ভারতে হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া খবর ঠেকানোর চেষ্টা
ভারতের কেরালা রাজ্যের কানুর শহরে একটি স্কুলে অন্যরকম এক ক্লাস নেয়া হচ্ছে।
৪০ জন শিক্ষার্থী সেখানে জড়ো হয়েছেন নতুন ধরনের এক বিষয় শেখার জন্য। সারি বেধে বসা শিক্ষার্থীদের সামনে প্রজেক্টরে দেখা যাচ্ছে একটি প্রশ্ন: ভুয়া খবর কি?
কিছুক্ষণ পর স্ক্রিনে প্রশ্নের উত্তরও ভেসে উঠছে।
শিশুরা তা উচ্চস্বরে পড়ছে। “ভুয়া খবর হল মিথ্যে তথ্য, ছবি বা ভিডিও যা জনগণের মধ্যে কোন বিষয়ে বিভ্রান্তি ও আতংক ছড়ানোর জন্য অথবা সংঘর্ষ সৃষ্টি করার জন্য ইচ্ছে করে বানানো হয়েছে।”
কম্পিউটার সায়েন্সে পাশ করা ক্লাসের শিক্ষক মিস বিন্দিয়া শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করলেন, “যদি হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ আসে যে কাল কানুর শহরে ভূমিকম্প হবে সেটি কি তারা বিশ্বাস করবে?”
শিক্ষার্থীদের উত্তর ছিল ‘হ্যাঁ’। কিন্তু ভূমিকম্প সম্পর্কে তো আগেভাগে পূর্বাভাস পাওয়া যায়না।
শিক্ষক তাদের ব্যাখ্যা করছিলেন যেকোনো খবর পাওয়া মাত্রই তা বিশ্বাস না করে অন্য কোন উৎস থেকে তা যাচাই করতে হবে।
সে সম্পর্কে প্রশ্ন করতে হবে। চোখ বুজে তা মেনে নিলেই হল না।
কানুরের এই স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেড় হাজারের মতো। এই শহরটিকে বলা হয় ভারতের সবচাইতে সামাজিকভাবে অগ্রসর শহর।
এখানে পঁচিশ লাখ জনসংখ্যার ৯৫ শতাংশ জনগণ শিক্ষিত। কেরালা রাজ্যের সবচাইতে জনপ্রিয় খবরের কাগজের পাঠাক এক কোটি ষাট লক্ষ।
যা কিনা সারা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পঠিত কাগজগুলোর একটি।

কিন্তু এত শিক্ষার পরও কানুর শহর সাম্প্রতিক সময়ে হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া খবরের খপ্পরে পড়েছে।
তা ঠেকাতে শহরের ১৫০ টি সরকারি স্কুলে শিশুদের ভুয়া খবর চেনার উপায় শেখানো হচ্ছে। তাদের ৪০ মিনিট করে ক্লাস নেয়া হচ্ছে।
সেখানে ভুয়া খবর চেনার উপায় ছাড়াও ছবি, ভিডিও দিয়ে বোঝানো হচ্ছে, কেন কোন মেসেজে কোন বার্তা এলেই তা ইচ্ছেমত ছড়াতে হয়না।
ভারতে এমন উদ্যোগ এই প্রথম। ভারতজুড়েই হোয়াটসঅ্যাপ ব্যাপক জনপ্রিয়।
সেখানে ৩০০ মিলিয়নের বিশাল জনগোষ্ঠীর হাতে স্মার্টফোন রয়েছে। যার মধ্যে ২০০ মিলিয়ন ফোনেই হোয়াটসঅ্যাপ রয়েছে।
যাদের রয়েছে হাজার হাজার গোপন মেসেজিং গ্রুপ।
ভারতের উত্তর প্রদেশের নির্বাচনের সময় শুধুমাত্র বিজেপির পক্ষ থেকে সাড়ে ছয় হাজার হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ চালু করা হয়েছিলো।
ভারতে কি পরিমাণে মেসেজ এই অ্যাপের মাধ্যমে চালাচালি হয় তার একটি ধারনা পাওয়া যাবে এই হিসেবে।
ভারতে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রচুর কৌতুক, শুভেচ্ছা বার্তা, পর্নোগ্রাফি, গুজব ও ভুয়া খবর ভাইরাল হয়।
কানুরের সেই ক্লাসরুমে এমন কয়েকটি ভুয়া খবর দেখানো হচ্ছিলো। একটিতে দেখা যাচ্ছে দুজন ব্যক্তি মোটরসাইকেলে কিছু বাচ্চাকে তুলে নিচ্ছে।

সেটিকে এমনভাবে ছড়ানো হয়েছে যে তারা দুজন বাচ্চাদের অপহরণ করছে।
ভারতে এই জুন থেকে তিন মাসেরও কম সময়ে এমন গুজবে মানুষজন অন্তত ২৫ জনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে।
আরেকটি ভুয়া খবরে বলা হচ্ছে জনপ্রিয় একটি পানীয়তে এইডস জীবাণু সংক্রমিত রক্ত মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।
কানুরে একটি গুজব ছড়িয়েছে যে শহরের ৬০ শতাংশ মুরগীতে নিপাহ ভাইরাস রয়েছে। অতএব এই গুজবে পুরো শহরে মুরগী বিক্রি বন্ধ।
বহু লোক ব্যবসা হারিয়ে তখন পথে বসেছিল।
এমন খবরও ছড়িয়েছে যে বিনামূল্যে কোন কোম্পানি বিমান টিকেট দিচ্ছে বা বিবিসির খবরের মতো করে সাজিয়ে খবর দেয়া হয়েছে যে কোন এক প্রখ্যাত অভিনেতার মৃত্যুর হয়েছে।
গত শীত মৌসুমে হাম, মাম্পস ও রুবেলা অসুখের টিকায় শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে এমন গুজবে প্রায় আড়াই লাখ শিশুকে টিকা দিতে অস্বীকৃতি জানায় তাদের অভিভাবক।
তাতে দুই মাসের জন্য টিকাদান কর্মসূচী বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। সবমিলিয়ে ভারতের জন্য হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া খবর বা গুজব সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণ করেছে।

এসব মোকাবেলায় হিমসিম খেতে হয়েছে ভারতের কর্তৃপক্ষকে।
হোয়াটসঅ্যাপ কোম্পানি ভারতে বিশেষ বিবৃতি জারি করতে বাধ্য হয়েছিলো।
সমস্যা মোকাবেলার একটি পদ্ধতি হিসেবে এখন শিশুদের ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে যারা বাড়ি গিয়ে অন্যদের তথ্য দিয়ে জানানোর চেষ্টা করছে যে সকল খবর কেন বিশ্বাস করতে নেই।
১৭ বছর বয়সী আশিয়ান আহমেদ তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে একটি স্মার্টফোন উপহার পেয়েছেন।
তিনি বলছেন পরিবার, আত্মীয়, বন্ধু, সহপাঠীদের খোলা এক ডজনের মতো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সদস্য সে। তার সময় কাটতো এইসব গ্রুপে সত্যি মিথ্যা নানা তথ্য ঘেঁটে।
আশিয়ান আহমেদ এখন বলছেন, ইন্টারনেট, ফোন বা টিভি এক আজব দুনিয়া।
যা থেকে পাওয়া সকল তথ্য চোখ বুজে বিশ্বাস করা উচিত নয়।
বিবিসি




