বিবিধশিরোনাম

ঢাকা এখন সমস্যার নগরী

মুহাম্মদ শরীফ : ঢাকার রাজধানী হওয়ার ইতিহাস বেশ পুরনো। ব্রিটিশ আমলে এসে ঢাকা রাজধানীর গৌরব হারাতে থাকে। ভারত ভাগের সুর উঠলে, ঢাকা আবার ফিরে পেতে শুরু করে সেই হারানো গৌরব। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ঢাকা হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী। অবশেষে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টি হলে, ঢাকা নবীন বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ঢাকাকে এক সময় বলা হতো মসজিদের নগর। সে উপমা এখনো আছে। কিন্তু মনে হচ্ছে ঢাকার সঙ্গে আরো বেশ কিছু উপমা যুক্ত হয়েছে। এখন যদি বলা হয়, ঢাকা ফ্লাইওভারের নগরী, তাহলেও ভুল বলা হবে না। ঢাকার রাস্তা থেকে এখন আর আকাশ দেখা যায় না। উপরে তাকালে কেবল সাপের মতো ফ্লাইওভার আর বন্দিশালার মতো দালান আর দালান।
পূর্বে ঢাকায় সমস্যা আর বিনোদন দুটিই পাওয়া যেত। এখন ঢাকা থেকে বিনোদন হারিয়ে গেছে। টিকে আছে কেবল সমস্যা। ঢাকা এখন সমস্যার নগরী। ঢাকার বিনোদনের পার্কগুলোর সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে। রাস্তায় হাঁটার মতো নেই ফুটপাত। অতিরিক্ত মানুষের চাপে শ্বাস ফেলার জায়গা নেই। রাস্তায় নিয়মিত যানজট। বসবাসের উপযোগিতা হারাতে বসেছে ঢাকা। বিশ্বের যে কয়টি রাজধানী বসবাসের অনুপযোগী, তার মধ্যে ঢাকা প্রথম সারিতে। রাজধানীতে মানুষের চাপ থাকবেই। সব দেশের রাজধানীতে তা থাকেও। কিন্তু রাজধানী যদি সঠিক পরিকল্পনায় গড়ে না ওঠে, তাহলে সেই চাপ জটিল সমস্যায় পরিণত হয়। যেটা ঢাকার বেলায় ঘটেছে। রাজধানীতে তৈরি দালানগুলো পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেনি। জমির মালিকেরা ইচ্ছেমত ভবন নির্মাণ করেছে। যার কারণে ঢাকা তার সৌন্দর্য হারিয়েছে।
এছাড়া চুরি, ছিনতাই, ধোঁকাবাজি, আমিত্ব ঢাকার সৌন্দর্যকে আরো ম্রিয়মাণ করেছে। শিক্ষা একটি মহান পেশা। কিন্তু ঢাকার এখন প্রধান বাণিজ্য শিক্ষা। আমাদের নৈতিকতা, সত্য কাজগুলো এখন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। লক্কড়ঝক্কড় বাসে প্রতিদিন মানুষ প্রতিযোগিতা করে উঠছে, একজনকে ফেলে অন্যজন। তরুণ সিটে বসে আছে, বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে কষ্ট পাচ্ছে; কারো প্রতি কারো নজর নেই। উপার্জনের স্বল্পতা, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষকে হতাশায় ডুবাচ্ছে। বেকারত্ব আর বিলাসিতা— এটিই রাজধানীর তরুণদের দুই ভাগে ভাগ করেছে। শিক্ষার নিম্মমান, বেকারত্বের কষাঘাত, নিম্ম বেতনের চাকরি আর চাহিদার অপ্রাপ্যতা— সব মিলিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে হাঁটতে হচ্ছে রাজধানীর অধিকাংশ তরুণকে। এই যে একটা মানসিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তা থেকে তরুণরা সহজে মুক্ত হতে পারছে না। মানসিক চাপ থেকে মুক্তির জন্য বেড়ানোর জায়গাগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে। নদী দূষণে ঢাকা পৃথিবীর মধ্যে প্রথম স্তরে। একটা সময় লন্ডনের টেমস নদী ছিল আজকের বুড়িগঙ্গার মতো দূষিত। সঠিক পরিকল্পনার ফলে সেই টেমস আজ হয়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। ঢাকার প্রাণ এই বুড়িগঙ্গা আজ হারিয়ে যাচ্ছে। দূষণে এত করুণ অবস্থা যে, কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে না। অথচ এই বুড়িগঙ্গা হতে পারত নগরবাসীর স্বস্তির বাতিঘর। এখনো যে হতে পারবে না, তা নয়। হাতিরঝিল দেখে আমরা সে আশা রাখতে পারি।
এক জরিপ অনুসারে, ঢাকায় যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। বিশাল এই অপচয় আমরা রোধ করতে পারছি না। ঢাকার মতো এত নিম্মমানের পাবলিক যানবাহন হয়ত আর কোনো দেশের রাজধানীতে নেই। ঢাকায় যানজটের অন্যতম কারণ ব্যক্তিগত গাড়ি। উন্নত দেশগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার নিরুত্সাহিত করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র। এখানে আছে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের কূটচাল। ব্যক্তিগত গাড়ির প্রচলন কমাতে হলে, বাড়াতে হবে পাবলিক সার্ভিসগুলোর মান। এটাই একমাত্র বিকল্প। বায়ুদূষণ ঢাকাকে আরো বিষিয়ে তুলেছে। ঢাকার রাস্তায় খোলা নাকে হেঁটে বা গাড়িতে করে যাওয়া অনেক কষ্টের। বিশেষ করে ফ্লাইওভারের নিচে বেশি অপরিচ্ছন্ন। কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে এই স্থানগুলো আকর্ষণীয় এবং পরিবেশ আরো স্বচ্ছ হয়ে উঠতে পারে। সব থেকে দুঃখের বিষয় হলো, ঢাকার মতো রাজধানী শহরেও দেখা যায়, মানুষ খোলা জায়গায় প্রস্রাব করছে। দূষিত হওয়ার জন্য আর কী চাই! রাজধানীতে শৌচাগার সংকট থেকেই এমন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারছে। এই ছোট ছোট বিষয়গুলোর প্রতি কর্তৃপক্ষের আন্তরিকভাবে নজর দেওয়া উচিত। সুত্র: ইত্তেফাক
লেখক : শিক্ষার্থী, ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, কুমিল্লা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button