সমুদ্রের সঙ্গে মনপুরার জেলেদের জীবনযাত্রা : দিন কাটে দুঃখ কষ্টে

ভোলার রুপালী দ্বিপ মনপুরার ৭০ ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য সম্পদের উপর নির্ভরশীল। ইলিশের মৌসুম আসার আগ দিয়ে এই অঞ্চলে শুরু হয়ে যায় জাল, নৌকা ও ট্রলার বানানোর হিড়িক। এখানকার জেলেরা অত্যন্ত গরীব। জাল, নৌকা বা ট্রলার বানানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য অধিকাংশ জেলের বা মাঝির নেই। তারা বাধ্য হয়ে মহাজন বা আড়তদারদের নিকট থেকে নগদ টাকা দাদন নিয়ে জাল বা ট্রলার তৈরি করেন। কমিশনের আশায় আড়তদার জেলে মাঝি , নৌকা বা ট্রলার মালিকদের দাদন দিয়ে থাকেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জেলেরা মেঘনায় বা সাগরে ইলিশ মাছ শিকার করতে যায়। সমুদ্রের সঙ্গে জেলেদের নিবিড় সম্পর্ক থাকে।
মাঝিদের সঙ্গে আড়তদারদের চুক্তি
চুক্তি থাকে যেসব নৌকা বা ট্রলার মালিক আড়তদারদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে মাছ শিকার করে সেসব নৌকা বা ট্রলারের মাছ সেই আড়তদারদের কাছেই বিক্রি করতে হবে। দাদন দেয়া আড়তদার ছাড়া অন্য কারো কাছেই বিক্রি করতে পারবেনা। জেলেরা রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে দিনরাত মেঘনায় বা সাগরে মাছ শিকার করে । জেলেরা মাছ শিকার করে দাদন ব্যবসায়ীদের মৎস্য আড়তে মাছ বিক্রির জন্য আসেন। তখন ডাকে যত টাকার মাছ বিক্রি হয় তত টাকার বিক্রির উপর আড়তদার শতকরা ১০-১৫ টাকা হারে কমিশন পায়। কিন্তু এতে জেলেদের দাদন পরিমাণ কমে না। জেলেদের দাদন দেওয়ার কারণে বাধ্য হয়ে জেলেরা আড়তদারদের কাছে মাছ বিক্রি করতে হয়। সেই সঙ্গে তাকে গুনতে হয় কমিশন। মেঘনায় মাছের আকাল থকলেও আড়তদারদের কমিশন বন্ধ হয়না।
জেলে পেশায় জড়িত
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অধিকাংশ মানুষ জেলে পেশায় জড়িত। বিশেষ করে জেলে পরিবারের অধিকাংশ ছেলে ৮-১০ বছর বয়সে সংসারের অভাবের তাড়নায় এ কাজে জড়িয়ে পড়েন। পিতা মাতা ছেলেদের মাছ ধরার কাজে উৎসাহিত করেন। এতে দেখা যায় জেলে পরিবারের অধিকাংশ ছেলে স্কুল পড়াশুনা বাদ দিয়ে মেঘনায় মাছ শিকার করে। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত জেলে পরিবারের মধ্যে দেখা যায় একজন জেলের আয়ের উপর ৭-৮ জনের সংসার চলে।
ঝুঁকি নিয়ে মাছ শিকার
সংসারের অভাবের তাড়নায় পরিবারের ভরণ- পোষণ জোগার করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মেঘনায় বা সাগরে ইলিশ মাছ ধরতে যায় জেলেরা। ঝড় জলোচ্ছ্বাস কিছুই তাদের আটকে রাখতে পারেনা। ছেলে সন্তানের দিক তাকিয়ে জীবন বাজি রেখে সাগরে মাছ ধরতে যায়। আবার ফিরে আসবে কিনা তাও তারা জানেনা। অনেক জেলেকে আবার সাগরে প্রাণ দিতেও দেখা গেছে। প্রতিবছর সাগরে ইলিশ মাছ ধরতে গিয়ে জেলের প্রাণ যাচ্ছে। জলদস্যুদের তাণ্ডবে জেলেরা মাছ শিকার করতে সাহস পাচ্ছেনা। জলদস্যুদের গুলিতে অনেক জেলের প্রাণ দিতেও দেখা গেছে। তবুও থেমে নেই জেলেরা।
