sliderমতামতশিরোনাম

কমরেড অমল সেন, তেভাগার লড়াই ও কমিউনিস্ট আন্দোলন : পরিচ্ছেদ-১৬

বিমল বিশ্বাস

কমরেড চারু মজুমদারের সাথে সাক্ষাত ও অন্যান্য ঘটনা :

আমরা ডুন মিত্রের বাসায় থেকে বিভিন্ন স্থানে চারু মজুমদারের নেতৃত্বে পরিচালিত পার্টি সিপিআই এম-এল নেতৃবৃন্দের সাথে দেখা করেছিলাম। সিপিআই এম-এলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড সুনীতি ঘোষ, পশ্চিম বাংলা রাজ্য কমিটির সম্পাদক কমরেড সাধন সরকার (বেহালা), নকশালবাড়ির ফাঁসিদার এলাকার জেল পালানো কমরেড দীপক সরকারের সাথে আলোচনা হয়েছিল। কমরেড দীপক সরকার তো বলেই ফেললেন কমরেড চারু মজুমদারকে ভারত ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অথরিটি হিসাবে মেনে নেওয়া উচিত। শুধু তাই নয় ভিয়েতনাম বিপ্লবের একটি ভুল শিক্ষা আমাদের বলবার চেষ্টা করলেন। ভিয়েতনামে মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যত লড়াই করুক আসল লড়াইটা ভিয়েতনাম পার্টি করছে ভিয়েতনামের জমিদার-জোতদার গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে- এই ছিল দীপক সরকারের বক্তব্য। বলার চেষ্টা করলেন পাকিবাহিনীর বিরুদ্ধে আমাদের প্রধান লড়াইয়ের পরিবর্তে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় জোতদার মহাজনদের বিরুদ্ধেই লড়াইই হবে মুখ্য কাজ। এসব কথা কি আমাদের বলে কোনো লাভ ছিল? এই প্রশ্ন তখন দীপক সরকারকে যেমন বলেছিলাম তেমনি বৃহত্তর যশোর জেলায় পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে ইপিসিপি এম-এলের বিরোচিত লড়াইকে যারা খাঁটো করতে চান তাদেরকেও স্মরণে আনবার জন্য। শুধু তাই নয় একথাও বলতে বাধ্য হচ্ছি বাংলাদেশ সরকারের আর্কাইভ থেকে তথ্য নিয়ে আমার বক্তব্যকে খÐন করার চেষ্টা করলে খুশি হবো। যদিও ১৯৭২ থেকে ইপিসিপি এম-এলের ভ্রান্ত রাজনীতি, ভ্রান্ত আদর্শ-কৌশল সবদিক থেকেই ছিল ভ্রান্ত। আমি তখনও পার্টিতে তীব্রভাবে বিরোধিতা করেছি আজও করি।

ভারতে থাকাকালীন সময়ে পশ্চিম বাংলার যেসমস্ত অঞ্চলে খুলনার দিঘলিয়া থানার কোলাপাটগাতি থেকে শুরু করে গোবরা ও এগারোখান অঞ্চলের শরণার্থীরা যেসব ক্যাম্পে উঠেছিলেন কমরেড অমল সেন সকল ক্যাম্পে শরণার্থীদের সাথে দেখা করেছেন। আমি মুর্শিদাবাদ শরণার্থী ক্যাম্পে গিয়ে জানলাম কমরেড অমল সেন অন্তত দুইবার মুর্শিদাবাদ শরণার্থী ক্যাম্পে গিয়েছেন ও খোঁজখবর নিয়েছেন। কমরেড সন্তোষ মজুমদার, কমরেড হরিপদ বিশ^াস ও কমরেড ভবেশ বিশ^াসের সাথে শরণার্থীদের কোন ক্যাম্পে দেখা হয়েছিল তা আজ স্মরণে নেই।

