জাতীয়শিরোনাম

সিন্ডিকেট ছাড়ছে না ডেঙ্গুও

ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট নিয়েও চলছে বাণিজ্য। এর সঙ্গে যুক্ত অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট। চাহিদার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট দ্বিগুণ মূল্যে বিক্রি করছেন। ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা মূল্যের কিট বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায়। বাজারে কিটের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে তারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে সমকালের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা মিলেমিশে এই সিন্ডিকেট বাণিজ্যের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংক্রামক ব্যাধি) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, ‘কিটের সংকট তৈরি হয়েছিল। তবে সেটি ম্যানেজ করা হয়েছে। সব সরকারি হাসপাতালে আনুপাতিক হারে কিট পাঠানো হয়েছে। নতুন করে কিট আমদানি করা হচ্ছে। দু-একদিনের মধ্যেই সেই কিট এসে পড়বে। তখন আর সংকট থাকবে না।’
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রতিদিনই রোগী বাড়ছে। রাজধানীকেন্দ্রিক ডেঙ্গুবাহিত এডিস মশা ধাপে ধাপে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী থেকে গ্রামেও ডেঙ্গু আতঙ্ক। জ্বর হলেই ডেঙ্গুর আশঙ্কা করে হাজার হাজার মানুষ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ছুটছেন। ডেঙ্গু আক্রান্ত না হয়েও ভয়ে এই পরীক্ষার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এতে করে ডেঙ্গু পরীক্ষার প্রয়োজনীয় কিটের চাহিদা অধিক হারে বেড়েছে। এই সুযোগ নিয়েছে অসাধু সিন্ডিকেট। ডেঙ্গু পরীক্ষার এই অতি প্রয়োজনীয় ডিভাইসটি নিয়ে তারা বাণিজ্যে নেমেছেন। এনএসওয়ান, আইজিএম ও আইজিজি পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গু শনাক্তকরণে ব্যবহৃত একটি কিটের দাম নেওয়া হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। আগে এটির মূল্য ছিল ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা। দেশের সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালেই এই কিটের সংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলো কোনোভাবে চালিয়ে গেলেও বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে কিটের মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কিট সংকটের কারণে আক্রান্ত রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করা সম্ভব হচ্ছে না বলে আমাদের সংবাদদাতারা জানাচ্ছেন।
কিটের মূল্য বৃদ্ধির কথা স্বীকার করেছে এই ডিভাইস উৎপাদন ও আমদানির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো। কিট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ওএমজি হেলথ কেয়ার প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী মেসবাউল কবির জানান, কিটের চাহিদা এত বেড়ে যাবে, তা আগে কেউ বুঝতে পারেনি। এ কারণে বাড়তি কিট রাখার বিষয়ে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। কারণ প্রতি বছর যে পরিমাণ কিট উৎপাদন করা হয়, সেগুলোর প্রায় অর্ধেক থেকে যায়। মেয়াদ শেষে সেগুলো ধ্বংস করে ফেলতে হয়। এতে আমাদের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়তে হয়। কিন্তু এবার চাহিদা এত বেশি যে, উৎপাদন করা সব কিট শেষ হয়ে গেছে। আপাতত উৎপাদন বন্ধ আছে। কারণ কিট উৎপাদনের প্রয়োজনীয় রাসায়নিক আমদানি করতে হবে। দু-একদিনের মধ্যেই তা এসে যাবে। চলতি মাসে আমরা ১৫ লাখ কিট উৎপাদন করতে পারব। সরকারকে আমরা ৪০ হাজার কিট সরবরাহ করেছি। এটি সরবরাহ করা না হলে আরো সমস্যার সৃষ্টি হতো বলে তিনি জানালেন।
অতিরিক্ত মূল্যে কিট বিক্রির সত্যতা স্বীকার করে তিনি আরো বলেন, ‘তার কোম্পানি থেকে কিটের মূল্য ২৮০ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটি এখন দ্বিগুণ মূল্যে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থা থেকেও এ বিষয়টি জানিয়ে আমাকে ফোন করা হয়েছে। তাদের বলেছি, আমার কোম্পানি থেকে কিট কিনে যারা হাসপাতালে বিক্রি করছে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আমার হাতে নেই। আমরা বিভিন্ন ল্যাবে বিক্রি করলে সেখানে কাজ করা কর্মীরা তা চুরি করে অন্যত্র দ্বিগুণ বাড়তি দামে বিক্রি করে দিচ্ছে। তবে আমার কোম্পানি কেউ এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ইতোমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছি।’
এদিকে রমিজুর রহমান নামে এক ব্যক্তি বিভিন্ন কোম্পানি ও দোকান থেকে কিট কিনে বেসরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করেন। তিনি বলেন, ‘আমদানিকারকদের কাছ থেকে কিট কিনে বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করে থাকি। কিন্তু কিট নিয়ে এখন যা চলছে, তাতে আমি এই পণ্যটি সরবরাহ করা আপাতত বন্ধ রেখেছি। কারণ ১৭০ থেকে ২৩০ টাকা দামের কিট এখন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় ক্রয় করতে হচ্ছে। সেই কিট হাসপাতাল-ক্লিনিকে কত টাকায় বিক্রি করব? কমপক্ষে ৪৫০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকা বিক্রি করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে আমি কিট সরবরাহ বন্ধ রেখেছি।’
নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগে আমি কিটের জন্য বিএমএ ভবনে কয়েকটি দোকানে গিয়েছিলাম। কোনো দোকানদারই ১০ থেকে ২০টির বেশি কিট বিক্রি করতে চান না। সেগুলোও এখন আগের তুলনায় দ্বিগুণ মূল্য চান। এরপর ক্রয় মেমো দেবে না। আবার যেসব হাসপাতাল-ক্লিনিকে আগে থেকে কিট সরবরাহ করে আসছি, তারাও বাড়তি মূল্যে এই কিট ক্রয় করতে চায় না। এতে করে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। তাই নিজেকে এই অনৈতিক বাণিজ্য থেকে সরিয়ে রেখেছি।’
বিএমএ ভবনের রি-এজেন্ট বিক্রেতা ও ফারুক স্টোরের স্বত্বাধিকারী ফারুক আহমেদ বলেন, ‘বর্তমানে চাহিদা বেশি কিন্তু সরবরাহ কম। এ কারণে দাম একটু বেশি। সবার কাছে কিট নেই। যাদের কাছে এটি আছে, তারা একটু বাড়তি দামে বিক্রি করছে।’
সুত্র : বাংলা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button