আন্তর্জাতিক সংবাদশিরোনাম

চীনে মুসলিমদের নিপীড়ন-নির্যাতনের নতুন দলিল ফাঁস

চীনের উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের নাগরিকদের বন্দি করে রাখার একটি গোপন নথি ফাঁস হয়েছে। সেসব দলিলে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং অঞ্চলে তিন হাজারের বেশি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় খুঁটিনাটিসহ ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির দ্বারা বিদ্রোহীদের দমন প্রক্রিয়ার এমন গোপন নথিটির খবর প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন।
গণমাধ্যমটিতে বলা হয়, চীনের সংখ্যালঘু উইঘুরে মুসলিম সম্প্রদায়ের কেবল একটি পরিবার নয়, শতশত পরিবার কিংবা দেশটির লক্ষ লক্ষ নাগরিককে তুচ্ছ কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য গোপনে আটকে রাখা হতো। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির এমন নিয়ম প্রথমবারের মত প্রকাশ করেছে দেশটির কিছু উইঘুরের সোচ্চাররা। এটা ছিল তৃতীয়বারের মত চীনা সরকারের স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁসের খবর।
দেশপ্রেমহীনতা হিসেবে চিহ্নিত করে মুসলিম উইঘুরে সম্প্রদায়কে তাদের ধর্মীয় ও সংস্কৃতিক মৌলবোধ থেকে বিচ্যুত করতে চীনা সরকারের একটি ভয়ংকর কৌশল উঠে এসেছে এ নথিতে।
তবে চীন সরকার দাবি, চলমান চরমপন্থিদের গণবিচ্যুতকরণের জন্য এটি একটি প্রক্রিয়া। যেটি কিনা একটি বিশেষজ্ঞ টিমদ্বারা পরিচালিত হয়। এ নথিতে দেখানো লোকগুলোকে কেবল ওড়না পড়া ও দীর্ঘ দড়ি বাড়ানোর জন্য আটক করা হয়।
১৩৭ পৃষ্ঠার সে দলিলে প্রতিটি পৃষ্ঠায় ভিন্ন ভিন্ন কলাম এবং ছক কেটে ঐ মানুষেরা কতবার নামাজ পড়েন, কী পোশাক পরেন, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের আচার-আচরণের বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এ খবর প্রকাশ করেছে বিবিসি।
ওই খবরে আরও বলা হয়, চীনের সরকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে এগুলো দেশটির সন্ত্রাসবাদ এবং ধর্মীয় উগ্রপন্থা মোকাবেলায় নেয়া পদক্ষেপের অংশ।
এসব দলিল অত্যাধিক ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রহ করা হয়েছে। বলা হয়, গত বছর শিনজিয়াং অঞ্চলের যে সূত্রের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি নথি পাওয়া গিয়েছিলো, এবারও সেই সূত্রের মাধ্যমেই নতুন দলিলপত্র পাওয়া গেছে।
শিনজিয়াংয়ে চীনা নীতির একজন বিশেষজ্ঞ ড. অ্যাড্রিয়ান জেনজ, যিনি ওয়াশিংটনে ভিক্টিমস অব কম্যুনিজম মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের একজন সিনিয়র ফেলো, তিনি মনে করেন ফাঁস হওয়া এসব দলিল আসল।
নতুন দলিলে সংখ্যালঘু উইঘুর সম্প্রদায়ের ৩১১ জন মানুষের ব্যাপারে ব্যাপকভিত্তিক অনুসন্ধানের অর্থাৎ তাদের পূর্ব ইতিহাস, ধর্মীয় আচার পালনের দৈনন্দিন রুটিন, তাদের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে এসব দলিলে। রিপোর্টের শেষ কলামে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে, ঐ ব্যক্তিদের বন্দীশিবিরে আরো রাখা হবে নাকি তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, অথবা আগে ছেড়ে দেয়া হয়েছে এমন কাউকে আবার বন্দি শিবিরে ফিরিয়ে আনতে হবে কিনা।
