
সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও দেশ ভাগের প্রভাব :
আগেই উল্লেখ করেছি, ১৯৪৮ সালে কমরেড অমল সেন গ্রেফতার হয়ে যান। যশোর কারাগারে থাকাকালীন সময়ে বাইরে থেকে যে খবর পেতেন তা হলো একদিকে হিন্দু পরিবার থেকে আগত কমিউনিস্ট নেতাকর্মী শুভানুধ্যায়ীদের ব্যাপক হারে দেশত্যাগ অন্যদিকে বৃটিশ ও পাকিস্তান পুলিশের সীমাহীন ও অবর্ণনীয় নির্যাতনে কর্মী ও জনগণের মধ্যে ব্যাপক হতাশা। এই হতাশাজনক পরিস্থিতিতে যশোর শহরের অনেক ভালো কর্মী গাঁজায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। আদর্শ ও রাজনীতি থেকে অনেকেই সরে যাচ্ছে সেই অবস্থায়ও কমরেড অমল সেন হতাশ হননি। পরবর্তীকালে ঢাকা কারাগারে আসার পর ঢাকা জেলের এক-দুই খাতায় থাকতেন যেখানে কমরেড অনিল মুখার্জী, কমরেড জ্ঞান চক্রবর্তী, কমরেড অজয় রায়, কমরেড মুকুল সেনসহ ৫০ জন বন্দী ছিলেন। তার মধ্যে ৪৫ জনই ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও কর্মী। ঢাকা কারাগারে থাকাকালীন সময়ে “মুখর” নামে হাতে লেখা একটি পত্রিকা বের হতো। এই পত্রিকায় কমরেড অমল সেন শুধু লিখতেন না পত্রিকার লেখা সংগ্রহ ও বের করার ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতেন। ওই সময়কালে তৎকালীন পার্টির গৃহীত রাজনৈতিক লাইন সম্পর্কে কমরেড অমল সেন লিখে গেছেন। এখানে শুধু এটাই উল্লেখ করতে চাই, পার্টির গৃহীত রাজনৈতিক লাইন নিয়ে আলোচনা সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও কমরেড অমল সেন সবসময় উদ্যোগী ভূমিকা নিতেন।
তিনি মতাদর্শগত রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি ঐ সময়ে ঢাকা কারাগারে দুটি নাটক মঞ্চস্থ করার ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছিলেন। শরৎচন্দ্রের পল্লী সমাজের নাট্যরূপ নাম ছিল ‘রমা’, এই নাটকে কমরেড অমল সেন জেঠী মার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। কারাগারে মুনীর চৌধুরীর রচিত ‘কবর’ নাটকেও কমরেড অমল সেন অভিনয় করেছেন। কারা অভ্যন্তরে আদর্শগত ও রাজনৈতিক শিক্ষা জেল কর্তৃপক্ষের অনেক বিধি-নিষেধ থাকা সত্তে¡ও আটকাতে পারেনি। নাটক মঞ্চস্থ করা এসব ক্ষেত্রে কমরেড অমল সেন ছিলেন কমিউনিস্ট বন্দীদের মধ্যে পুরোভাগে। কমরেড অমল সেন ও প্রাক্তন সিপিবি নেতা কমরেড অজয় রায়ের সাথে আলোচনায় ও লেখায় উল্লিখিত বিষয়ে জেনেছি। ঢাকা কারাগারে কমিউনিস্ট বন্দীদের মধ্যে একসময় কমরেড হেমন্ত সরকার ও তেভাগা আন্দোলনের নেতা বামাচরণ গোলদারও ছিলেন।
বামাচরণ গোলদার কমরেড হেমন্ত সরকারের থেকে বয়সে বড় ছিলেন এবং আত্মীয়তা সূত্রে তিনি ছিলেন কমরেড হেমন্ত সরকারের ভগ্নিপতি। রান্নাবান্না ও খাবার-দাবার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কমরেড হেমন্ত সরকার যখন দায়িত্বে ছিলেন তখন একদিন ইলিশ মাছ রান্না হলে কমরেড হেমন্ত সরকার ইলিশ মাছের লেজ রেখেছিলেন কমরেড বামাচরণ গোলদারের জন্য। কমরেড বামাচরণ গোলদার এই ঘটনায় কমরেড হেমন্ত সরকারের সাথে সীমাহীন দূর্ব্যবহার করেছিলেন। পার্টির জেল কনসলিডেশনের কাছে