৪ সালে। কমরেড অমল সেনই নড়াইল কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সদস্য। পরবর্তীতে উজিরপুরের শিবু মিত্র ও বাকড়ির রসিকলাল ঘোষ সভ্যপদ পান। শিবু মিত্র পরবর্তীতে কংগ্রেসে যোগদান করেন। এব্যাপারে কমরেড অমল সেন আত্মসমালোচনা করতেন সঠিক শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গীর অভাবে গরীব কৃষক রসিক ঘোষকে প্রথমে সভ্যপদ দিতে ব্যর্থ হয়েছি। হাতিয়াড়া গ্রামের কমরেড নন্দলাল পাঠকের পরিবারের ৫ জন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পেয়েছিলেন। তেভাগা আন্দোলনের সংগঠক কমরেড নন্দলাল পাঠক ও তার বড়দা দয়াল পাঠক ছিলেন পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী। তেভাগা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী নন্দলাল পাঠক তাঁর তেভাগার স্মৃতি পুস্তকে তেভাগা আন্দোলনের যেসকল সংগঠকদের নাম লিখেছেন সেগুলির সাথে তেভাগা আন্দোলনের অন্যান্য নেতাদের কাছে জানা এবং ঐ অঞ্চলের গ্রামগুলি থেকে যেসকল সংগঠকদের নাম জানতাম সেই নামগুলো যুক্ত করেই সকল নামগুলো উল্লেখ করার চেষ্টা করলাম।

তেভাগা আন্দোলনের মূল ¯েøাগান ছিল “নিজে দখল রেখে চাষ করো, নিজ খামারে ধান তোলো”। “জোতদাররা সব হুশিয়ার”, “সমাজতন্ত্র জিন্দাবাদ”। এসব ¯েøাগানে মিছিল হতো, মিটিং হতো। নড়াইল সাব-ডিভিশনকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। দক্ষিণ অঞ্চলের দায়িত্ব ও নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড হেমন্ত সরকার, আশুতোষ বিশ্বাস, নরেন বিশ্বাস, পুলিন মাস্টার, জ্ঞান সরকার ও রাজেন বৈরাগী। উত্তর অঞ্চলের নেতৃত্বে ছিলেন ডুমুরতলার দূর্গাপুর গ্রামের নূর জালাল, মোদাচ্ছের মুন্সি, আব্দুল আজিজ, ভোলা ডাক্তার ও বিজয় বিশ্বাস। পশ্চিম অঞ্চল তথা এগারোখানের নেতৃত্বে ছিলেন করুণা কিশোর বিশ্বাস, কিংবদন্তী মহিলা নেত্রী সরলা সিং, প্রেমলতা পাঠক, অনিমা বিশ্বাস, রসিক ঘোষ, মম্মথ গুপ্ত, দয়াল পাঠক, নন্দ পাঠক, নরেশ পাঠক, ভোলানাথ বিশ্বাস ও নেপাল সরকার।

খুলনার মৌভোগে প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলনে, নেত্রকোণায় সারা ভারত কৃষক সভার সম্মেলনে নড়াইলের কৃষক ভলেনটিয়াররা যোগদান করেছিল এবং অনুপ্রেরণা নিয়ে ফিরেছিলেন। আন্দোলনের এই ধরনের পরিস্থিতিতে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা বাঁধিয়ে জমিদাররা তেভাগা আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চক্রান্ত করেছিল। ঐসময় একদিন সকালবেলা জানা গেল সচ্ছল চাষী গোলাম মিনে তার ছেলের সদ্য বিবাহিত বউকে উলঙ্গ করে রাতের বেলায় কে বা কারা সাকোর সাথে বেঁধে রেখে গেছে। জমিদারের দালালেরা প্রচার শুরু করে এটা হিন্দুদের কাজ। চারিদিকে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে প্রচÐ উত্তেজনা দেখা দিল। কিন্তু কৃষক সমিতির দৃঢ় ভূমিকার কারণে সে চক্রান্ত ব্যর্থ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে কমরেড নূরজালালের লেখা থেকে জানা যায়, এই উত্তেজনা প্রশমনের জন্য কমরেড নূরজালালকে তুলরামপুর গিয়ে সেখানকার চেয়ারম্যানের সাথে আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হয় কোন অবস্থাতেই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবেনা। অন্যদিকে বাকড়ি স্কুলের শিক্ষক সুরেশ সরকার, ফরিদ উদ্দাহার, জীবন গুপ্ত, বনমালী গোস্বামী ও নগেন সেন নবম ও দশম শ্রেণীর ছাত্রদের নিয়ে যেখানে হিন্দু-মুসলমানরা ঢাল-সড়কি নিয়ে জমায়েত হতো সেখানেই ছুটে গিয়ে দাঙ্গার হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য চেষ্টা করতেন। জমিদারেরা কৃষক সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য গ্রামে গ্রামে যে সভা হতো সেখানে আক্রমণ করে ভÐুল করার চেষ্টা করতো। তার বিপরীতে কৃষক সংগঠনের পক্ষ থেকে গোপনে স্বেচ্ছাসেবক গড়ে তোলা হতো যাতে কোন ধরনের আক্রমণ হলেই প্রতিরোধ করা যায়। ঐ সময়ে বীড়গ্রামে যে জনসভার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ঐ জনসভাকে সফল করার জন্য সমস্ত কৃষক অঞ্চলে মিটিং মিছিল করা হতো। এই সব মিটিং মিছিল সমাবেশে ব্যাপক কৃষকদের সমাবেশ করার যে চেষ্টা হতো সেখানে এগারোখান, ভিটেবল্লা, চাঁচড়া গ্রামের হিন্দু-মুসলমান মিলে প্রায় বিশ হাজার লোকের মিছিল হতো। ঐসব মিছিলে প্রত্যেকের হাতে একটা করে লাল পতাকা থাকতো। যেদিন যশোরের পুলিশ সুপার ১৫০ এর উর্ধ্বে পুলিশ নিয়ে দূর্গাপুর বিলডুমুরতলার সমাবেশের চারপাশ ঘিরে ফেলে সেদিন একপাশে কমরেড শান্তিময় ঘোষ (বাচ্চু ঘোষ), একদিকে আব্দুল হক, একপাশে অমল সেন আর উত্তর দিকে কমরেড নূরজালাল নিজে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুরু করেন। এইভাবে ঘেরাও চলতে লাগলো। অন্যদিকে পুলিশ সুপার ও কৃষক নেতারা আলোচনায় বসলেন।

