Uncategorized

একজন শক্তিমান গানের ওস্তাদ মফিজুল ইসলাম (মহর) শাহ এর প্রয়াণ

মো.নজরুল ইসলাম,মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি : ”প্রত্যেক জীবকেই তার মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হবে, কৃতকর্মের ফল থাকবে যুগের পর যুগ” মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার চর গড়পাড়া অঞ্চলের কৃতি সন্তান একজন ওস্তাদ মফিজ শাহসকলকে কাদিয়ে অসময়ে চলে গেলেন পরপারে।
মানিকগঞ্জের বিশিষ্ট লোক সংগীত শিল্পী মানিকগঞ্জ কালু শাহ একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ওস্তাদ মফিজুল ইসলাম মহর গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তার নিজ বাসভবনে রাত ১১.৩০মি. না ফেরার দেশে প্রস্থান করেন।

তিনি ১৯৫৯সালে ১১ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার চরগড়পাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আলতাফ বেপারী এবং মায়ের নাম লালজান বেগম। তার স্ত্রী আমেনা মফিজ,তার একমাত্র সন্তান বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী ইশতিয়াক আহমেদ ও কন্যা সংগীত শিল্পী লাবনী আক্তার।
তিনি আজীবন নেশা ও পেশাগতভাবে সংগীত সাধনা করে গেছেন।তিনি যৌবন কালে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বৈঠকী গান করার জন্য জেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে চষে বেড়িয়েছন। তিনি বাংলাদেশ বেতার টেলিভিশন এর নিয়মিত কন্ঠ শিল্পী ছিলেন।সংগীত পাগল এই মানুষ তার অক্লান্ত শ্রম ও সাধনা দিয়ে সংস্কৃতি ভুবনে অসামান্য অবদানরেখে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এই জনপদের মানুষ তাকে কেবল গানের ওস্তাদ হিসেবে নয় সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সৈনিক হিসেবে আজীবন মনে রাখবে।
তারএই আকস্মিক মৃত্যুতে আমাদের সংগীত অঙ্গনের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেলো। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন মানিকগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মো.রমজান আলী, জেলা সেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও তরিকা জগতের মাস্তান লিয়াকত হোসেন ভান্ডারী, জেলা কালচারাল অফিসার সাইয়েদা সেলিনা সুলতানা আক্তার,সুফী গবেষক ও লেখক মো. মোশারফ হোসেন,আমেরিকা প্রবাসী এ্যাড.লুৎফর রহমান হিমেল,জেলা মানবাধিকার ফোরাম এর সমন্বয়করি বিমল চন্দ্র রায়,মানিকগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারন সম্পাদক বিশিষ্ট সাংবাদিক জাহাঙ্গাীর আলম বিশ^াস, জেলা উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সাধারন সম্পাদক আরাফাত ইসলাম সুইট, সপ্তসুর এর সভাপতি অধ্যাপক বাসুদেব সাহা,বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের জেলা সভাপতি অধাপক শ্যামল কুমার সরকার, হিরালাল সেন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংঘের সাধারন সম্পাদক মো.নজরুল ইসলাম,সাং¯স্কৃতিক বিপ্লবী সংঘ সাবিসের সমন্বয়কারি কামাল আহমেদ কমল প্রমুখ। এছারাও বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।সুধীমহলের প্রত্যেকেই শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা ও তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন।
স্মৃতিতে অম্লান একজন ওস্তাদ মফিজ শাহ- ব্যক্তিগতভাবে আমি ২০০২ সালে মানিকগঞ্জ জয়রা কলেজে পড়ার সময় কলেজ রোডেই প্রয়াত বখশী জাহাঙ্গীর আলম স্যার এর মাধ্যমে তার সাথে আমার পরিচয়। লিয়াকত ভান্ডারীর বাসায় একটা গানের অনুষ্ঠানে তার সাথে আরো সখ্যতা হলো। আমাকে ভালোবেসে তার জয়রা রোডের বাসায় নিয়ে আসলেন। আপ্যায়ন ও পরিচয় হলো তার স্ত্রী আমেনা মফিজ, পুত্র ইসতিয়াক ও কন্যা লাবনীর সাথে আলাপচারিতা করে আরো আনন্দিত হলাম। অসাধারণ একটা প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক পরিবার সবাই ভালো গান করেন। তাদের গানের ভূবনে আমি বেশ আপ্লুত হলাম। তারপর ২০০৪-০৫ শিক্ষাবর্ষে আমি মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী থাকার সময়ে বেউথা খাজা রহমত আলীর বাসায় লজিন থাকি সেখানেও মাঝে মাঝেই দেখা পাই ওস্তাদ মফিজ শাহকে। শহরের প্রাণকেন্দ্র বিজয় মেলার মাঠে,চায়ের ঘরে ও টাউন হলে তার প্রাণের কালু শাহ একাডেমি ঘিরে তার সাথে জমেছে অনেক আড্ডা। সুফী ও বাউল মতবাদের আদ্যাশক্তির নিগুঢ় রহস্য উদঘাটনে তার সাথে হয়েছে অনেক ঝগড়া, তর্ক বিতর্ক ও বাহাস। পরদিনই আবার সবকিছু নিমিষেই ভুলে আদর করে নিতেন বুকে। আমাদের অপরাধ ভুলে ওপারে ভালো থাকুন ওস্তাদ মফিজ শাহ।
তিনি মূলত গানের ভূবনেই সারাদিন ডুবে থাকতেন। একা কাপ চা ও একটা সিগারেট হলেই গান ও আড্ডা জমত বেশ। গান পাগল এই মানুষটি আমার মতো কথা একটু বেশী বললেও গানের ভূবন ছেরে মূল দর্শনের বাইরে যেতেন না,এটাই তার কাছে আমার বড় পাওনা। ইহজাগতিক চাহিদাও খুব কম ছিলো। তার কন্ঠে কালু শাহ ফকির এর অমর গান নিরিখ বান্ধরে দুই নয়নে ভুইলোনা মন তারে.. এই গানটি এখনো আমার কানে বাজে। তার হাতে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য গুণগ্রাহী শিল্পী। ওস্তাদ মফিজ শাহ বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাতিঘর। সাংস্কৃতিক জাগরণের একজন লড়াকু সৈনিক। ওস্তাদ মফিজুল ইসলাম মহর শাহতার পরিবার ও সমাজে অসংখ্য ছাত্র ও ভক্তগনের হৃদয়ে যুগ যুগান্তর বেঁচে থাকবেন এই প্রত্যাশা করি। [ মো. নজরুল ইসলাম,লেখক ও গবেষক]

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button