কমরেড বামাচরণ গোলদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন কমরেড হেমন্ত সরকার। পার্টির জেল কনসলিডেশন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বামাচরণ গোলদারের সাথে কেউ কথা বলবে না। এই সিদ্ধান্তের পর দিনের পর দিন যেতে থাকে। এক পর্যায়ে কমরেড বামাচরণ গোলদার সরকারের কাছে মুচলেকা দিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন। পার্টির কনসলিডেশন কমরেড বামাচরণ গোলদারকে বহিঃষ্কার করে। একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে কমরেড বামাচরণ গোলদারকে নড়াইল থানায় হাজিরা দিতে হতো। কমরেড বামাচরণ গোলদার যখন কারাগারে তখন তার স্ত্রী ও তিন পুত্র সন্তান বাইরে এক আর্থিক দুরাবস্থার মধ্যে জীবন যাপন করছিলেন। অন্যদিকে পার্টির নেতাকর্মীদের বড় অংশের দেশত্যাগ, অন্যরা কারাগারে সেই কঠিন পরিস্থিতিতে পার্টি কনসলিডেশনের সিদ্ধান্ত কমরেড বামাচরণ গোলদারের সাথে কথা বলা যাবে না এটা কতখানি যৌক্তিক সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
আমি যখন নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজে ছাত্র সংগঠন ও ছাত্র আন্দোলনের কাজে উদ্যোগী ভূমিকায় ছিলাম তখন কমরেড বামাচরণ গোলদারের ছোটপুত্র কমরেড বিনয় গোলদার ছাত্র সংগঠন-ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিতে থাকে। ১৯৬৬/৬৭ সালে বড়েন্দার গ্রামের ছাত্রদের মধ্যে বিনয় গোলদার, কৃষ্ণপদ আঢ্য ছাত্র সংগঠন ও আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতো। বিনয় গোলদারের প্রস্তাবে আমি তাদের বাড়িতে যাই। তখন বড়েন্দার গ্রামের কমরেড আশুতোষ আঢ্য আমাকে বলেন, বামাচরণ গোলদার পার্টি থেকে একজন বহিঃষ্কৃত ব্যক্তি ছিলেন এবং সরকারকে মুচলেকা দিয়ে কারামুক্ত হয়েছিলেন। আমাকে প্রশ্ন করে বলেন, তুমি কী তা জানো? উত্তরে বলেছিলাম, আমার তো তা জানা নেই। আমি যখন ঐ বাড়িতে এসেছি তার অনেক আগেই কমরেড বামাচরণ গোলদার মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি যখন বড়েন্দারসহ ওইসব গ্রামাঞ্চলে সংগঠনের স্বার্থে কাজে গিয়েছি তার এক পর্যায়ে কমরেড অমল সেন দীর্ঘ ১০ বছর পর কারাগার থেকে ছাড়া পান। আমি যখন কমরেড অমল সেনের পূর্ব পরিচিত বামাচরণ গোলদারের বাড়িতে তাঁকে নিয়ে যাই তিনি তখন কোনো প্রশ্ন না তুলেই ঐ বাড়িতে যান। আমি যখন কমরেড বামাচরণ গোলদারের কারাগারের ঘটনাবলি এবং মুচলেকা দেওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন করি তখন কমরেড অমল সেন নির্বাক এবং নিরুত্তর ছিলেন। আমার বুঝতে কষ্ট হলো না কমরেড অমল সেন জেল কনসলিডেশনের সিদ্ধান্তকে যথার্থ মনে করেননি। ১৯৭০ সালে কমরেড হেমন্ত সরকারকেও মৃত কমরেড বামাচরণ গোলদারের বাড়িতে আত্মগোপনে রেখেছিলাম। বস্তুত কমরেড বামাচরণ গোলদারের বাড়ি পরবর্তীকালে আমাদের সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল ছিল।
১৯৭১ এ রাজাকারেরা কমরেড বিনয় গোলদারকে নির্মম ভাবে হত্যা করেছিল। এই ধরনের ঘটনাবলি সকলের জানার জন্য প্রসঙ্গটি উল্লেখ করলাম ।
চলবে/১৪