কিভাবে যায় সাগরে
সাগরে মাছ ধরার জন্য প্রতিটি ফিশিং বোটে ১৫-২০ জন জেলে থাকে। ১ জন সারেং থাকেন। তার নির্দেশনায় সাগরে চলতে হয়। সাগরে যাওয়ার জন্য প্রতিটি ফিশিং বোটে ১০-১৫ দিনের খাবার সামগ্রী, তৈল ও প্রয়োজনীয় বরফ ভর্তি করে সাগরে ইলিশ মাছ ধরার জন্য যায়। তিনদিন একটানা সাগরে দিকে ফিশিং বোট চালানোর পর অথৈই সাগরে গিয়ে তারা ইলিশ জাল ফেলে। সেখান থেকে তারা আবার ফিরে আসতে পারবে কিনা সেটা তারা জানেনা। তারা সাগরে রান্না-বান্না করে খায়। যতদিন পর্যন্ত তাদের বোটে মাছ ভর্তি না হয় ততদিন পর্যন্ত তারা সাগরে থাকেন। তারা সাগরে ১ থেকে দেড় লক্ষ টাকার মালামাল নিয়ে যান। এভাবে তারা ১০-১৫ দিন সাগরে মাছ ধরেন। মাছ ভর্তি করে তারা চলে আসেন । প্রতি বোটে ৩ থেকে ৪ কাউন (প্রতি কাউন ২০ পণ) মাছ থাকে। এই মাছ বিক্রি করেন আড়তদারের গদিঘরে। ৫ থেকে ৬ লক্ষ টাকার মাছ বিক্রি করলে খরচ বাদে তাদের ৩ থেকে ৪ লক্ষ টাকা থাকে। পরে এই টাকা সব ভাগিরা ভাগ করে নিয়ে যায়।

জনতা বাজার মেঘনা পাড়ে কথা হয় আকতার ,খলির, হারুন ও নুরুলইসলামসহ কয়েকজন সারেং এর সাথে , তারা বলেন আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যাই। আবার ফিরে আসব কিনা তাও জানিনা। জীবন বাজি রেখে সাগরে মাছ ধরি। ঝড়, বন্যা, জলদস্যু সব উপেক্ষা করে পরিবারের ভরণ-পোষণ জোগাড় করতে সাগরে মাছ ধরতে যাই। সেই মাছ আমরা দাদন নেওয়া আড়তদারের কাছে বিক্রি করি। যা পাই তা দিয়ে সংসার চালাই। আমরা গরীব মানুষ তাই বাধ্য হয়ে আড়তদারের কাছ থেকে দাদন নেই। সাগরে মাছ ধরতে একটি ফিশিং বোটে ২০-২৫ লক্ষ টাকার চালান লাগে। এত টাকা আমরা পাবো কোথায় ? বাড়ীতে ছেলে-মেয়েরা চিন্তায় থকেন। কখন মাছ ধরে বাড়ী ফিরে আসব।
উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের জনতা বাজার মৎস্য ঘাটে কথা হয় মৃত আলাউদ্দিন চৌকিদারের ১৩ বছরের শিশু মো. শাকিলের সাথে। শাকিল বলেন, আমার বয়স যখন ৬ বছর তখন আমার বাবা (ঠাডা)বজ্রপাতে মারা যান। আংগো সংসারে আমি বড়। মা ও বোনদের খাওয়ানের মত আর কেউ নাই। কেন স্কুল ছেড়ে মেঘনায় ইলিশ ধরতে যাও প্রশ্ন করলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বলেন, আর আয়ের উপর ৪জনের সংসার চলে। আমিই সংসারে বড়। সংসারে আর ছোট ২টি বোন আছে। এক বোন এয়ার খান সরকারী প্রাথমিক স্কুলে লেখাপড়া করে। আই নদীতে মাছ না ধরলে মা, বোনকে খাওয়াবে কে ? এইভাবে অভাবের সংসার চলে মনপুরা হতদরিদ্র জেলে পরিবারের লোকজনের।
কেমন চলে জেলে পরিবার
দুঃখ ও কষ্টের মধ্যে দিয়ে চলে জেলে পরিবারের জীবন। নদীতে মাছ পড়লে সংসারটা একটু ভালোভাবে চলে। ছেলে সন্তান নিয়ে পরিবারের লোকজন একটু স্বস্তিতে থাকেন। মাছ না পড়লে খুব কষ্টের মধ্যে থাকেন ছেলে সন্তান নিয়ে জেলে পরিবার। অনেক সময় উপোষ থাকতে হয়। দায় দেনা পরিশোধের জন্য চিন্তা করতে হয় পরিবারকে।
