জাপানীরা কেমন: পর্ব-২৩
সকালে ঘরে একটি সংঘাতপূর্ণ নাটক হয়ে গেল। অনেকগুলি বিলের পেমেন্টের কাগজ নিয়ে হাজির হলেন আমার স্ত্রী। তিনি সাদা কাগজে হিসাবকরে বললেন যে আজকের মধ্যে ৩১,১৩৪/- ইয়েন পেমেন্ট করতে হবে, টাকা দাও! এই বিলগুলির মধ্যে ইলেক্ট্রিক, গ্যাস ও টেলিফোন বিলের কাগজগুলি এনে সামনে রেখে গেলেন। অবশ্য সব টাকা আমাকে দিতে হবে না, এর অর্ধেক দিতে হবে। জাপানের জীবন যাত্রায় মাসে কতো খরচ করতে হয় এ থেকে দেশের পাঠকেরা ধারণা পাবেন। তবে এ পরিমাণ টাকার সাথে কিন্তু হ্যালথ বিমার বিল সংযুক্ত হয়নি। বলেছেন, হ্যালথ্ বিমার কাগজ এখনো আসেনি। সেটা পরে পেমেন্ট করতে হবে। জাপানে ৭০% চিকিৎসার খরচ বিমা কোম্পানি পরিশোধ করে। তবে বাকি ৩০% রোগীকে দিতে হয়। বিমার টাকা মাসে মাসে দিতে হয়!
সে যাই হোক, এ টাকার অর্ধেক আমাকে দিতে হবেই। পরিবারে তা নির্ধারণ করা হয়েছে। গতো পরশু জনাব শেখ ওয়াজির সাহেব এসেছিলেন প্রায় দুই দশক পর। আমি তাঁকে রিসিভ করতে ছয় কিলোমিটার দূরে রেলওয়ে ষ্টেশনে গাড়ি নিয়ে গেলাম। ফিরার পথে পেট্রোল পাম্প থেকে ১৮ লিটার পেট্রোল কিনেছি।
জাপানে কিনাকাটা এখন অটোম্যাটিক সিস্টেমে করতে হয়। এক দশক পূর্বে পাম্পের লোক এসে পেট্রোল দিয়ে টাকা নিতো। এখন কিন্তু সে সিস্টেম উঠে গেছে। পেট্রোল পাম্পে গিয়ে নিজের সবকিছু নিজেকেই করতে হবে।
প্রথমে কম্পিউটারের বোতাম টিপে ঠিক করতে হবে রেগুলার পেট্রোল, হাই অক্টেন এবং ডিজেল এর কোনটা আমি কিনবো। বলাই বাহুল্য যে অভ্যস্ত না হলে পেট্রোল কিনতে বড় সমস্যায় পড়তে হবে। এ সব সমস্যাগুলির মধ্যে যদি রেগুলার পেট্রোলের বদলে ভুল করে ডিজেল পেট্রোল এঞ্জিন চালিত গাড়ির ট্যাঙ্কে নিয়ে ফেলে। তা হলে গাড়ির এঞ্জিন নষ্ট হয়ে যাবে। যে গাড়ি শুধু পেট্রোলে চলে তাতে অবশ্যই পেট্রোল নিতে হবে। হাই অকটেন ভুলে নিলে বড় ভুল হয়না – তবে তার দাম অনেক বেশি। যাদের অতিরিক্ত ইনকাম শধু তারাই তাদের লাক্সারি কারে হাই অকটেন কিনেন। হাই অকটেনে গাড়ি চালাতে অবশ্য বেশ মজা আছে। জাপানিরা আমাদের দেশের গাড়ির মালিকদের মতো ড্রাইভার নিয়োগ করে গাড়ি চালায় না। তারা নিজের গাড়ি নিজেরাই চালায়।

শেখ ওয়াজির সাহেবকে রেল ষ্টেশন থেকে রিসিভ করে ফিরার পথে একটি পেট্রোল পাম্পে গিয়ে বোতাম টিপে পাঁচ হাজার ইয়েনের একটি নোট কম্পিটারে ঢুকিয়ে রেগুলার পেট্রোল গাড়ির ট্যাঙ্কে ঢেলে চলে এলাম। সারা পথে কথা বলে আনন্দে বাসাতে ফিরলাম। শেখ ওয়াজির সাহেব পেশায় ইঞ্জিনীয়ার ছিলেন। এখন অবসর জীবন যাপন করছেন। তিনি এসেছেন গত রোববার বিকাল ৪ টার সময়। রাতে ডিনার খেয়ে ফিরেছেন। আজ মঙ্গলবার। বিলের টাকা পরিশোধ করতে ওয়ালেট খুলে দেখি একটি টাকাও তাতে নেই। অনেকক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম। টাকা গেল কোথায় ভাবছি। গতকাল সোমবার গরমের জন্যে বাইরে কোথাও যাইনি এবং কেনাকাটা কিছুই করিনি। জাপানে এখন ‘অবন ফেস্টিভ্যাল’ এর দীর্ঘ ছুটি চলছে। আজ বিলের টাকা দিবো ওয়ালেট খুলে দেখি টাকা নেই। বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। ভূত এসে যে নিয়ে যায়নি! তা আমি নিশ্চিত। কারণ, জাপানে কোন ভূত নেই। জ্বিন ভূত এসব বাংলাদেশে বেশি থাকে। মানুষের মুখে মুখে জ্বিন ভূতের গল্প শুনেছি। আবার কে ভূতের খপ্পরে পড়েছিল তাও আলোচনার বিষয় হয়।সে যাই হোক, অনেক চিন্তা করে স্মরণে এল যে পেট্রোল পাম্পের কমপিউটারে যে পাঁচ হাজার ইয়েনের নোটটি ঢুকিয়েছিলাম তখন পেট্রোল কিনেছিলাম দু’হাজার ইয়েনের। বাকি তিনহাজার ইয়েন আমি পাবো। কম্পিউটার সে টাকা দিয়ে দেয় রিসিম্পট সহ। সে টাকাটা ও রিসিপ্ট না নিয়েই আমি বাসায় ফিরেছিলাম। একথা স্মরণে আসার পর গাড়ি চালিয়ে চার কিলোমিটার দূরে আজ মঙ্গলবার সকাল দশটায় দু’দিন পর পেত্রোল পাম্পে আমার তিন হাজার ইয়েন ক্লেইম করতে গেলাম। পেট্রোল পাম্পের এক কর্মচারিকে বললাম, ‘গতো রোববার চারটার দিকে দু’হাজার ইয়েনের রেগুলার পেট্রোল কিনেছিলাম কিন্তু বাকি পয়সা কম্পিউটারের পকেট থেকে নিতে ভুলে গিয়েছিলাম। সে টাকাটা কি আপনাদের নজরে পড়েছে?
