
সৈয়দা রাহনুমা শরমিন দিশা
সম্প্রতি দেশের প্রথম সারির একটি দৈনিক পত্রিকায় ‘করোনার চিকিৎসা থেকে বেরিয়ে আসছে নতুন তথ্য’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এখানে বলা হয়েছে, কভিড-১৯ এর মৃত রোগীদের পোস্টমর্টেম বা শবব্যবচ্ছেদ থেকে জানা গেল অনেক তথ্য, ভুল প্রমাণিত হলো আমাদের অনেক ধারণা।
আমাদের ধারণা ছিল Cytokine storm বা ফুসফুস থেকে তৈরি পদার্থ ফুসফুসকে ধ্বংস করছে। এখন আমেরিকা ও ইউরোপের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, ব্লাড ক্লটের (embolism) কারণে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই তথ্যের ফলে করোনা-১৯–এর চিকিৎসার পদ্ধতি ও কৌশল বদলে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
একই রকম আর্টিকেল দেখা গেছে, যা ৫ এপ্রিল প্রকাশিত হয় Medium নামক একটি অনলাইন পাবলিশিং প্ল্যাটফর্মে। আর্টিকেলটির লেখক- Andrew Gaiziunas, যার কোনো মেডিকেল বা এই ধরনের গবেষণা নেই। দ্রুতই এখান থেকে লেখাটি সরিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু ইতিমধ্যেই লেখাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভয়েস অব আমেরিকা Helth Feedback এর বরাত দিয়ে জানাচ্ছে যে, এই নিবন্ধটির কোনোরকম বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই এবং এ রকম মনগড়া প্রতিবেদন এই বৈশ্বিক মহামারির অসময়ে খুবই ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।
এই নিবন্ধ অনুযায়ী কভিড-১৯ কোনো শ্বাসযন্ত্রের রোগ নয়, বরং এটি রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতার কারণে তৈরি হওয়া জটিলতা, যাকে হাইপোক্সিয়া বলা হয়। হিমোগ্লোবিন চারটি গ্লোবিউলার প্রোটিনের সমন্বয়ে গঠিত, এদের গ্লোবিন বলে। প্রতিটি গ্লোবিনের দুটি অংশ- আয়রন আয়ন এবং পোরপাইরিন নামক একটি যৌগ। আয়রন আয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অক্সিজেন পরিবাহিত হয়।
এই লেখকের মতে সার্স-নভেল-করোনা-২ এর প্রোটিন লোহিত রক্তকণিকার হিমোগ্লোবিন থেকে আয়রন প্রতিস্থাপন করে নিজে তার সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে লোহিত রক্তকণিকা অক্সিজেন বা কার্বন ডাই অক্সাইড বহন করতে পারে না। এর ফলেই রোগীর মৃত্যু হয়।
নিবন্ধটি সম্পূর্ণই কল্পিত, এর কোনো পরীক্ষামূলক ভিত্তি নেই যা ক্লিনিক্যাল রিপোর্টের সঙ্গে কোনোভাবেই খাপ খায় না। প্রত্যাখ্যানের জন্য এর বাইরে তেমন কিছু বলার প্রয়োজন ছিল না। তবু গবেষক বিজ্ঞানীরা আরও কিছু যুক্তি তুলে ধরছেন।
পরবর্তীতে Medium এই Matthew Amdahl (clinician scientist and haemoglobin researcher, University of Pittsburgh) এটা কোনোভাবেই সম্ভব না যে, সার্স-নভেল করোনা-২ হিমোগ্লোবিন থেকে আয়রন প্রতিস্থাপন করবে, কারণ পুরো হিমোগ্লোবিনের চেয়েই ভাইরাসটি বড়।
তবু ধরা যাক, ভাইরাসটি আয়রনকে বের করে দিয়ে হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত হতে পারল, সে ক্ষেত্রেও সেটি হতো হিমোগ্লোবিনেরই একটি পরিবর্তিত রূপ, যা ভিন্ন পরিমাণে অক্সিজেন পরিবহন করতে পারত, অক্সিহিমোগ্লোবিন ডিসোসিয়েশন কনস্ট্যান্ট এর সাহায্যে এটি পরিমাপ করা যেতো। কভিড রোগীদের এই মানের কোনো পরিবর্তন পাওয়া যায়নি, এমনকি পরিবর্তিত হিমোগ্লোবিনের কোনো নমুনাও পাওয়া যায়নি।
তাছাড়া, হিমোগ্লোবিন থেকে যদি আয়রন প্রতিস্থাপিত হতো, রক্তের প্লাজমারসে আয়রনের উপস্থিতি পাওয়া যেত। কভিড রোগীদের ক্ষেত্রে এ রকম কোনো রিপোর্টই পাওয়া যায়নি। এ রকম হাইপোথিসিস শুধু মনগড়াই নয়, এই বিধ্বস্ত বিশ্ব পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে মারাত্মক বিভ্রান্তি তৈরি করবে।
মজার ব্যাপার হলো, এই নিবন্ধে ওষুধ হিসেবে আরো একবার উঠে এসেছে ক্লোরোকুইন/হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন এর নাম যেটি এর মধ্যে যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