১৯৭১ সালে কমরেড অমল সেন, কমরেড নজরুল ইসলাম ভারতে গিয়ে জাতীয় মুক্তি সমন্বয় কমিটি গঠন করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়াকে যথার্থ মনে করেছিলেন। কিন্তু কাজী জাফর আহমেদ, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রণো, আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া, মোস্তফা জামাল হায়দার এদের সাথে কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করতে যাওয়া সেদিনও আমার পক্ষে মেনে নেওয়া ছিল কঠিন আজও এব্যাপারে কমরেড অমল সেনের পদক্ষেপ যথার্থ ছিল বলে মনে করতে পারি না। আমি কারাগার থেকে বেরিয়ে প্রথম সাক্ষাতে ষষ্ঠীতলা পাড়ায় এগারোখানের বাকড়ি গ্রামের জীবনবীমা অফিসার অরবিন্দু বিশ্বাসের সামনে এই প্রশ্ন তুললে কমরেড অমল সেন আমার কথার কোনো জবাব দেননি। ১৯৭২ সাল থেকেই কমরেড অমল সেন আমি যাতে ভুল পথ থেকে বেরিয়ে আসি সেজন্য বাকড়ি গ্রামের কমরেড ভূষণ রায়ের বাড়িতে লেনিনবাদী পার্টির আন্তঃপার্টি ফোরাম পত্রিকা রেখে দিতেন। কমরেড ভূষণ রায় জেনে শুনে আমাকে কখনো ওই পত্রিকা পড়তে বলতেন না। আমি মনে করতাম কমরেড ভূষণ রায়কে পড়ার জন্যই কমরেড অমল সেন দিয়েছেন। একদিন আমি কমরেড ভূষণ রায়কে পত্রিকা প্রসঙ্গে কথা তুললে তিনি আমাকে বললেন, আপনি এটা বুঝেন না এ পত্রিকা আমাকে পড়তে তিনি দেননি, এটা আপনার জন্য দিয়েছেন? সেদিন থেকে ১৯৭৪ সালের ১৩ই মে গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত লেনিনবাদী পার্টির ফোরামের নিয়মিত লেখা গুলো পড়তাম।

পার্টির হাতে অস্ত্র রাখা উচিৎ কি উচিৎ না এ প্রসঙ্গে কমরেড অমল সেনের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল ওই অস্ত্রই শ্রেণি সংগ্রাম গড়ে তোলা, শ্রেণী চেতনা বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে কাজ করবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ছিল বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলেও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে শ্রেণীসংগ্রামের মধ্য দিয়ে পরাভূত না করতে পারলে সাম্প্রদায়িকতা সমাজ ও রাষ্ট্রজীবন থেকে দূর হবে না। যতদূর মনে পড়ে শ্রেণী সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিতর্ক ছিল। ওই সময়েই ফোরাম পত্রিকার লেখাগুলির মধ্যে কমরেড অমল সেনের লিখিত বক্তব্যগুলি আমার সঠিক চিন্তায় পৌঁছাতে অনেক সাহায্য করেছে।

১৯৭৪ সালে আমি গ্রেফতার হলে পরদিনই যশোর জেলা প্রশাসককে বুদ্ধিমত্তার সাথে কমরেড অমল সেন বলেছিলেন বিমল বিশ্বাসকে হত্যা করা হলে যশোর ও খুলনা জেলার হিন্দু অঞ্চল দেশত্যাগ করলে আওয়ামী লীগ সরকারের ইমেজ ক্ষুণœ হবে। তাই বিমল বিশ্বাসকে রক্ষীবাহিনীর হাত থেকে বাঁচাবার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিবেন বলে আশাকরি।

কাজী জাফর আহমেদ, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রণো, মান্নান ভূইয়া, মোস্তফা জামাল হায়দার ষাটের দশকে ছাত্র গণআন্দোলনে তাদের অবদানকে যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করি। তাদের গঠিত দল ইউপিপি আমি গ্রেফতার হলে আমার মুক্তি দাবি করার জন্যেও ব্যক্তিগত ভাবে কৃতজ্ঞ। কিন্তু তাঁরা অধিকাংশই মার্কসবাদী দর্শনে বিশ্বাসের কথা বলে মূলত ভাববাদী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। কাজী জাফর আহমেদ, মান্নান ভূইয়া, মোস্তফা জামাল হায়দার শোষক শ্রেণীর দলে যোগদান করার ফলে তা প্রমাণিত হয়ে গেছে। মেনন ভাইও আপাদমস্তক একজন যোগ্যতাসম্পন্ন পেটিবুর্জোয়া-বুর্জোয়া রাজনীতিবিদ এব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি শ্রমিকশ্রেণীর দর্শন, বস্তুবাদ ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দর্শনে কখনোই বিশ^াসী ছিলেন না। বস্তুবাদী দর্শনের পরিবর্তে রাশেদ খান মেননের নেতৃত্ব পর্যায়ে যখন আদর্শ রাজনীতি সমাজজীবন ব্যক্তি জীবনে ভাববাদী দর্শনের চর্চাকেই মূল দর্শন হিসাবে গ্রহণ করেন তখন আর তাদের কমিউনিস্ট আদর্শের অনুসারী হিসাবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ থাকে না। হঠাৎ করে বস্তুবাদী দর্শন থেকে ভাববাদী দর্শনের ছাত্র কেউ হয়ে যায় না।
চলবে/

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button