sliderস্থানিয়

উৎসবমুখর পরিবেশে কাজিপুরে তিনশ বছরের সোনামুখী মেলা শুরু

মোঃ আব্দুর রব মনসুর, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: যমুনার পলিধোয়া বাতাসে আজ লেগেছে শেকড়ের সুবাস। তিন শতাব্দীর পুরোনো ইতিহাস আর গ্রামবাংলার চিরায়ত রূপ নিয়ে সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে শুরু হচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের উৎসব—ঐতিহাসিক ‘সোনামুখী মেলা’। যুগ যুগ ধরে কেনাবেচার গণ্ডি ছাড়িয়ে যা আজ কাজিপুর ও এর আশপাশের মানুষের হাসি-কান্না, আবেগ আর অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জীবন্ত মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে।

ঐতিহাসিক ও প্রবীণদের বয়ান অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ বছর আগে জমিদার আমল কিংবা তারও আগের কোনো এক সোনালী সময়ে এই মেলার গোড়াপত্তন ঘটে। সেই সোনাঝরা ঐতিহ্যের আবহ থেকেই এর নামকরণ হয় ‘সোনামুখী মেলা’। এই মেলার ইতিহাস কেবল কেনাবেচার নয়, বরং এক দীর্ঘ আন্তঃদেশীয় সম্পর্কের। বয়োজ্যেষ্ঠদের স্মৃতিচারণায় উঠে আসে এক সোনালী অতীত। যখন দেশভাগের কাঁটাতার ছিল না, তখন সুদূর ভারতের কলকাতা থেকেও বড় বড় ব্যবসায়ীরা পসরা সাজিয়ে চলে আসতেন ইছামতির এই তীরে। জলপথে নৌকার বহর নিয়ে বণিকদের আগমন মেলাকে রূপ দিত এক আন্তর্জাতিক মিলনমেলায়। কলকাতার সেই মসলিন, মসলা আর বাহারি তৈজসপত্রের স্মৃতি আজ ইতিহাস হলেও, মেলার সেই আভিজাত্যের সুর আজও যেন বাতাসে ভেসে বেড়ায়। কালের পরিক্রমায় আধুনিকতার বহু পরিবর্তন এলেও মেলার এই চিরচেনা রূপটি আজও মলিন হয়নি।

কাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী খোলা মাঠে আয়োজিত এই মেলাকে ঘিরে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি ঘরে ঘরে। মেলার প্রধান আকর্ষণ হিসেবে সেজে উঠেছে বাহারি পণ্যের পসরা। বাঁশ, বেত ও কাঠের তৈরি নিখুঁত গৃহস্থালি সামগ্রী, মৃৎশিল্পের চমৎকার তৈজসপত্র আর শিশুদের রঙিন খেলনা জানান দিচ্ছে আমাদের কুটির শিল্পের গৌরব। পাশাপাশি রসনাবিলাসীদের জন্য থাকছে তিলের খাজা,গরম জিলিপি, কদমা এবং ঐতিহ্যবাহী নানা পিঠা-পুলির মনভোলানো আয়োজন। কৃষকদের প্রয়োজনীয় কৃষি সরঞ্জাম থেকে শুরু করে রকমারি আসবাবপত্রের বেচাকেনায় মেলা প্রাঙ্গণ এখন মুখর।

সন্ধ্যা নামলেই মেলায় যুক্ত হয় ভিন্ন মাত্রা। নাগরদোলার ঘূর্ণন,সার্কাস,পুতুল নাচ আর মঞ্চে গ্রামবাংলার লোকসংগীতের আসর মন জয় করে নেয় শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ সবার। এই মেলাকে কেন্দ্র করে কাজিপুরের পরিবারগুলোতে বইছে বাড়তি আনন্দ। দূর-দূরান্ত থেকে মেয়ে-জামাইদের দাওয়াত করে ‘নাইওর’ এনে পরিবারের সবাই মিলে মেলায় ঘোরার এই দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতি আজও অটুট রয়েছে এখানে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই মেলা হয়ে ওঠে এক অনন্য সম্প্রীতির প্রতীক। একই সঙ্গে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কুটিরশিল্পীদের বেচাকেনার মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে আসে নতুন গতি।

আধুনিক ইট-পাথরের যান্ত্রিকতা যখন আমাদের শেকড়কে ভুলিয়ে দিতে বসেছে, তখন কাজিপুরের এই সোনামুখী মেলা আবহমান বাংলার সংস্কৃতিকে ধারণ করে আজও বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রজন্মান্তরে এই মেলা আমাদের লোকায়ত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আলোকবর্তিকা হয়ে বেঁচে থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় সংস্কৃতিমনা মানুষের।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button