উত্তরখানের শখের গাড়িওয়ালা

: নুরুল করিম :
শুক্রবার। সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপরে, আমরা তখন পৌঁছে গেলাম রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর। আমাদেরকে যেতে হবে উত্তরখানের মৈনারটেক বাজারে। আবদুল্লাহপুর থেকে ঠিক জায়গায় পৌঁছানোর জন্য টমটমে উঠে বসলাম সবাই। এই রাস্তায় অবশ্য রিকশা আর টমটম ছাড়া যাত্রীবাহী অন্যকিছু চলাচল করতে দেখা যায়নি। ১৫ মিনিটের মধ্যে আমরা ঠিক জায়গায় পৌঁছে গেলাম। পৌঁছে তো পুরোই অবাক! এটা কি আসলে ঢাকা শহরের মাঝে, নাকি গ্রাম্য বাজার। রাস্তা-ঘাটেরও বেহাল দশা! বাজারে গিয়েই মাহমুদুল ফারুককে কল করলাম। উনি জানালেন, কাউকে ‘ফারুকের গাড়ির সংগ্রহশালা’ বললেই দেখিয়ে দেবে। যা বললেন ঠিক তাই। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘ফারুক সাহেবের গাড়ির বাড়ি? বামে গিয়ে ডানে যাবেন।’
মানুষটির দেখানো পথে এগিয়ে গিয়েই দেখা মিললো বাড়িটির। প্রথম গেট দিয়ে ঢুকতেই দেখি বিশাল বড় রাস্তা। গেটের দারোয়ান জানালেন, এটি মাহমুদুল ফারুকের খামারবাড়ি। এরমধ্যেই তার শখের গাড়ি সংগ্রহশালা। আমরা তার হাতের ইশারায় আরেকটি গেট দিয়ে প্রবেশ করলাম। প্রবেশ করতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। এ তো দেখি এক গাড়ির রাজ্যে ঢুকে পড়লাম। শুধু গাড়ির রাজ্য বললেও ভুল হবে। চারদিকের গাছপালা, পাখির কিছিরমিছির ডাক আর বাতাসের দোল যেন পুরো জায়গাটাকে স্বর্গে পরিণত করে রেখেছে। ঢুকতেই চোখে পড়লো সেনাবাহিনীর ব্যবহূত একটি গাড়ি। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলাম বেশ কয়েকজন মিস্ত্রি গাড়িগুলো ঠিক করতে ব্যস্ত। আবার কয়েকজনকে দেখলাম গাড়িগুলো পরিষ্কার করতে। একেকটা গাড়ির অবস্থা একেকরকম। কোনোটি এখনও চলাচল যোগ্য, কোনোটির সবই ঠিক শুধু বসার সিট নেই, আবার কোনোটি পড়ে আছে মুমূর্ষু রোগীর মতো! তবে আমরা গিয়ে দেখলাম ‘চট্টগ্রাম-ক-২১৩৩’ নম্বরের গাড়িটির মেরামত চলছে। গাড়ি ঠিক করছেন আলী হোসেন। তিনি জানালেন, এটা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ব্যবহার করতেন। মিস্ত্রি আর কিছু বললেন না, তিনি আমাদেরকে নিয়ে গেলেন মাহমুদুল ফারুকের কাছে। টিনের একটি ঘর। তার মধ্যে চেয়ার টেবিল নিয়ে বসে আছেন। আমাদেরকে দেখেই বললেন, ‘আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছি। একটু কাজ ছিল তাও বসে আছি। সকাল করে এলে ভালো হতো।’ গিয়েই আড্ডায় মুখর হলাম মাহমুদুল ফারুকের সাথে। প্রথমেই আর কোনো প্রশ্ন না করেই জিজ্ঞেস করলাম বঙ্গবন্ধুর ব্যবহূত গাড়িটির কথা।
‘চট্টগ্রাম-ক-২১৩৩’ ও একটি ইতিহাস
‘এটা ঠিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গাড়ি নয়। এটা বঙ্গবন্ধু ব্যবহার করেছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান গাড়িটি ব্যবহার করেছিলেন বিভিন্ন সময়। গাড়িটি চট্টগ্রামে ছিল। ওনারা যখন চট্টগ্রামে যেতেন তখন এটা ব্যবহার করতেন।’—এভাবেই চট্টগ্রাম-ক-২১৩৩ নম্বরের ঐতিহাসিক গাড়িটির ব্যাখ্যা দিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখনই চট্টগ্রামে যেতেন এই গাড়িটিতে চড়তেন। গাড়িটির সাথে জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গাড়িটি হাইজ্যাক করে মুক্তিবাহিনী। পাক সেনাবাহিনীর কাছ থেকে গাড়িটি ছিনিয়ে তারা যুদ্ধের সরঞ্জাম আনা নেওয়ার কাজে ব্যবহার করতেন। তবে কোনো এক যুদ্ধ আক্রান্ত ক্ষণে এই গাড়িটিও মানুষের মতো গুলিবিদ্ধ হয় পাক হানাদারের হাতে। তিনি আমাদেরকে গাড়ির দিকে এগিয়ে নিয়ে বললেন, ‘এই গাড়িটিও রেহাই পায়নি পাকিস্তানিদের গুলির আঘাত থেকে।’ গাড়িটি কিভাবে সংগ্রহ করলেন? তিনি জানালেন, বন বিভাগ গাড়িটি নিলামে তোলে। ওই নিলামে গাড়িটি তার হাতছাড়া হয়ে যায়। পরে যিনি গাড়িটি নিলাম থেকে কিনেছিলেন তার কাছ থেকে মাহমুদুল ফারুক বেশ চড়া দামে কিনেছেন গাড়িটি। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু এটি ব্যবহার করতেন বলেই গাড়িটি এখন অমূল্য সম্পদ।’
প্রতিটি গাড়িই বহন করছে গল্প!