প্রাপ্ত দলিল বিশ্লেষণ করে ড. জেনজ বলছেন, এসবের মাধ্যমে ওখানে চলা সিস্টেমের ব্যাপারে ধারণা যেমন পাওয়া যায়, তেমনি ক্যাম্পে থাকা মানুষের ‘আদর্শিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো’ অনুযায়ী তাদের বিভক্ত করে পর্যালোচনা করার ব্যাপারেও ধারণা পাওয়া যায়।
৫৯৮ নম্বর সারিতে লেখা আছে হেলচেম নামের ৩৮ বছর বয়সী একজন নারীকে রি-এডুকেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে, কারণ তিনি কয়েক বছর আগে বোরকা পরতেন।
অনেকেই পাসপোর্টের আবেদন করার কারণে সংশোধন শিবিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন, যার মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে কেউ দেশের বাইরে বেড়াতে যেতে চাইলেও সেটাকে কর্তৃপক্ষ শিনজিয়াংয়ের উগ্রপন্থার লক্ষ্মণ হিসেবে বিবেচনা করে।
নুরমেমেট নামে ২৮ বছর বয়সী একজনকে রি-এডুকেশন কার্যক্রমে পাঠানো হয়েছে, কারণ একটি ওয়েব লিংকে ক্লিক করার মাধ্যমে তিনি ‘অনিচ্ছাকৃতভাবে’ একটি বিদেশী ওয়েবসাইটে চলে গিয়েছিলেন।
২০১৭ সালে উইঘুর মুসলমানদের জন্য যখন কর্তৃপক্ষ বন্দীশিবির চালু করে করে, সেসময় কম্যুনিস্ট পার্টির কিছু বিশ্বস্ত কর্মী, যারা গ্রামভিত্তিক দলের সদস্য হিসেবে কাজ করতো তারা উইঘুর সমাজের ভেতরকার তথ্য বের করে আনার কাজটি করে।
তাদের জীবনাচরণ, ধর্ম বিশ্বাস, বাড়িতে ধর্মচর্চার পরিবেশ অর্থাৎ কী কী আচার পালিত হয়, বাড়িতে কয়টি কোরান শরীফ আছে, এসব তথ্য।
রিপোর্টেল ১৭৯, ৩১৫ এবং ৩৪৫ নম্বর সারণীতে ৬৫ বছর বয়সী ইউসুফ নামের ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার দুই মেয়ে ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে বোরকা পড়তেন, এবং ছেলের ইসলামি রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
ফাঁস হওয়া দলিলে অনেকজনের নামের শেষে ‘অবিশ্বস্ত’ বিশেষণ যুক্ত করা হয়েছে, মোট ৮৮ জন ব্যক্তিকে এজন্য বন্দীশিবিরে রাখার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চীন অস্বীকার করলেও, প্রাপ্ত দলিলে দেখা গেছে, কারাকাক্স তালিকায় বন্দীশিবিরে রাখার জন্য বিবিধ কারণ দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে ধর্মীয়, পাসপোর্ট, পরিবার, বিদেশে যোগাযোগ কিংবা অবিশ্বস্ত হবার মত কারণের উল্লেখ রয়েছে।
তবে এর মধ্যে চীনের পরিবার পরিকল্পনা নীতি অমান্য করার কারণে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষকে বন্দীশিবিরে রাখার কথা বলা হয়েছে। এই রিপোর্টে তালিকার ৩১১ জনের মধ্যে ৯০ শতাংশ মানুষকেই ইতিমধ্যে মুক্তি দেয়া হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
উইঘুর সম্প্রদায়ের লোকেদের মাধ্যমে তার পরিবারের রেকর্ড এবং তাদের মতো শত শত সরকারি রেকর্ড প্রকাশ করেছে ওই গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা।
ফাঁস হওয়া নথি থেকে জানা যায়, সরকারি স্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছে তাদের পুরো পরিবারের কাজকর্ম, ধর্মীয় রীতিনীতি, বিশ্বস্ততা ও কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতার মাত্রাও উল্লেখ রয়েছে। এই নথি থেকে নির্ধারণ করা যায়, কোনও সরকারি বন্দিসেলে রেজার তারের মধ্যে কেউ আটক আছে কিনা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button