sliderস্থানীয়

বিনামূল্যে ২২ কোটি টাকার চিকিৎসা পেল দরিদ্র শিশু

বিরল স্নায়ুরোগ ‘স্পাইনাল মাস্কুলার এট্রফি’র চিকিৎসায় যে ইনজেকশন দরকার হয়, সেটির দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ তো বটেই, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের সাধারণ মানুষের আয়ত্বের বাইরে এই চিকিৎসা। কিন্তু বাংলাদেশের এক দরিদ্র পরিবারের একটি শিশুর চিকিৎসায় একদম বিনামূল্যে এই ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়েছে। ঢাকার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে এখন শিশুটি ডাক্তারদের পর্যবেক্ষণে আছে।
ঢাকার কাছেই মানিকগঞ্জ সদরের নবগ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম এবং রিনা আক্তার দম্পতির শিশু সন্তান রায়হান। রফিকুল ইসলাম সৌদি আরবে থাকেন। এই দম্পতির বিয়ের ১৩ বছর পর জন্ম হয় শিশু রায়হানের। জন্ম থেকেই স্নায়ু রোগ স্পাইনাল মাস্কুলার এট্রফিতে ভুগছিল শিশুটি। এই রোগে আক্রান্ত শিশুর মাংসপেশি ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে এবং বসতে বা উঠে দাঁড়াতে পারে না।
সন্তানের বিরল এই রোগের চিকিৎসার আশা যখন প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন রফিকুল-রিনা দম্পতি, তখন সৌভাগ্যক্রমে একেবারে বিনা মূল্যে অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য এবং ব্যয়সাপেক্ষ এই জিন চিকিৎসার সুযোগ পেয়ে যান তারা। ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালকে বিনামূল্যে ‘স্পাইনাল মাস্কুলার এট্রফি’ রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি ইনজেকশন ‘জলজেনসমা’ একদম বিনামূল্যে সরবরাহ করেছিল বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি নোভার্টিস। এই ইনজেকশনটিই প্রয়োগ করা হয়েছে রায়হানের শরীরে।
মঙ্গলবার সকাল ১০টায় শিশু রায়হানকে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে স্যালাইনের মাধ্যমে ইনজেকশনটি শরীরে দেয়া হয়।
মা রিনা আক্তার বলেন, যখন তার সন্তানের চিকিৎসার জন্য এত টাকার প্রয়োজন হবে বলে তিনি জানতে পারেন তখন একরকম আশায় ছেড়ে দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এক লাখ টাকা জোগাড় করার ক্ষমতা নেই। আর বিয়ের এত বছর পর আমার সন্তান হয়েছে, সেই সন্তানকে চোখের সামনে মৃত্যুর দিকে যেতে দেখে সহ্য করতে পারছিলাম না।’
নোভার্টিসের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা: রিয়াদ মামুন বলেন, এই ইনজেকশনটি আমেরিকায় বাজারজাত করা হয়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোই এই ওষুধ কিনে থাকে।
তিনি বলেন, ‘দরিদ্র দেশগুলোতে এই ওষুধ বিনামূল্যে সীমিত সংখ্যায় পাঠানোর জন্য লটারি পদ্ধতি বেছে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই লটারিতেই বাংলাদেশের অত্যাধুনিক বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের শিশু নিউরোলজি বিভাগ অংশগ্রহণ করেছিল।’
তিনি বলেন, ‘আক্রান্ত কয়েকজন শিশুর শরীরের রক্ত ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ প্রতিবেদন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছিল। লটারিতে সৌভাগ্যবান রায়হানকে নির্বাচিত করা হয়।’
চিকিৎসকরা জানান, স্পাইনাল মাসকুলার এট্রফি একটি বিরল ও জটিল স্নায়ু রোগ যা জন্মগত।
বাংলাদেশের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা: কাজী দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, ‘জিনগত ত্রুটির কারণে এটা হয়ে থাকে। এ রোগে আক্রান্ত শিশুদের মাংসপেশি ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকে। যার ফলে এসব শিশুরা বসতে বা দাঁড়াতে পারে না। তবে তাদের বুদ্ধিমত্তা ঠিক থাকে। পরে শ্বাসতন্ত্রের জটিলতার কারণে আক্রান্ত শিশুরা মৃত্যুবরণ করে।’
চিকিৎসকরা বলেন, প্রতি ১০ থেকে ১২ হাজার শিশুর মধ্যে একজন শিশু এই বিরল রোগে আক্রান্ত হয়। দু‘বছরের মধ্যে আক্রান্ত শিশুরা মারা যায়। শুধুমাত্র ওই ইনজেকশনটি দিলেই বেশিরভাগ শিশু বেঁচে যায়।
জলজেনসমা ইনজেকশনটি মূলত এক ধরণের জিন-থেরাপি। স্পাইনাল মাস্কুলার এট্রফি হয় মূলত জিনগত ত্রুটির কারণে। আক্রান্ত শিশুর শরীরে যখন জলজেনসমা ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয় তখন ত্রুটিপূর্ণ জিনগুলো প্রতিস্থাপিত হয় ঠিকমত কাজ করছে এমন জিন দিয়ে।
একজনের শরীরে এটি একবারই প্রয়োগ করতে হয় এবং একটি ডোজের দাম পড়ে ২২ লাখ মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ২২ কোটি টাকা। কেন এটির দাম এত বেশি তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নোভার্টিস বলে থাকে, এ ধরণের চিকিৎসার উদ্ভাবন অনেক ব্যয়সাপেক্ষ।
নোভার্টিসের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা: রিয়াদ মামুন বলেন, গবেষণা প্রক্রিয়ায় যে খরচটা হয় সেটার সাথে সঙ্গতি রেখেই বাজারে বিক্রির সময় দাম নির্ধারণ করা হয়। মূলত এই ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়ায় খরচ বেশি হয়।
তবে ইনজেকশনটির এত আকাশছোঁয়া দাম আদৌ যুক্তিসঙ্গত কিনা, তা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। যেমন, যে গবেষণার মাধ্যমে জলজেনসমা ইনজেকশনটি উদ্ভাবন করা হয়, প্রাথমিকভাবে তার তহবিল যোগাতে সাহায্য করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের বহু দাতব্য প্রতিষ্ঠান। আর দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো এই অর্থ সংগ্রহ করেছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। কাজেই অনেকের প্রশ্ন, কেন ইনজেকশনটি থেকে নোভার্টিসকে এত বেশি মুনাফা করতে হবে।
সূত্র : বিবিসি