‘তোমরা পুরো জায়াগাটা ঘুরে দেখো, এরপর কথা হবে।’ ফারুকের কথামতো আমরা পুরো জায়গাটা ঘুরে দেখতে লাগলাম। এখানে আরোকিছু লোককে দেখা গেল গাড়ির কাজ করতে। কিছুটা ওয়ার্কশপের মতোই মনে হয় জায়গাটাকে। সংগ্রহে থাকা গাড়িগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তারা কাজ করেন। পাশাপাশি নতুন সংগ্রহ করে আনা মুমূর্ষু গাড়িগুলোকে মেরামত করে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসেন তারা। গোটা প্রক্রিয়া নিজহাতে তত্ত্বাবধান করেন মাহমুদুল ফারুক। ইন্টারনেট খুঁজে নকশা বের করে সেই মতো নিজেই ডিজাইন করেন। এছাড়া গাড়ি বই পড়ে, নেট ঘেঁটে তথ্য খুঁজে বের করেন। একটা গাড়ি শুধু মেরামত করলেই চলে না। গাড়িকে তার আসল রূপ ফিরিয়ে দিতে হয়, না হয় গাড়িটির যে কোনো মূল্য নেই! জোড়াতালির কাজ একদম পছন্দ নয় ফারুকের। অনেক সময় গাড়িগুলো বিভিন্ন অংশ এদেশে খুঁজে পাওয়া যায় না, এমনকি দেখা যায় বিদেশেও পাওয়া কষ্টকর! তবুও তিনি ধৈর্য ধরে দেশের বাইরে থেকে পার্টস এনে কাজ করেন। তাই সময়ও লাগে প্রচুর একেকটি গাড়ির আদিরূপ ফিরিয়ে আনার জন্য। তিনি বলেন, ‘একেকটা গাড়ি আমার কাছে সন্তান সমতূল্য।’
বর্তমানে ৬০টিরও বেশি গাড়ি আছে তার সংগ্রহে। প্রতিটি গাড়িরই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন গল্প। একাত্তরের যুদ্ধে ব্যবহূত গাড়ি যেমন তার সংগ্রহে আছে তেমনি আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহূত গাড়িও। ব্রিটিশ আর্মি, জাপানিজ আর্মি, বাংলাদেশি আর্মিদের ব্যবহার করা গাড়ির দেখাও পাওয়া যাবে মাহমুদুল ফারুকের কাছে। সংগ্রহে আছে জাপান, আমেরিকা, ইতালি, ব্রিটেন, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের গাড়ি। ব্র্যান্ডগুলোও যেনতেন নয়! রোলস রয়েলস, অস্টিন, শেভরোলেট, ফিয়েট, মারসিডিজ বেঞ্জ, টয়োটা, ভক্সওয়াগন, মরিস মাইনর, মাজদা, জাগুয়ারসহ আরও বেশকিছু ব্র্যান্ডের ক্ল্যাসিক মডেলের গাড়ি সংগ্রহ করেছেন তিনি।
শুধু গাড়ি নয়…
মাহমুদুল ফারুকের এই সংগ্রহশালা দেখে চোখের সামনে ভাসতে থাকলো হলিউড সিনেমার গাড়িগুলো। দেখতে ঠিক একই গাড়িগুলো! আর শুধু গাড়িই নয়, তার সংগ্রহে আছে বাইক, নৌকা, স্পিডবোড, ট্রাক্টর ও কেরোসিনে চালিত ফ্রিজ। এই প্রজন্মেও অনেকেই হয়তো জানেন না বিদ্যুত্ আসার আগে কেরোসিনে চালিত ফ্রিজের ব্যবহার ছিল। ট্রিয়াম্প অব ইংল্যান্ড, ইতালিয়ান ভেসপা, ইতালিয়ান ল্যামব্রেটা, জাপানের হোন্ডা, মোটো গুজ্জি, ইন্ডিয়ান রয়েল এনফিল্ড, ডুকাটির মতো ব্র্যান্ডগুলোর ভিনটেজ বাইক আছে তার সংগ্রহে। গাড়ির মতো বাইকেরও গল্প আছে। তার সংগ্রহে একটি বাইক আছে ইন্ডিয়ান ইউএসএ-১৯৪২ মডেলের। যেটি ব্রিটিশ আর্মিরা জাপানিজ আর্মিদের বিরুদ্ধে বার্মা ফ্রন্টে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্যবহার করেছিল। সবকিছুই আকর্ষণীয়, তবে তার সংগ্রহশালার মধ্যে লাল রঙের একটি ট্রাক্টর বেশ নজর কাড়লো। মাহমুদুল ফারুক জানালেন, এই ট্রাক্টরের কাহিনি বেশ মর্মান্তিক। কেমন মর্মান্তিক?
