
কমরেড অমল সেনকে ঢাকায় আনা ও সেবা শুশ্রুষা :
কমরেড অমল সেন কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিকের বাসায় পৌঁছাবার পর তাঁর প্রত্যাশিত আশ্রয়স্থলে পৌঁছালেন বলে মনে হলো। এর আগে তিনি কয়েকবারই ক্ষোভের সাথে বলেছেন কমরেড ভূষণ রায়ের সামনে আমি হয়েছি একটি বালির বস্তা আর কমরেড বিমল বিশ্বাস হয়েছে মুটে। একথার মধ্য দিয়ে কমরেড অমল সেন বোঝাতে চেয়েছিলেন কমরেডদের সান্নিধ্যে থেকেই বৃদ্ধ বয়সের দিনগুলি কাটাতে চান। যে নিঃসঙ্গতার অভাব এগারোখানে থাকাকালীন সময়ে অনুভব ও উপলব্ধি করছিলেন সেই অভাব দূর হলো ঢাকায় এনে কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিকের বাসায় রাখার পর। কমরেড মানিকের ইস্কাটনের বাসার ঠিক বিপরীতেই ছিল পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেননের বাসা। ঢাকায় আসার পর অনেক শুভানুধ্যায়ী, পলিটব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো কোনো সদস্য দেখা সাক্ষাত করতে যেতেন। এর মধ্য দিয়ে কমরেড অমল সেন পার্টির খবরাখবর জানার ব্যাপারে এগারোখানে থাকাকালীন সময়ে যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা নিয়ে ছিলেন সে অভাবও দূর হলো। যতদিন কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিকের বাসায় ছিলেন স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলেই কমরেড অমল সেনের জন্য যে সেবামূলক দায়িত্বপালন করেছেন তা বিশেষভাবে উল্লেখ করাটাই যথার্থ বলে মনে করি। কমরেড অমল সেনের ঘুমাবার আগ পর্যন্ত কখন কি খাবেন থেকে শুরু করে ঔষধ, পথ্য, তা সময়মতই ব্যবস্থা করতেন কমরেড মানিক ও তাঁর স্ত্রী। বার্ধক্যজনিত কারণে কিছু অসুস্থতার মধ্য দিয়ে কমরেড অমল সেনকে দিন অতিবাহিত করতে হতো।
নিয়মিত মনে করে ঔষধ খাওয়ানোর কাজটিও কমরেড মানিক ও তাঁর স্ত্রীকে করতে হতো। কমরেড অমল সেনের সাথে সাক্ষাত করবার জন্য খবর পাঠিয়েছিলাম সেজো ভাই সরল সেনকে ও অনুশীলন যুগ থেকে শুরু করে কমরেড অমল সেনের সারাজীবনের সহযোদ্ধা আপন মামাতো ভাই সন্তোষ রায়কে। সরল সেন ও সন্তোষ রায় তাঁরা থাকতেন মধ্যম গ্রামে তাঁদের নিজেদের বাসায়। মধ্যম গ্রামে তাঁদেরকে আসার ব্যাপারে খবর পাঠিয়েছিলাম সিপিআইএমের ১২ বঙ্কিম স্ট্রিটের ন্যাশনাল বুক এজেন্সির তৎকালীন কর্মরত কমরেড শেখর দা’র মাধ্যমে। কমরেড শেখর দা’ও মধ্যম গ্রামেই থাকতেন। সেজো ভাই সরল সেন এবং সন্তোষ রায়ের পাসপোর্ট ও ভিসা পেতে অনেক সময় লেগে গিয়েছিল। তাঁরা যখন কমরেড অমল সেনের সাথে ঢাকায় সাক্ষাত করতে এলেন তখন কমরেড অমল সেন বাকরুদ্ধ। বাকরুদ্ধ যখন হলেন তার কিছুদিন আগথেকেই একেবারে ছেলেমানুষ হয়ে যান। মানিক ভাই ও তাঁর স্ত্রীর কোনো কথাই শুনতে চাইতেন না। এই ধরনের খারাপ পরিস্থিতিতেই সরল সেন ও কমরেড সন্তোষ রায় কমরেড অমল সেনের সঙ্গে দেখা করবার জন্য ঢাকায় আসলেন। সরল দা’ ও সন্তোষ দা’কে নিয়ে কমরেড অমল সেনের সাথে সাক্ষাত করবার জন্য কমরেড মানিকের বাসায় গেলাম। তখন কমরেড অমল সেন আমার দিকে ভয়ঙ্কর রুদ্রমূর্তিতে