রাজনীতি

ষোড়শ সংশোধনী রায়কে কেন্দ্র করে প্রতিক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে অশোভন ঔদ্ধত্যপূর্ণ

যৌথ বিবৃতিতে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা ও রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধার সম্পর্কের স্বার্থে সংশ্লিষ্টদের প্রতি সংযত আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন ১২ জন বিশিষ্ট নাগরিক। তারা বলেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল-সংক্রান্ত রায়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহল থেকে এমনভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হচ্ছে যে তা অনেক ক্ষেত্রে অশোভন, ঔদ্ধত্যপূর্ণ, বিদ্বেষমূলক এবং সংবিধানপরিপন্থী।
আজ মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে এ আহবান জানান হয়।
বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘‘আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছি যে, সম্প্রতি সর্বোচ্চ আদালত বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট-এর আপীল বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত রায়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহল থেকে এমনভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হচ্ছে যে তা অনেক ক্ষেত্রে অশোভন, ঔদ্ধত্যপূর্ণ, বিদ্বেষমূলক এবং সংবিধান পরিপন্থী। অনাকাঙ্ক্ষিত এ প্রেক্ষিতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার পাশাপাশি রাষ্ট্রের তিন অঙ্গ- আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য ও সুসম্পর্ক রক্ষা সংবিধানে ক্ষমতা ও এখতিয়ার পৃথকীকরণ নির্ধারিত রয়েছে তার ভিত্তিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও আস্থার যে ঐতিহ্য আমরা লালন করে এসেছি তাও নির্মূল হবার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। আদালতের রায়ে কেউ ক্ষুব্ধ হলে তার বিরুদ্ধে প্রতিকার চাইবার আইনানুগ পন্থা রয়েছে। আদালতের রায় সম্পর্কে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা প্রয়োজন, প্রকৃতপক্ষে তা দেশের গণতান্ত্রিক পক্রিয়াকে সুসংহত করার জন্যও সহায়ক। রায়ের পর্যবেক্ষণে কোন অপ্রাসঙ্গিক বিষয় থেকে থাকলে সে সম্পর্কে মতামত বা সমালোচনার অধিকার জনগণের রয়েছে। আদালতও তা চান বলে একাধিকবার উল্লেখ করেছেন। তবে তা যেন ভাষা ও ভঙ্গিতে হয় শালীনতাপূর্ণ এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাভিত্তিক। সে পথ অনুসরণ না করে এবং সংক্ষুব্ধতা প্রকাশের আইনানুগ পন্থা অবলম্বন না করে আদালতকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেয়া কিংবা রায়কে পুঁজি করে কোন কোন মহলের সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা- এ সবই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসনের পরিপন্থী।”
বিবৃতিতে বলা হয়, মনে রাখতে হবে, জনগণের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে আদালতই সর্বশেষ ভরসাস্থল, সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে আদালতকে কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করানো কিংবা তাকে দুর্বল করার চেষ্টা দেশের স্বার্থে কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। এই ধরণের কার্যকলাপ আমাদের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং দেশের গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার জন্য কোন কল্যাণ বয়ে আনবে না। বরং তা আমাদের গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং সাংবিধানিক পন্থায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও কায়েম রাখার সকল প্রয়াসকে ক্ষমাহীন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রতি তাই শ্রদ্ধাশীল হয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে গণতান্ত্রিক, মার্জিত ও শিষ্টাচারসম্মত আচরণ প্রদর্শনের দৃষ্টান্ত স্থাপনের আহ্বান জানান হয় এ বিবৃতিতে।
এ ব্যাপারে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অতীতের মতো প্রজ্ঞার পরিচয় দেবেন সেই আশা করেন বিবৃতি দাতারা। তারা বলেন, বিচার বিভাগকে দুর্বল করে দলীয় স্বার্থ কিংবা সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টার মধ্যে কোন গৌরব প্রতিষ্ঠা পায় বলে আমরা বিশ্বাস করি না, বরং তার পরিণাম হবে আত্মঘাতী। তাই জাতীয় স্বার্থকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের মর্যাদাহানি ঘটে এমন বক্তব্য প্রদান বা অবস্থান গ্রহণ থেকে বিরত থাকার জন্য আমরা আবারো সংশ্লিষ্ট সকলকে বিনীতভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।”
যৌথ বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করেছেন তারা হলেন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, মানবাধিকার কর্মী ও নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির, টিআইবি’র ড. নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, আইন ও সালিশ কেন্দ্র’র নির্বাহী পরিচালক শিপা হাফিজা, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট’র সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, এএলআরডি’র মানবাধিকার কর্মী ও নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএম আকাশ, রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ (রিইব)’র নির্বাহী পরিচালক ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা, ব্লাস্ট’র আইনজীবী ও অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, এস.এম. রেজাউল করিম ব্লাস্ট’র পরিচালক, মানবাধিকার কর্মী মুক্তাশ্রী চাকমা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button