কথা হয় হাজির হাট ইউনিয়নের চরযতিন গ্রামের ২নং ওয়ার্ডের জেলে আব্বাসের স্ত্রী ইয়াছনুর বেগমের সাথে। রাস্তার পাশেই অন্যের পুকুরপাড়ে একটি ছোট ছনের ঘর উঠিয়ে কোন মতে ছেলে সন্তান শ্বশুর শাশুড়ির নিয়ে বসবাস করছেন। পাশে বসে আছেন পাশের বাড়ীর তাসলিমা বেগমসহ ছোট ছোট শিশুরা । জিঙ্গেস করলাম কেমন আছেন ? বললেন কেমন আর থাকমু। নদীতে তেমন মাছ নেই । পোলানগুলো নিয়ে খুব কষ্টের মধ্যে আছি। আর স্বামী নদীতে মাছ ধরতে গেছে। মাছ পেলে হেই মাছ বিক্রি করে আংগোর জন্য দুপুরের চাল ডাল আনবেন। তারপর রান্না করমু। না আনলে উয়াস থাকমু। আমরা খুব কষ্টের মধ্যে আছি। আংগো কষ্ট কেউ বুঝেনা। দেনা করতে করতে সবই হারাইছি। দেনাদারেরা প্রতিদিন বাড়ীতে আইয়ে। মাছ না পাইলে আমরা দেনা দিমু কিভাবে।
ইলিশ মাছের দর
হাজির হাট ঘাটের আড়তদার নিজামউদ্দিন হাওলাদার ও রামনেওয়াজ ঘাটের আড়তদার মো. মোশারেফ হোসেন জানান, মেঘনায় তেমন একটা মাছ পাওয়া যাচ্ছেনা। ভরা মৌসুমেও তেমন একটা মাছের দেখা মিলছেনা। আমরা খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে অছি। জেলেরাও তেমন একটা ভালো নেই। আমরা জেলেদের লক্ষ লক্ষ টাকা দাদন দিয়েছি। নদীতে মাছ না থাকার কারণে জেলেদের পাশাপাশি আমরাও তেমন একটা ভালো অবস্থানে নেই।
সরজমিনে জনতা বাজার, হাজির হাট ও রামনেওয়াজ মৎস্য আড়তে গিয়ে দেখা যায়, এসব মৎস্য ঘাটে প্রতি ১ হালি(৪টা) প্রতিটির ওজন ১ কেজি থেকে ১ কেজি ২শত গ্রাম হলে আড়তে বিক্রি হয় ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা, প্রতিটির ওজন ৮শ গ্রাম থেকে ৯শ গ্রাম হলে প্রতি হালি(৪টা) বিক্রি হয় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা , এবং প্রতিটির ওজন ৫শ থেকে ৬শ গ্রাম হলে প্রতি হালি(৪টা) বিক্রি হয় ১ হাজার ৫শত থেকে ২ হাজার টাকার মধ্যে।
এসব আড়তদার মাছ ক্রয় করে ঢাকার আড়তে বিক্রি করেন। এসব আড়তদারেরা ঢাকার আড়ত দারের কাছ থেকে মোটা অংকের দাদন নিয়ে থাকেন। ঢাকার আড়তদারেরাও একটি নিদিষ্ট হারে কমিশন পেয়ে থাকেন।
কিভাবে ইলিশ ঢাকায় যায়
প্রতিদিন জেলেরা উপজেলার বিভিন্ন মৎস্য আড়তে মেঘনা থেকে ধরে আনা ইলিশ আড়তদারের কাছে বিক্রি করেন। আড়তদারেরা প্রতিদিন ইলিশ মাছ ঝুড়ি করে ঝুড়ির মধ্যে বরফ দিয়ে প্যাকেট করে রামনেওয়াজ ঘাট দিয়ে লঞ্চে ঢাকায় পাঠানো হয়। পরে ঢাকার বিভিন্ন আড়ত কাওরান বাজার, ঢাকার লঞ্চঘাট, যাত্রাবাড়ী, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন আড়তে ইলিশ মাছ বিক্রি হয়।
মেঘনায় নদীতে মাছ না পড়লে জেলেরা খুব কষ্টের মধ্যে থাকেন। পরিবারের ভরণ- পোষণ জোগাড় করতে হিমশিম ক্ষেতে হয় । জেলেদের নেই কোন নিজস্ব জায়গা বা ফসলি জমি। তারা শুধু মেঘনায় ইলিশ শিকারের উপর নির্ভরশীল। মৎস্য মৌসুম ছাড়া বাকি সময় জেলেরা অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়ে।
ইত্তেফাক