ভয়েস অব আমেরিকার এই সংবাদটিও কয়েকদিন আগের, ১৬ এপ্রিল প্রকাশিত। এরপর বাংলাদেশের প্রথম সারির দৈনিক পত্রিকা এমন একটি প্রতিবেদন ছাপিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করাটা খুবই হতাশাজনক।
কভিড মূলত একটি শ্বাসতন্ত্রের রোগ। নভেল করোনাভাইরাস নাক, মুখ, চোখ দিয়ে প্রবেশ করে প্রথমেই ফুসফুসে বাহিত হয়, এবং ফুসফুসের কোষগুলোকে আক্রমণ করে।
বার্লিন ইনস্টিটিউট অব হেলথ এবং জার্মান সেন্টার ফর লাং রিসার্চ এর যৌথ গবেষণা দল নন-ভাইরাস রোগীদের কোষের নমুনা পরীক্ষা করে বোঝার চেষ্টা করেছেন কেন ফুসফুস এবং ব্রংকাই নভেল করোনা ভাইরাসের মূল শিকার। তারা দেখলেন যে, মানবদেহে করোনাভাইরাসের যে রিসেপটর কোষ এরা মূলত শ্বসনতন্ত্রেই থাকে। এদের রয়েছে চুলের মতো অভিক্ষেপ রয়েছে যা মিউকাস এবং ব্যাকটেরিয়া দূর করে, এগুলোকে Cilia বলে। এসব কোষের angiotensin-converting enzyme2 (ACE2) এনজাইমটিই মূলত করোনা ভাইরাসকে কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। আরও এক বা একাধিক কো ফ্যাক্টর আছে যেগুলো সহায়ক ভূমিকা নেয়।
তারা একটি মজার বিষয় লক্ষ করলেন, ACE2 রিসেপটরের ঘনত্ব বয়সের সঙ্গে বাড়ে এবং নারীর তুলনার পুরুষের বেশি থাকে। যদিও ছোট পরিসরের গবেষণা বলে এই বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দেয়া হয়নি, কিন্তু বিষয়টি কভিড সংক্রমণের পরিসংখ্যানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
আসা যাক আমাদের প্রতিরোধ যুদ্ধে। ভাইরাস সংক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে মানবদেহ যে সহজাত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে তারই প্রথম সৈনিক হলো Cytokines। এরা মূলত পদাতিক সৈন্যের মতো। এরা কোষে কোষে সংকেত পাঠাতে থাকে মার্শাল রেসপন্সের জন্য। যত দ্রুত ইমিউন সিস্টেম সাড়া দেয়, যত দ্রুত সেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, তত দ্রুত পদাতিকদের কাজ শেষ হয়। এবং ইমিউন সিস্টেম ভাইরাসকে পরাজিত করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাই ঘটে।কিন্তু মূল যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত সাইটোকাইনসকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়।
কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে মার্শাল রেসপন্স আসতে অনেক দেরি হয়ে যায়। ততক্ষণে সাইটোকাইনসের ঝড় শুরু হয়ে যায় শরীর জুড়ে। এই পদাতিক সৈনিকেরা একসময় দিশেহারা হয়ে শত্রুমিত্র ভুলে যায়। আক্রমণ করে বসে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকোষে। তখন ভাইরাসের পরিবর্তে নিজ দেহের সৈনিক সাইটোকাইনসই হয়ে ওঠে ঘাতক।
মূলত ফুসফুসসহ শ্বাসযন্ত্রের রোগ হলেও কভিডে হৃদ্যন্ত্র, কিডনি লিভারও নানান মাত্রায় আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি সাইটোকাইনস ঝড় মস্তিষ্কেও হানা দিচ্ছে, যার ফলে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে স্বাদ, গন্ধের অনুভূতি সাময়িকভাবে নষ্ট হতে দেখা যায়।
কভিড রোগে মানবদেহ নিজে নিজেই সেরে ওঠে, চিকিৎসা কেবল রোগীর উপসর্গগুলো নিয়ন্ত্রণ করে তাকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করা- যেমনটা করা হয় ডায়রিয়া হলে স্যালাইন খাইয়ে বা ইনজেক্ট করে।
পৃথিবীর মানুষ এখন গবেষক বিজ্ঞানীদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে দিকনির্দেশনার জন্য। তারা করে যাচ্ছেন নিরলস গবেষণা। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীগণ ক্লান্ত হয়েও দিয়ে যাচ্ছেন অক্লান্ত সেবা। তাদের অভিজ্ঞতাও যুক্ত হচ্ছে গবেষণায়। এই অবস্থায় ভুল সংবাদ প্রচার গণমানুষকে মারাত্মক বিভ্রান্ত করবে। তাই সংবাদ প্রচারে অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে সাবধান হতে হবে আমাদের।
লেখক: প্রভাষক, রসায়ন বিভাগ, শহীদ বেগম শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব সরকারি কলেজ, ঢাকা।
সুত্র : দেশ রূপান্তর।