কর্মচারিটি হাসি দিয়ে বলল, ‘হ্যা, জানি। আপনি আমাদের অফিস থেকে বাকি টাকা নিয়ে যান!’
তারপর অফিসে গেলাম এবং তিন হাজার ইয়েন নিয়ে বাসাতে ফিরলাম।কর্মচারি মেয়েটিকে অনেক ধন্যবাদ দিলাম। শুধু মাত্র জাপান বলেই টাকাটা পাওয়া গেছে। এই তিন হাজার টাকা যুক্ত করে আজ সব বিলের টাকা পরিশোধ করলাম।
গতো বৎসর দেশে একটি জমিন বিক্রি করেছিলাম। সে সময় এক কাণ্ড ঘটে গেল। আমার ভাগিনা একজন ব্যবসায়ী। দ্রুত টাকা গুনতে পারে। তাকে ক্রেতার নিকট থেকে টাকা গুনে নিতে বললাম। কয়েকজনের সামনে খুব দ্রুত মেশিনের মতো আঙ্গুল চালিয়ে টাকা গুনে সে বলল যে সে সব টাকা পেয়েছে। যে ব্যক্তিটি টাকা দিয়েছে লক্ষ করেছিলাম তার হাতের কিছু বাড়তি টাকা তার ব্যাগে পুনরায় রেখেছে। সেখানে আমি সহ চার পাঁচজন ছিলাম। তারপর ভাগিনা ফিরে যাওয়ার সময় টাকা আবার গুনে নিল। সবগুলি পঞ্চাশ হাজার টাকার নোটের বান্ডেল। হঠাৎ সে বলল, মামা, পঞ্চাশ হাজার টাকার নোটের একটি বান্ডেল কম। জমির ক্রেতা তখন মোটর সাইকেল চেপে তার ঘরে ফিরে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতাকে ফোন করলাম। কিন্তু কিছুতেই সে স্বীকার করলনা যে পঞ্চাশ হাজার টাকা আমাকে কম দিয়েছে। যখন সে টাকা দিচ্ছিল সব টাকাই তার ব্যাগ থেকে বের করে দাঁড়িয়েছিল। এক পর্যায়ে ভাগিনা যখন বলল যে পঞ্চাশ হাজার টাকার বান্ডেল একটি কম। তখনই ভেবেছিলাম যে যতোই ক্রেতাকে বলিনা কেনো – সে লোক টাকা কম দেওয়ার কথা স্বীকার করবে না! তার জবাব ছিল, “আপনার ভাগিনা তো বলল সব টাকা সে বুঝে পেয়েছে। আমি সব টাকাই পরিশোধ করেছি! বাকি ৫০ হাজার টাকা সে আমাকে দিল না। এ হল দেশের বাস্তবতা। কিন্তু জাপানে তা হতে পারে না।”
সেদিন শেখ ওয়াজির সাহেবের সাথে অনেক কথা হল। তিনি বলেছেন যে বাংলাদেশে এখনো নীতিবান লোক রয়েছে তবে সংখ্যায় খুবই কম। তারপর তিনি একটি ঘটনার কথা বললেন। ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপঃ
তাঁর জানা একটি লোক নাকি পঞ্চাশ হাজার টাকা একটি লোকের হাতে দিয়ে বলেছিলেন টাকাটা অন্য একজন লোককে পৌঁছে দিবার জন্য। যাবার পথে ঢাকার মলম পার্টির ছিনতাইকারী কয়েকজন লোক তাকে ধরে তার চোখে একধরনের মলম লাগিয়ে দিল। সে তখন চোখে কিছুই দেখছিল না। রাস্তায় অসুস্থ অবস্থায় পড়েছিল। পরে কয়েকজন লোক তাঁকে ধরে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সুস্থ হওয়ার পর সে বলল, ‘আমাকে টাকা পৌঁছে দিবার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ছিনতাইকারীরা আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে গেছে। সে জন্য আমি দায়ী। আমি এই পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে দিবো!’ হাসপাতাল থেকে বের হয়ে তার নিজের একাউন্ট থেকে টাকা উঠিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা সে ফেরত দিয়েছিল!
বলাই বাহুল্য যে আমার ভাগিনাও পঞ্চাশ হাজার টাকা তার নিজের একাউন্ট থেকে তুলে আমাকে দিয়েছে। তাকে কিছুতেই বারণ করতে পারিনি!সে বলল, ‘যা হবার হয়েছে, ভুল গণনার জন্যে আমি নিজে দায়ী।’
চলবে………