তাকিয়েছিলেন। কমরেড অমল সেনের অনুভূতি মনে হয় এমনি ছিল যে ওদেরকে যখন আনা হলো তা এত বিলম্বে কেন? আমাদের দিক থেকে সরল সেন ও সন্তোষ রায়কে খবর পাঠাবার ক্ষেত্রে কোনো বিলম্ব হয়নি। ন্যাশনাল বুক এজেন্সির শেখর দা’র সাথে আমার প্রায়ই কথা হতো। আরও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে বামপন্থীদের অকৃত্রিম বন্ধু ডা. কামরুজ্জামানের প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য কমরেড অমল সেনকে ভর্তি করা হয়। মগবাজারে অবস্থিত ঢাকা কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসারত অবস্থায় ২০০৩ সালের ১৬ই জানুয়ারি কমরেড অমল সেন মৃত্যুবরণ করেন। পূর্বেই পলিটব্যুরোতে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল কমরেড অমল সেনকে বাকড়ি স্কুল প্রাঙ্গণে সমাধিস্থ করা হবে। সে অনুসারে বাকড়ি স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে স্কুলের জায়গায় কোথায় সমাধিস্থ করা হবে তা আগেই নির্ধারিত ছিল। ১৬ই জানুয়ারি পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন সিঙ্গাপুরে একটি জরুরি কাজে যান। তাই কমরেড অমল সেনের মরদেহ ১৭ই জানুয়ারি একদিন পর যশোর-নড়াইলের বাকড়ি গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৬ই জানুয়ারি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কমরেড অমল সেনের মরদেহে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ওয়ার্কার্স পার্টির অফিসে এসেছিলেন। ১৬ই জানুয়ারি রাতে ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সিরাজুল ইসলামের (রংপুর) নেতৃত্ব পার্টির রেডগার্ডরা সারারাত মরদেহের প্রতি সম্মান জানিয়ে সতর্ক প্রহরায় ছিল।
পলিটব্যুরোর সদস্য কমরেড সুশান্ত দাস, কমরেড হাজেরা সুলতানাও ছিলেন। কমরেড সুশান্ত দাশ ঐদিন সিলেটে অবরোধ থাকার পরও ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় পৌঁছেছিলেন। প্রখ্যাত কৃষক নেতা কমরেড হাজী মোহাম্মদ দানেশের নাতি শুভ কয়েকজন রেডগার্ড নিয়ে গভীর রাতে এসে কমরেড অমল সেনকে স্যালুট জানিয়েছিলেন। ১৭ই জানুয়ারি সকালে কমরেড অমল সেনের মরদেহ নিয়ে পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্যদের প্রায় সকলে এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের কেউ কেউ, শ্রমিক, ছাত্র, যুব, নারী, সংস্কৃতিসেবীদের নেতৃবৃন্দ বাকড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। ফেরী পারের ব্যাপারে তৎকালীন বিএনপি নেতা শিমুল বিশ^াস (বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের আমল থেকেই আমাদের দল করতেন) প্রভূত সহযোগিতা করেছিলেন।
গোয়ালন্দ ঘাটে গোয়ালন্দ ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃবৃন্দ কমরেড অমল সেনকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। তারপর কমরেড অমল সেনের মরদেহ রাজবাড়ীতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শ্রদ্ধা জানাবার পর কমরেড অমল সেনের মরদেহ নিয়ে ফরিদপুরের মধুখালীতে আমরা পৌঁছালাম। ফরিদপুর জেলা পার্টির পক্ষ থেকে সেখানে শ্রদ্ধা জানানো হয়। মধুখালী থেকে যশোর আসার পথে মাগুরা ও ঝিনাইদহের পার্টিও শ্রদ্ধা জানিয়ে ছিল। তারপর কমরেড অমল সেনের মরদেহ যশোর টাউনহল ময়দানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে দেখলাম ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদীর রাজ্য কমিটির সম্পাদকম্ডলীর সদস্য কমরেড অমিতাভ বসু (কমরেড অমিতাভ বসুর আদি বাড়ি ছিল মাগুরা জেলার বিনোদপুরে। কমরেড অমিতাভ বসুদের রূপগঞ্জের বাধাঘাটের উপরে তাঁদের নিজস্ব বাড়ি ছিল। তেভাগা আন্দোলনের সময়ই কমরেড অমল সেনের সংস্পর্শে এসেছিলেন) ও কৃষক সভার পশ্চিম বাংলার রাজ্য কমিটির নেতা কমরেড জয়ন্ত ভট্টচার্য কমরেড অমল সেনকে শ্রদ্ধা জানাবার জন্য এসেছিলেন। যদিও তৎকালীন পশ্চিম বঙ্গের রাজ্য কমিটির সম্পাদক কমরেড অনিল বিশ্বাসকে কমরেড অমল সেনের মৃত্যুর আগেই তাঁর জীবনাশঙ্কাজনক পরিস্থিতির কথা জানানো ছিল। যশোর টাউনহল ময়দানে কমরেড অমল সেনের মরদেহে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেছিলেন যশোরের সকল বামপন্থী প্রগতিশীল দল ও বিভিন্ন শ্রেণীপেশার প্রতিনিধিরা। যশোর টাউনহল থেকে রওনা দিয়ে নড়াইল ডাকবাংলায় এনে কমরেড অমল সেনের মরদেহ রাখা হয়। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কমরেড অমল সেনকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। কমরেড অমল সেনের মরদেহ নিয়ে তুলারামপুর ব্রীজ হয়ে এগারোখানের উদ্দেশ্যে আমরা রওনা দিয়েছিলাম। মালিয়াট মোড়ে ওখানকার জনগণ আমাদের বাধ্য করেছিল কমরেড অমল সেনের মরদেহ ট্রাক থেকে নামাতে। মালিয়াট মোড়ে কমরেড অমল সেনকে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের পর বাকড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। তখন দেখেছিলাম রাস্তায় দুই ধারে লাল পতাকা দিয়ে সমস্ত পথকে সুসজ্জিত করা হয়েছে। গোবর দিয়ে কাঁচা রাস্তা লেপে এমন এক দৃশ্যপট তৈরি করা হয়েছেÑ কমরেড অমল সেন ওই অঞ্চলের শিশু-কিশোর থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত জনগণের একান্তই আপনজন। বাকড়ি স্কুলে মরদেহ নামাবার পর বিভিন্ন গ্রাম থেকে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, নারী-পুরুষ, ছাত্র-যুবক সকলে কমরেড অমল সেনের মরদেহে শ্রদ্ধা জানাবার জন্যে অধীর আগ্রহ নিয়ে সমাবেশিত হয়েছিলেন। কমরেড অমল সেনের মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদীর রাজ্য সম্পাদকমÐলীর সদস্য কমরেড অমিতাভ বসু, কৃষক সভার নেতা কমরেড জয়ন্ত ভট্টাচার্য, পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন, আমিসহ আরও কেউ কেউ।
কমরেড অমল সেনকে বাকড়ি স্কুল প্রাঙ্গণে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে ভাবগম্ভীর পরিবেশে সমাহিত করা হল। ¯স্লোগান উঠলো দাদু তোমায় কথা দিলাম লাল পতাকা ছাড়বো না। মুহুর্মুহু স্লোগানের মধ্য দিয়ে সকলেই একে একে সমাধিস্থল ত্যাগ করলেন।
চলবে/