তেভাগা আন্দোলনে পুরোভাগে যাঁরা ছিলেন তাদের মধ্যে কমরেড কৃষ্ণ বিনোদ রায়, কমরেড শান্তিময় ঘোষ (বাচ্চু ঘোষ), কমরেড অমল সেন, কমরেড অজিত গাঙ্গুলি, কমরেড আব্দুল হক, কমরেড রঞ্জন দে, কমরেড অধীর ঘোষ, কমরেড রহিনী দত্ত, কমরেড পদ্ম, কমরেড সুনন্দা, কমরেড আব্দুল লতিফ, কমরেড আকমান মুন্সি, কমরেড আসকার গাজী, ডাক্তার ধীরেন্দ্রনাথ, কমরেড অধীর ধর, কমরেড মম্মথ ঘোষ, কমরেড ফুল মিয়া, কমরেড সুধাংশু বসু, কমরেড ভূষণ বিশ্বাস, কমরেড সুধাংশু দে, কমরেড যতীন পাল, কমরেড আব্দুস সামাদ, কমরেড মনিকা, কমরেড রাজেন হালদার, কমরেড বটু দত্ত, কমরেড করুণা কিশোর বিশ্বাস, কমরেড নূরজালাল, কমরেড আব্দুল আজিজ, কমরেড মোদাচ্ছের মুন্সি, কমরেড আবু, কমরেড সোনা মিয়া, আমিনা বেগম, কমরেড রসিক বিশ্বাস, কমরেড বিজয় বিশ্বাস, কমরেড রিক্তা দত্ত, কমরেড খালেক মিয়া, কমরেড ফরিদুদ্দাহার, কমরেড সুরেন সাহা, কমরেড সাইফুদ্দাহার, কমরেড হেমন্ত সরকার, কমরেড করুনা সরকার, কমরেড আশুতোষ বিশ্বাস, কমরেড নরেন বিশ্বাস, কমরেড সন্ন সরকার, কমরেড শিলা সরকার, কমরেড বামাচরণ গোলদার, কমরেড জ্ঞান সরকার, কমরেড পুলিন বিশ্বাস, কমরেড কিরণ বিশ্বাস, কমরেড রাজেন বৈরাগী, কমরেড দেবেন বিশ্বাস, কমরেড মহেন বিশ্বাস, কমরেড মণিদা, কমরেড পুলিন মল্লিক (সাতক্ষীরা), কমরেড ভবেন বিশ্বাস, কমরেড ভবেন সিকদার, কমরেড মানিক বিশ্বাস, কমরেড ডাক্তার জহর, কমরেড মজিদ মোল্লা, কমরেড নরেশ পাঠক, কমরেড জয়দেব বিশ্বাস, কমরেড প্রফুল্ল পাঠক, কমরেড নিরোধ লস্কর, কমরেড দয়াল পাঠক, কমরেড জোগেন বিশ্বাস, কমরেড অঘোর বিশ্বাস, কমরেড সুধীর পাঠক, কমরেড অনাথ বিশ্বাস, কমরেড নেপাল সরকার,কমরেড তারাকর, কমরেড অজিত বিশ্বাস,কমরেড নদেরচান বিশ্বাস, কমরেড চুনিলাল বিশ্বাস, কমরেড বিপিন সরকার, কমরেড অধোর গুপ্ত, কমরেড সুরেন সরকার, কমরেড ভুপেন বিশ্বাস, কমরেড জিতেন রায়, কমরেড দেবেন বিশ্বাস, কমরেড শিবু বিশ্বাস, কমরেড লাল মতি বিশ্বাস, কমরেড ফুলমতি বিশ্বাস, কমরেড সরলা সিং, কমরেড অনিমা বিশ্বাস, কমরেড জীবন গোপাল গুপ্ত, কমরেড বনমালী গোস্বামী, কমরেড বিমান গুপ্ত। বৃহত্তর যশোর জেলার তেভাগা আন্দোলনের সংগঠকদের সকলের নামও দেওয়া হলো। সেই সাথে নড়াইলের তেভাগা আন্দোলনের সংগঠক ও বিভিন্ন অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নামও উল্লেখ করেছি। এখানে কিছু নামের পুনরাবৃত্তি হলো বলে কেউ কেউ মনে করতে পারেন।
চলবে/১৭

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button