উপমহাদেশশিরোনাম

কাশ্মীরে অশান্তির মূলে নেহরুর ‘ভুল’!

এ বছর বুরহান ওয়ানির প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে।এ বছর বুরহান ওয়ানির প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে।
‘সর্দার প্যাটেলের প্রচেষ্টাতেই হায়দরাবাদ ও জুনাগড় দেশের অংশ হয়েছিল। কিন্তু, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু যদি তাকে কাশ্মীর নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দিতেন, তাহলে আমাদের আজকের কাশ্মীর দেখতে হতো না।’ বক্তা ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। সুরাটে দলের ‘গুজরাত গৌরব যাত্রা’য় অংশ নিয়ে শনিবার একথা বলেন তিনি।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের অধিকাংশ ছিল কাশ্মীর ও সন্ত্রাস নিয়ে। সেখানে প্রথমেই পাকিস্তানকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন রাজনাথ। বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশী পাকিস্তান। অর্থাৎ পবিত্রস্থান। কিন্তু, ওরা অপবিত্র কাজেই ব্যস্ত।’
এরপরই কাশ্মীর নিয়ে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরুর ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন রাজনাথ সিং। দেশের প্রথম উপ প্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে কাশ্মীর নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দিয়েছিলেন জওহরলাল নেহরু। এই অভিযোগ তুলে রাজনাথ সিং বলেন, ‘আজ আমরা অন্য এক কাশ্মীরকে পেতে পারতাম।’
কাশ্মীর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদীর উদ্যোগের প্রশংসা শোনা যায় রাজনাথ সিংয়ের গলায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী সব প্রোটোকল ভেঙে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। যাতে এক সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়। কিন্তু, কাশ্মীরে পাকিস্তানের সন্ত্রাস বন্ধ হয়নি।’
প্রসঙ্গত, গোটা কাশ্মীরের দখল নিতে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জেতে চেয়েছিলেন সর্দার প্যাটেল। ১৯৪৯-এর জুলাইতে ‘পুরো কাশ্মীর চাই’ দাবি তুলেছিলেন তিনি।
কাশ্মীর সমস্যা
কাশ্মীর সমস্যা হলো কাশ্মীর অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভারত সরকার, কাশ্মীরি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি এবং পাকিস্তান সরকারের মধ্যে প্রধান আঞ্চলিক বিরোধ। যদিও ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে ১৯৪৭-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় থেকেই আন্তঃরাজ্য বিরোধ রয়েছে। এছাড়াও কাশ্মীরি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সাথেও – কাশ্মীরকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তি বা সম্পূর্ণ স্বাধীন ঘোষণা করার জন্য অভ্যন্তরীণ বিরোধ রয়েছে।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে ১৯৪৭, ১৯৬৫ এবং ১৯৯৯-এ অন্ততঃ তিনটি যুদ্ধ হয়েছে। এছাড়াও, ১৯৮৪ সালের পর থেকে সিয়াচেন হিমবাহ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই দুই দেশ বেশ কয়েকটি খণ্ডযুদ্ধে জড়িত হয়েছিল। ভারত সমগ্র জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যটি তাদের বলে দাবি করে এবং যার মধ্যে ২০১০ সালের হিসাবে, জম্মু বেশিরভাগ অংশ, কাশ্মীর উপত্যকা, লাডাখ এবং সিয়াচেন হিমবাহ নিয়ে প্রায় ৪৩% অঞ্চল শাসন করছে। পাকিস্তান এই দাবির বিরোধিতা করে, যারা প্রায় কাশ্মীরের ৩৭% নিয়ন্ত্রণ করে- এর মধ্যে আছে আজাদ কাশ্মীর এবং গিলগিট বাল্টিস্থানের উত্তরাঞ্চল।
কাশ্মীরি বিদ্রোহীরা এবং ভারত সরকারের মধ্যে বিরোধের মূল বিষয়টি হল স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন। কাশ্মীরের গণতান্ত্রিক উন্নয়ন ১৯৭০-এর শেষভাগ পর্যন্ত ছিল সীমিত এবং ১৯৮৮ সালের মধ্যে ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত বহু গণতান্ত্রিক সংস্কার বাতিল হয়ে গিয়েছিল। অহিংস পথে অসন্তোষ জ্ঞাপন করার আর কোনো রাস্তাই খোলা ছিল না তাই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য বিদ্রোহীদের হিংসাত্মক আন্দোলনের সমর্থন নাটকীয়ভাবে বাড়তে থাকে। ১৯৮৭ সালে বিতর্কিত বিধানসভা নির্বাচন রাজ্যের বিধানসভার কিছু সদস্যদের সশস্ত্র বিদ্রোহীগোষ্ঠী গঠনে অনুঘটকের কাজ করেছিল। ১৯৮৮ সালের জুলাই মাসে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল, ধর্মঘট এবং আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হয় কাশ্মীরের অস্থিরতা।
যদিও জম্মু ও কাশ্মীরের অশান্তির ফলে হাজারো মানুষ মারা গেছে, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে যে সংঘাতে প্রাণহানীর পরিমাণ অনেকটাই কম। প্রতিবাদী আন্দোলন ভারত সরকারের কাছে কাশ্মীরের সমস্যা ও ক্ষোভ জানানোর শক্তি যুগিয়েছে, বিশেষ করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে, যারা ১৯৮৯ সালে থেকে ভারতশাসিত কাশ্মীরে সক্রিয় রয়েছে। যদিও বিভিন্ন উগ্রবাদী গোষ্ঠী ২০০৮ সালের নির্বাচন বয়কটের ডাক দেয় তবুও বহু সংখ্যক ভোটার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার এই নির্বাচনকে সাধারণভাবে নিরপেক্ষ হিসাবে গণ্য করে। এই নির্বাচনে জয়লাভ করে ভারতপন্থী জম্মু ও কাশ্মীর ন্যাশানাল কনফারেন্স রাজ্যে সরকার গঠন করে। ২০০৯ ও ২০১০ সালে আবার অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
গত বছরের জুলাইয়ে কাশ্মিরি স্বাধীনতা আন্দোলনের জনপ্রিয় নেতা বুরহান ওয়ানিকে ভারতীয় বাহিনী হত্যা করার পর থেকেই রাজ্যটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ সহিংসতা চলছে।
এ বছর বুরহান ওয়ানির প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে।
২২ বছরের ওয়ানির মৃত্যুর পর কাশ্মীরের শ্রীনগর যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল তার নজির সাম্প্রতিককালে নেই। তার জানাজায় জানাজায় উপত্যকা জুড়ে মানুষের ঢল নেমেছিল।
আর এখন তার মৃত্যুর প্রথম বার্ষিকীতেও শ্রীনগরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বুরহান ওয়ানির মৃত্যুবার্ষিকীতে গণবিক্ষোভের ডাক দেয়া হয়।
গণবিক্ষোভ ঠেকাতে রাজ্যে কারফিউ জারি করা হয়েছে, মোতায়েন করা হয়েছে হাজার হাজার সেনা সদস্য।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button