sliderমতামতশিরোনাম

কমরেড অমল সেন, তেভাগার লড়াই ও কমিউনিস্ট আন্দোলন : পরিচ্ছেদ-২০

বিমল বিশ্বাস

কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুনর্গঠন ও কমরেড অমল সেন :

১৯৯২ সালে ৪ঠা মে তারিখে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি ও খন্দকার আলী আব্বাসের নেতৃত্বে সাম্যবাদী দলের একাংশ মিলে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি নামে পুনঃর্গঠিত হলো। পার্টির সভাপতি হলেন কমরেড অমল সেন সাধারণ সম্পাদক কমরেড রাশেদ খান মেনন। আমি ছিলাম ঐ পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্যদের মধ্যে একজন। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি মিরপুরে ৫ম পার্টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত করেছিল। কেন ৫ম পার্টি কংগ্রেস সে সম্পর্কে ইতিহাসের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা সমীচীন মনে করি সেকারণেই উল্লেখ করছি। আমরা ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের উত্তরাধিকার। ১৯৪৩ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৮ সালে ২য় পার্টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ৩য় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মস্কো-পিকিং বিরোধের প্রেক্ষিতে ১৯৬৭ সালের ইপিসিপি এম-এলের কংগ্রেসকে ধরা হয়েছিল ৪র্থ পার্টি কংগ্রেস।মাঝখানে পার্টির যত ভাঙ্গা-গড়া হউক না কেন যত সম্মেলন ও কংগ্রেস হউক এগুলো হবে ইতিহসের অংশ-এটাই ছিল ঐক্যমত। সে মোতাবেক ১৯৯৫ সালের পার্টি কংগ্রেসকেই ৫ম পার্টি কংগ্রেস হিসাবে নির্ধারণ করা হয়। যদিও এসব হিসাবকে বর্তমান বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি একেবারেই বাতিল করে দিয়েছে। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি নতুন ধারায় গড়ে উঠেছিল ১৯৭২ সালে এটাই এখন তাদের সিদ্ধান্ত।

৫ম পার্টি কংগ্রেসের আগেই কমরেড অমল সেন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমনকি তাঁর জীবন আশঙ্কায় আমরা শঙ্কিত হয়ে পড়ি। ১৯৯৫ সালের পার্টি কংগ্রেস উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন কমরেড অমল সেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে প্রকাশ্য অধিবেশনে কমরেড অমল সেন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। পার্টির পতাকা উত্তোলন করেছিলেন কমরেড রাশেদ খান মেনন। সুসজ্জিত র‌্যালী ও লাল পতাকার জমায়েত কমরেড অমল সেনের সুস্থ হয়ে উঠার জন্য টনিকের মতো কাজ করলো। মিরপুরের পার্টি কংগ্রেসে কমরেড অমল সেনের অনুপস্থিতিতেই তাঁকে ওয়ার্কাস পার্টির সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।

২০০০ সাল পর্যন্ত কমরেড অমল সেন পার্টির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সময়কালে কমরেড অমল সেন উল্লেখযোগ্য তেমন রাজনৈতিক বিতর্কে অংশ নেননি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্র্ণ বিতর্ক ছিল ১৯৯০ সালে পেরেস্ত্রাইকা ও গøাস্তনস্তের নামে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক বিপর্যয়ের প্রাককালে যারা পেরেস্ত্রাইকা ও গøাস্তনস্তের পক্ষে ছিলেন তাদের বিরোধিতা করে কমরেড অমল সেন মার্কসবাদ ও সমাজতন্ত্রের পক্ষে বলিষ্ঠভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। ২০০০ সালের নভেম্বর মাসে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ওয়ার্কার্স পার্টির ৬ষ্ঠ পার্টি কংগ্রেস। ওই কংগ্রেস থেকে তিনি সভাপতির দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। নতুন নির্বাচিত সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেননের হাতে পার্টির লাল পতাকা তুলে দেন। আমি ওই কংগ্রেসে ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। ঐদিন সন্ধ্যায়ই কমরেড অমল সেনকে নিয়ে যশোর নড়াইলের এগারোখানের বাকড়ি গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম। সারাপথ কমরেড অমল সেনকে বলেছিলাম, শরীরে না কোলালে আপনি যেখানেই থাকতে চাইবেন সেখানেই ব্যবস্থা করা যাবে। ইশ্বরদী এসে জিজ্ঞাসা করলাম আপনার কি কোনো কষ্ট হচ্ছে? যদি হয় তাহলে আমরা এখানে থেকে যেতে পারি। একই ভাবে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, যশোরে এসেও কোথাও থাকার কথা বললে তিনি সবসময়ই এগারোখানে পৌঁছাবার আগ্রহের কথাই বলতে থাকেন।

যশোরের সদর থানার পাশে গাড়ি থামিয়ে মধুর রেস্তোরা থেকে মিষ্টি এনে কমরেড অমল সেনকে খেতে দিলাম। গাড়িতে বসে মিষ্টি খেলেন, পানি খেলেন। বাকড়ি গ্রামে রাত ১১টায় কমরেড ভূষণ রায়ের বাড়িতে পৌঁছলাম। রাতে খাবারের পর কমরেড অমল সেন ঘুমিয়ে পড়লেন। পরদিন সকালে যখন কমরেড অমল সেনের কাছ থেকে ঢাকায় আসার জন্য বিদায় বললাম, কমরেড অমল সেন সাথে সাথে আমাকে প্রশ্ন করলেন তুমি আবার কবে আসবে? জবাবে বললাম, যতদ্রæত পারি আসবো। কিছুদিনের মধ্যে আমি বাকড়ি গেলাম।

কমরেড অমল সেনের সাথে আলোচনার একপর্যায়ে তিনি বললেন, আমার সাথে তো কেউ দেখা সাক্ষাৎ করতে আসে না। তখন আমি কমরেড অমল সেনকে নির্দিষ্ট কয়েকজন কমরেডের নাম বললাম এবং তারা দেখা করবেন একথা বললাম। কিন্তু মাঝে মাঝে একজন ছাড়া পারতপক্ষে কেউ দেখা সাক্ষাৎ করেন না বলে বলেছিলেন। আমি তাঁর জবাবে বলেছিলাম, আগামীতে অবশ্যই তারা আপনার সাথে দেখা করবে এবং আলোচনা করবে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালো কমরেড অমল সেন একাকিত্ব এবং কারোর দেখা সাক্ষাৎ না থাকার কারণে খাওয়াই বন্ধ করে দিলেন। এই খবর ঢাকায় পৌঁছাবার পর আমি বাকড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম। ঐসময় আমার সাথে গিয়েছিলেন সিপিআইএমের রাজ্য কমিটির পত্রিকা গণশক্তির কমরেড অনমিত্র চট্টোপাধ্যায়। প্রথমে আমাকে দেখেই একটু মুচকি হেসে পরক্ষণেই ক্ষুব্ধতার দৃষ্টিতে তাঁকাতে লাগলেন। কমরেড ভূষণ রায় ও তাঁর স্ত্রী আমাকে বারবার বলতে লাগলেন কোনো অনুনয় বিনয় করেও কমরেড অমল সেনকে খাওয়ানো যাচ্ছে না। তখন তাৎক্ষণিক বুদ্ধি করে কমরেড অমল সেনকে বললাম, আপনি পার্টির শৃঙ্খলা মানছেন না কেন? আপনি তো পার্টির নির্দেশেই এখানে আছেন, বলার সাথে সাথে কমরেড অমল সেন খেতে রাজী হলেন। এব্যাপারে আমার ‘উজান স্রোতের যাত্রী’ বইয়ে কমরেড অনমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য প্রতিবেদনে চমৎকার ভাবে লিখেছেন।

ঢাকায় ফিরে পার্টি নেতৃত্বের সাথে দ্রæত আলোচনা করে কমরেড অমল সেনকে ঢাকায় আনা হলো। কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিকের ইস্কাটনের বাসায় কমরেড অমল সেনকে রাখা হয়েছিলো।
চলবে/

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button