প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেছেন, আপনাদের কাছে আমার একটা আবেদন। আমি প্রকৃতপক্ষে কোনো ইয়ো করি না। আপনারা আমাকে অনেক ইয়ো করছেন। আমাকে মিস কোড করবেন না। আমাকে নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। আমি কোর্টে যা বলি, তার কিছু ডিস্ট্রোটেড হয়। এতে গিয়ে আমাকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। এটা যাতে আমাকে না পড়তে হয়।
প্রধান বিচারপতি সাংবাদিকদের আরো বলেন, প্রেস কনফারেন্স করে কোনো কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব না। বিচারক হিসেবে কোনো মামলার শুনানির সময় আইনজীবীকে একটা প্রশ্ন করতে পারি। এটা আমার স্বাধীনতা। প্রশ্নটা কি কারণে কোন উদ্দেশ্যে, তা না বুঝে, কোট করলে, অনেক সময় ভুলভ্রান্তি হতে পারে। এটা একটু খেয়াল করবেন।
আজ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে আইন বিষয়ক একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
আইনজীবী শান্তি পদ ঘোষ প্রণীত ‘Judicial Interpretation’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে একথা বলেন প্রধান বিচারপতি।
অনুষ্ঠানে ড. কামাল হোসেন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান বিচারপতি বলেন, আমেরিকার প্রধান বিচরপতি আর্ন ওয়ারেন্ট জেলা আদালতে ওকালিতি আরম্ভ করেছিলেন। এরপর তিনি সরকারি উকিল হয়েছিলেন। তার মেধার কারণে তিনি তিন তিনবার গভর্নর হয়েছিলেন। উনি ছিলেন রিপাবলিকন দলের। কিন্তু ১৯৭০ সালে যখন গভর্নর হন তখন তার নিরপেক্ষতার জন্য দলমত নির্বিশেষে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের আগে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি আর রাজনীতি করবেন না।
আমরো বিচারকরা হয়তো ছাত্রজীবনে বা প্রফেশন জীবনে প্রত্যেকের চিন্তা-চেতনা থাকতে পারে রাজনীতি নিয়ে। আমরা বিচারকরা যখন বিচারক হিসেবে শপথ গ্রহণ করি এবং দেশে যারা বিচারক আছেন আপিল বিভাগে, হাইকোর্ট বিভা কিংবা নিম্ন আদালতে, তাদেরকে বলবো- আপনারা আপনাদের পাস্ট (অতীত) ভুলে যান। এই বিচার বিভাগের আপনি যখন বিচারক আপনাকে প্রেজেন্ট এবং ফিউচার নিয়ে ভাবতে হবে।
তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশে মাত্র পনের ষোলোশ’ বিচারক। আমরা দেখি নিরপেক্ষভাবে বিচার করার জন্য। বিচার করতে গেলে কে কি রাজনীতি করতো সেটা, যদি রাজনীতি করতে হয় আপনারা ছেড়ে চলে আসেন। বিচারক যদি হোন নিরপেক্ষভাবে করবেন। এটা আপনাদের প্রতি মানুষের অধিকার। শুধু বিচারকদের বলবো না, আইনজীবীদের বলবো। এই সমাজে আপনাদেরও অনেক কিছু করার আছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আপনারা এক হোন। আমি আগেও বলেছি আজকেও বলছি, আপনাদের প্রফেশনাল জীবন একটু কম দেখা যাচ্ছে।
প্রধান বিচারপতি বলেন, শোকের মাস, জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারকে এই মাসে ১৫ আগস্ট কয়েকজন বিপথগামী লোক নৃসংশভাবে হত্যা করেছিল। আমি এই মামলার শেষ রায় এবং রিভিউ আমার হাতে নিষ্পত্তি করেছি।
আমি যখন মামলার ইয়ে করি তখন এত কষ্ট লাগলো। এই মামলাতে অনেক কিছু ছিল। একটা বাচ্চা ছেলে রাসেল তাকে কেন হত্যা করা হয়েছিল? এটা পশুর চেয়েও ইয়ে। কিন্তু এর নথি যখন পর্যালোচনা করলাম, যেহেতু এটা ফাইনাল কোর্ট, আমরা দেখলাম অনেক ত্রুটি ছিল এই মামলায়। যেরকম ইনভেস্টিগেশনের ত্রুটি ছিল, সেরকম প্রসিকিউশনের ত্রুটি ছিল। আমি হয়তো ভবিষ্যতে কিছু লেখার চিন্তা-ভাবনা করছি। আমি তুলে ধরবো শুধু এই মামলা না, জেল হত্যা মামলাও। সেখানেও কিন্তু অনেক ত্রুটি ছিল এবং অনেক গাফিলতি ছিল। আপনারা দুটি রায় পর্যালোচনা করে দেখবেন। আমরা ট্রায়াল কোর্টের জাজমেন্ট এবং আপিল হাইকোর্টের জাজমেন্ট কিন্তু আমরা মানিনি। আমরা দুই রায়ই না মেনে পরিস্কার বলেছি এটা ক্রিমিনাল কনসপেরেসি ছিল। ক্রিমিনাল কনসপেরিসি যদি হয় এটা একেবারে ক্যান্টনম্যান থেকে কনসপেরেসি হয়েছে। এই কনসপেরিসে কে কে জড়িত ছিল? কনসপেরেসিতে যদি একজন লোকও থাকে এবং তার সাথে যদি আর যারা আছে প্রত্যেকেই সমভাবে দায়ী। আমরা মাত্র ১৫-১৬-২০ জনের বিচার করেছি। যারা সেই রাত্রে মার্চ করেছিল, মার্চ করার পরে জালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিল, মার্চ করে ৩২ নম্বরে আনা হয়েছে, তখনতো কনসপেরেসি ক্লিয়ারলি ডিসক্লোজড হয়ে গিয়েছিল। এখন যারা বড় বড় কথা বলেন, আমি একজন প্রধান বিচারপতি হিসেবে মুখ খুলতে পারছি না। কিন্তু আমি হয়তো কিছু লিখে যাব। আমি দেখিয়ে দেব যারা ষড়যন্ত্রের মধ্যে কারা কারা ছিল। কিরকম গাফিলতি হওয়ার পরেও যারা সেনাবাহিনীর মধ্যেও অনেকজন যারা কোষাগার থেকে সুবিধা নিয়ে চলে গেছেন। তারা তো পাওয়ার কথা ছিল না।




