শাকিব-অপুর বিচ্ছেদ ঠেকানো সম্ভব!

সিরাজ প্রামাণিক
তালাক একটি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ- বিয়ের বন্ধন ছিন্ন করা, পরিত্যাগ করা বা বন্ধনমুক্ত হওয়া। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, একত্রে বসবাস করা উভয়ের পক্ষেই বা অন্তত যেকোনো এক পক্ষের সম্ভব নয়, সে ক্ষেত্রে তারা নির্দিষ্ট উপায়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে। একজন স্বামী যেমন তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে, অনুরুপ একজন স্ত্রীও তার স্বামীকে তালাক দিতে পারে। এ অধিকারটি ১৯৩৯ সালের ‘মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন’ কর্তৃক প্রদত্ত। তবে ওই আইনের ধারা ২-এ কিছু শর্তের কথা বলা হয়েছে।
‘শাকিব খান রানা’র নামে সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র বরাবর একটি তালাকনামার নোটিশ পাঠানো হয়েছে। শাকিব খানের স্বাক্ষরিত ইংরেজিতে লেখা ওই নোটিশে বলা হয়, ‘নিম্ন সাক্ষীদের উপস্থিতিতে আমি শাকিব খান এই নোটিশের মাধ্যমে অপু বিশ্বাসের সাথে সব ধরনের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করে তালাক ঘোষণা করছি।’ এতে সাক্ষী করা হয় মোহাম্মদ আলী ও আতাউর রহমান নামে দুইজনকে। এতে মুসলিম শরিয়াহ আইনে-২০০৮ সালের ১৬ এপ্রিল উভয়ের মধ্যে বিয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অপু বিশ্বাস ও শাকিব খান তালাকের কারণ হিসেবে নোটিশে শাকিব উল্লেখ করেছেন, অপু তার পছন্দের সীমার মধ্যে থাকেননি। সম্প্রতি তাদের সন্তানকে গৃহপরিচারিকার কাছে রেখে দেশের বাইরে যান অপু। এ ব্যাপারে অপুর কাছ থেকে তিনি কোনো সন্তোষজনক জবাব পাননি। এরপর শাকিব ধরে নিয়েছেন, ‘অপু তার সাথে সংসার করতে চান না’।
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭ (১) ধারা অনুযায়ী, স্বামী তালাক দেয়ার পরপরই তালাকের সংবাদটি একটি নোটিশের মাধ্যমে চেয়ারম্যান বা মেয়রকে (যার এলাকায় স্ত্রী বসবাস করছেন) জানাতে হবে। সেই নোটিশের একটি কপি স্ত্রীকে পাঠাতে স্বামী বাধ্য থাকবেন। শাকিবও তা করেছেন। তবে কাবিননামার ফটোকপি জমা দেননি। এ আইন অনুযায়ী নোটিশ প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান বা মেয়র বা সিটি করপোরেশন সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয়ের মধ্যে পুনর্মিলন ঘটানোর উদ্দেশে একটি সালিসি পরিষদ গঠন করবে এবং ওই পরিষদ এই পুনর্মিলনীর জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বিষয়টি যদি সমাধানযোগ্য হয়, তবে এর সমাধান করতে হবে।
তবে হাইকোর্ট বিভাগ বলছেন, চেয়ারম্যান কর্তৃক সমঝোতার জন্য সালিসি পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেয়ার বিষয়টি গৌণ। সালিসি পরিষদ গঠনের বিষয় প্রমাণিত না হলেও তালাক বৈধভাবে কার্যকর হবে। (আব্দুস সোবহান সরকার বনাম আবদুল গনি, ২৫ ডিএলআর, পৃষ্ঠা-২২৭ ও আবদুল আজিজ বনাম রিজিয়া খাতুন ২১ ডিএলআর, পৃষ্ঠা-৭৩৩)।
আইনানুযায়ী শাকিব-অপুর এখনো বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান। নোটিশ প্রাপ্তির ৯০ দিন অতিক্রান্ত না হলে তালাক কার্যকর হয় না। এ সময় পক্ষ দু’টির বৈবাহিক সম্পর্কের কোনো প্রকার পরিবর্তন হয় না। তালাক সম্পূর্ণ কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত তারা আইনসম্মতভাবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই থেকে যায়। (শফিকুল ইসলাম বনাম অন্যান্য-বনাম রাষ্ট্র, ৪৬ ডিএলআর, হাইকোর্ট, পৃষ্ঠা-৭০০)