মুহাম্মদ আব্দুল জলীল বিশ্বাস, মানিকগঞ্জ : শিশু রায়হান। বয়স ২২ মাস। বাবা রফিকুল ইসলাম। মা রিনা আক্তার। দাদা মৃত লাল মিয়া। দাদা ৫/৬ বৎসর আগেই হার্ট ষ্টোকে মারা গেছে। দাদী রুকিয়া বর্তমানে নিউরো সায়েন্স ইনিস্টিউটে শিশু রায়হানের দেখা শোনা করে যাচ্ছেন। দিঘুলীয়া গ্রামের প্রিয় মুখ দাদামহ বদর উদ্দিন অনেক আগেই পরপারে চলে গেছেন। সংসারের হাল ধরার মত কেউ ছিল না।
শিশু রায়হানের বাবা খুব আদরের নাতি ছিল। ভাগ্য পরিক্রমায় বাবা লাল মিয়া খেত-খামারের সব জমা-জমি বিক্রি করেছিল। এখন তার জন্মদাতা পিতা প্রবাসে চাকুরী করছে বলে জানা যায়। সে প্রবাসে অল্প টাকা রোজগার করে এই বিরল রোগের চিকিৎসা করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ভাগ্য পরিক্রমায় অবশেষেে চিকিৎসকরা চিহ্নিত করলো সে স্পাইনাল ভাস্কুলার এট্যোফি(এস এম এ) এক বিরল রোগে আক্রান্ত যে রোগে আক্রান্ত শিশু জন্মের দুই বছরের মধ্যে মারা যায়। এই বিরল রোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল। একটি ইঞ্জেকশনের দাম বাংলাদেশী টাকায় ২২ কোটি টাকা। আর এই মূল্যের একটি ইঞ্জেকশনই বিনা মূল্যে শিশু রায়হান কে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট। সেই ইঞ্জেকশনটি গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে পুশ করেছেন বলা জানিয়েছেন তার মা রীনা আক্তার।
রায়হানের মা-দাদী মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার পৌর সভার পশ্চিম দাশড়া বাসা ভাড়ায় থাকে। শিশু রায়হানের প্রাথমিক চিকিৎসক আব্দুল জলীল সবার নিকট ওর জন্য দোয়া চেয়েছেন এবং বর্তমান চিকিৎসার সাথে জড়িত সবাইকে ধন্যবাদ দিয়েছেন।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button