বাংলাদেশে আসা প্রথম ট্রাক্টর
কুষ্টিয়ার এক জমিদার পুত্র আমেরিকা থেকে ট্রাক্টরটি কিনে আনেন। এই ট্রাক্টরটি দিয়ে চাষের পাশাপাশি ধানও মাড়ানো যায়। ট্রাক্টরটি আনার পর থেকে জমিদারের ছেলে তাদের বিশাল সম্পত্তিতে চাষাবাদ শুরু করেন। কিন্তু হঠাত্ একদিন সান স্ট্রোকে জমিদার পুত্র মারা যান। ছেলের শোকে জমিদার ট্রাক্টরে মাথা খুঁটে খুঁটে মারা যান। এরপর বেশ কয়েকবছর এই ট্রাক্টরটি পড়ে রইলো ওই জমিদার বাড়িতে। এরপর? এরপর বহুবছর পর একদিন জমিদার পরিবার এটি এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেন ধান ভাঙার মেশিন হিসেবে। তারা বেশ কয়েকমাস ধান ভাঙেন। কিন্তু ব্যবসায়ী জানতেন না যে, এটি দিয়ে চাষ হয়। ভুলে একদিন ধান ভাঙার সময় ট্রাক্টরটি চলতে থাকে এবং এরমধ্যে পিষ্ট হয়ে মারা যায় ২০-২৫ জন লোক। তারপর এটি ৩০ বছর পড়ে থাকে একটি পুকুরে। খবর পেয়ে সেখান থেকে এটি তুলে আনেন মাহমুদুল ফারুক। তিনি জানান, এটিই সম্ভবত বাংলাদেশে (তত্কালীন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া) আসা প্রথম ট্রাক্টর।

একজন মাহমুদুল ফারুক
ঢাকাতেই ফারুকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তিনি বর্তমানে স্ত্রী ও এক মেয়ে নিয়ে আমেরিকায় বসবাস করলেও তার এই সংগ্রহশালার টানে দেশে আসেন বছরে বেশ কয়েকবার। বাবা মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন তত্কালীন পাকিস্তান সরকারের গণপূর্ত বিভাগের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। বাবার কাছ থেকেই গাড়ির প্রতি আগ্রহ জন্মে ফারুকের। তিনি বলেন, ‘চার বছর বয়সে প্যাডেল কার চালাতাম। বাবার গাড়ি ছিল, সুযোগ মিললেই ঘুরে বেড়াতাম।’ মাহমুদুল ফারুক চট্টগ্রামের চিটাগাং কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে লন্ডন চলে যান। এমন শখের মাত্রা বেড়েছে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে যাওয়ার পর। দুষ্প্রাপ্য গাড়ি সংগ্রাহকদের ক্লাবের সক্রিয় সদস্যও ছিলেন সেখানে। পড়াশোনা শেষে চাকরি করেছেন ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামে। উত্তরখানে গাড়ির সংগ্রহশালা হলেও দেশে এলেই তিনি থাকেন নয়াপল্টনে। তবে উত্তরখানে সংগ্রহ করার আগে তিনি নয়াপল্টনের বাসার কাছেই রাখতেন গাড়িগুলো।
যেটা দিয়ে শুরু
মাহমুদুল ফারুকের সংগ্রহশালা থেকে বের হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে শোনা হয় প্রথম গাড়ি সংগ্রহের গল্প। সালটি ছিল ১৯৭৭। গাড়ির প্রতি বিস্তর কৌতুহল, ভালোবাসা ও নেশা নিয়ে বিলেত থেকে বাংলাদেশে ফিরলেন মাহমুদুল ফারুক। চট্টগ্রামের নাজিরহাট মাইজভাণ্ডারিতে একটি গাড়ি চোখে পড়লো তার। ১৯২৮ সালের ফোর্ড ব্র্যান্ডের গাড়ি। তত্কালীন সময়ে নাকি এই ফোর্ড গাড়িগুলোকেই মানুষ চাঁদের গাড়ি হিসেবে ব্যবহার করছিল! মাহমুদুল ফারুক এই ১৯২৮ সালের পুরোনো গাড়িটি দিয়েই শুরু করলেন ভিন্টেজ গাড়ি সংগ্রহের কাজ। গাড়ি সংগ্রহ করার কাজটি সহজ নয় মোটেও। কারণ বেশিরভাগ পুরোনো গাড়ির অবস্থা থাকে মুমূর্ষু রোগীর মতো সঙ্কটাপন্ন! তবুও দেশের যে প্রান্তেই পুরোনো গাড়ির খোঁজ পান ছুটে যান মাহমুদুল ফারুক। গাড়িগুলোকে নিয়ে আসেন তার খামারবাড়িতে।
সুত্র : ইত্তেফাক




