রাজনীতিশিরোনাম

অন্ধ-নি:সঙ্গ কেরামতও গাড়ি পোড়ানো মামলার আসামি

কেরামত আলী, বয়স ৭০ বছর। জীবনের এই শেষ বয়সে স্বাভাবিকভাবেই অন্যের উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। তবে এই নির্ভরশীলতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে তার অন্ধত্ব। তিনি চোখে দেখতে পান না। লাঠিতে ভর করে তাকে হাঁটতে হয়। এই লাঠিই তার নির্ভরতা। কারণ কেরামত আলীর কেউ নেই, নি:সঙ্গ এক মানুষ। তবে এই নি:সঙ্গ-অন্ধ কেরামত আলীও গাড়ি পোড়ানোর ‘গায়েবি’ মামলার আসামি!
জানা গেছে, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার ১০ নম্বর খেরুয়াজানি ইউনিয়নের বন্ধ গোয়ালিয়া গ্রামের বাসিন্দা কেরামতের বিরুদ্ধে গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে মামলা হয়েছে। আগাম জামিন নিতে সোমবার তিনিসহ হাইকোর্টে এসেছিলেন এ মামলায় নাম থাকা স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকরা।
কেরামত জানান, তিনি বিএনপির সমর্থক হলেও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। ঘর থেকে বের হওয়ার মতো সামর্থ্যও তার নেই। মামলায় তার নাম আসায় বিস্মিত অন্যরাও।
জানা গেছে, একাদশ সংসদ নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর মুক্তাগাছা থানায় বিএনপির ৪০ নেতাকর্মীর নামে একটি মামলা (নম্বর- ২৪) হয়। এ মামলায় কেরামতকে ৩৮ নম্বর আসামি করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, গত ২২ ডিসেম্বর রাতে মুক্তাগাছা পৌরসভার আলাউদ্দিন কেন্দ্রীয় পৌর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের সড়কে নৌকা সমর্থক একজনের মোটসাইকেলে আগুন দিয়েছেন কেরামত ও অন্য আসামিরা। এছাড়া তারা মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এলাকায় আতঙ্ক ও ত্রাস সৃষ্টি করেছেন। তারা বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫ (৩) ধারাসহ দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮ ও ৪২৭ ধারায় অপরাধ করেছেন।
কেরামত আলী জানান, দুই ছেলে ও স্ত্রী নিয়ে সুখের সংসার ছিল তার। দুই দশকের বেশি সময় আগে ১৮ বছরের শরীফুল ইসলাম কিডনিজনিত জটিলতায় মারা যায়। কয়েক বছর পর শারীরিক প্রতিবন্ধী ছোট ছেলে ফরিদুলও মারা যায়। চার বছর আগে তাকে ছেড়ে পরপারে চলে গেছেন স্ত্রী আসিয়া খাতুনও।
সেই থেকেই তিনি একেবারেই নিঃসঙ্গ। পুত্র-স্ত্রী শোকে কাতর কেরামতকে এখন দেখার কেউ নেই। দরিদ্র দুই ভাই গিয়াসউদ্দিন ও আবদুল মজিদ অন্যের জমিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। দুই ভাইকে নিজের শেষ সম্বল গ্রামের বাড়ির পাঁচ শতক জমি দান করে দিয়েছেন কেরামত। বিনিময়ে তাকে তিনবেলা খাবার ও পরনের কাপড় দেয়া হয়।
চোখে ছানি পড়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই একপ্রকার অন্ধের জীবনযাপন করছেন কেরামত। সম্প্রতি অস্ত্রোপচার হলেও সেই চোখের আলো পুরোপুরি ফেরেনি। দুই হাত দূরের জিনিসও দেখতে পান না। এখন লাঠি ও অন্যের সাহায্যই ভরসা কেরামতের। তিনি জানান, মামলার কারণে গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয়ে নির্বাচনের আগে একমাস তাকে আত্মীয়ের বাড়িসহ এখানে-সেখানে পালিয়ে থাকতে হয়েছে।
কেরামত আলী বলেন, ‘বাবারে দুনিয়াতে আমার কেউ নাই। আমারে দেখার কেউ নাই। আমি রাজনীতি বুঝি না, রাজনীতি করিও না। কিন্তু আমারে ক্যান এই মামলায় জড়াইলো জানি না। আমি ন্যায়বিচার চাই।’
তার সঙ্গে আসা দূর সম্পর্কের ভাতিজা সাইফুল আজিজ (তিনিও একই মামলার আসামি) বলেন, ‘নির্বাচনের আগে করা গায়েবি মামলায় এই বৃদ্ধ লোকটাকেও আসামি করা হয়েছে। এই বয়সে অসমর্থ শরীর নিয়ে তিনি নাকি মোটরসাইকেলে আগুন দিয়েছেন, মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘উনার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। এই বয়সে একজন বৃদ্ধ লোককে এভাবে হয়রানি করতে দেখে আমাদের নিজেদের খারাপ লাগছে। আজ (গতকাল) আগাম জামিন পেলেও এই মামলার হয়রানি থেকে সহসাই তিনি রেহাই পাবেন এমন মনে হচ্ছে না। কেননা জামিনের মেয়াদ শেষে আবারও তাকে আদালতে আসতে হবে।’
এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মুক্তাগাছা থানার এসআই (উপ-পরিদর্শক) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ‘কেরামত আলী অসুস্থ চোখে দেখেন না এ বিষয়ে আমি অবগত ছিলাম না। তদন্তে যাচাই-বাছাই হচ্ছে। তদন্ত শেষে ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে পরামর্শ করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button