দুই-একটি সূত্র বলছে, শাকিব-অপুর বিয়ে হয়েছে মগবাজার কাজী অফিসে। তবে মগবাজারে থাকা দু’টি কাজী অফিস বিষয়টি অস্বীকার করেছে। এর আগে অপু বিশ্বাস বলেছিলেন, তাদের বিয়ের কাবিননামাও শাকিব নিয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দু’জন কাজি অফিস না গিয়ে নোটারি পাবলিক বা কোর্ট ম্যারেজ করলে তাতে বিপত্তি বাঁধতে পারে অপু বিশ্বাসের বেলায়।
কিন্তু উচ্চ আদালত বলছেন, বিয়ে রেজিস্ট্রি না হয়ে থাকলে নিকাহ রেজিস্ট্রার কর্তৃক তালাক রেজিস্ট্রির প্রয়োজন নেই। ১৯০৮ সালের আগে বিয়ে হলে তা অবশ্যই ১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনে রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে। আর ১৯৭৪ সালের পরে হলে বিয়ের ক্ষেত্রে ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন প্রযোজ্য হবে (আতিকুল হক চৌধুরী বনাম শাহানা রহিম এবং অন্যান্য ৪৭ ডিএলআর, পৃষ্ঠা-৩০১)। শাকিব-অপুর বিয়ে যদি রেজিস্ট্র্রি না হয়ে থাকে, তাহলে তালাকও নিকাহ রেজিস্ট্রির প্রয়োজন নেই।
তবে এর মধ্যে শাকিব-অপুর মধ্যে মিল-মহব্বত হয়ে গেলে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ঘরসংসার করতে বাধা নেই। কিন্তু নোটিশ প্রাপ্তির ৯০ দিন পার হয়ে গেলে পুনরায় বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। ১৯৬১ সনের মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশের ৭ (৬) ধারা অনুযায়ী তালাকের মাধ্যমে কোনো বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটলে, তালাক হওয়া দম্পতি পুনরায় বিয়ে করতে চাইলে নতুন করে বিয়ে করতে হবে।
এখন জানা দরকার, তালাকের পর এ দম্পতির সন্তান আব্রাহাম খান কার কাছে থাকবে। সোজা উত্তর, সন্তান মায়ের কাছে থাকবে। ছেলে সন্তান সাত বছর পর্যন্ত এবং মেয়ে সন্তান বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকবে। তবে তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব বাবাই বহন করবে। যদি বাবা দায়িত্ব পালন না করে, সে ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান সালিসির মাধ্যমে আলাপ-আলোচনা করে বিষয়টি মীমাংসা করতে পারেন। তালাক যে পক্ষ থেকেই দেয়া হোক না কেন, স্ত্রী দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী। কাজেই বিয়ের দেনমোহর বাবদ সাত লাখ টাকা অপুকে পরিশোধ করবেন শাকিব খান- এটাই আইনের বিধান।
এদিকে শাকিব খানের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করার কথা বলছেন অপু বিশ্বাস। অভিযোগ এনেছেন গর্ভপাতেরও। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ মানবাধিকার কর্মীদের সহায়তা চেয়েছেন তিনি। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি আইনের ৩১২ থেকে ৩১৬ ধারা পর্যন্ত গর্ভপাত-সংক্রান্ত আইন ও সাজার কথা বলা হয়েছে। ৩১২ ধারায় বলা হয়েছে- কোনো নারী গর্ভপাত ঘটালে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তিন বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয় প্রকার শাাস্তি পেতে পারে। ৩১৩ ধারায় বলা হয়েছে- কোনো ব্যক্তি যদি স্ত্রীলোকটির সম্মতি ছাড়া গর্ভপাত ঘটায়, তাহলে ওই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাবাস, জরিমানা বা ১০ বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। ৩১৪ ধারায় বলা হয়েছে- কোনো ব্যক্তি যদি স্ত্রীলোকটির সম্মতি ছাড়া গর্ভপাত ঘটানোর উদ্দেশ্যেজনিত কার্যে মৃত্যু ঘটায়, তাহলে ওই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাবাস বা উপযুক্ত দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী




