শিরোনামশীর্ষ সংবাদ

টানা বর্ষণে চট্টগ্রামের জীবনযাত্রা অচল

সক্রিয় মওসুমি বায়ুর প্রভাবে ভারী বর্ষণে পানিতে তলিয়ে গেছে দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জসহ চট্টগ্রামের বেশির ভাগ এলাকা। এক দিকে ভারী বর্ষণ অন্য দিকে জোয়ারের পানিতে নগরীর বিস্তীর্ণ সড়ক, অলিগলি, দোকানপাট ও নিচতলার বাসাবাড়ি। ভারী বৃষ্টিপাত ও সাগরের জোয়ারে পানিময় চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে। স্থবিরতা দেখা দেয় চট্টগ্রাম বন্দর বহিঃনোঙরে পণ্য লোডিং-আনলোডিংয়ে। এ সময় জীবিকার তাড়নায় বের হওয়া মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছতে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস গতকাল সোমবার বেলা ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ১৪৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। আবহাওয়ার সতর্ক বার্তায় বলা হয়েছে, সক্রিয় মওসুমি বায়ুর প্রভাবে গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধসেরও সম্ভাবনা রয়েছে।
মওসুমি বায়ুর প্রভাবে রাতভর ভারী বর্ষণ অব্যাহত ছিল। ফলে বৃষ্টিপাত ও জোয়ারের পানিতে সয়লাব হয়েছে বন্দর নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা। দেশের প্রধান পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই, নগরীর আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, বেপারি পাড়া, আগ্রাবাদ সিডিএ, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, চান্দগাঁও, জিইসি মোড়, বাকলিয়া চকবাজার, বাদুরতলা, প্রবর্তক মোড়, হালিশহর, কাতালগঞ্জ, ষোলশহর ২ নম্বর গেট, নাছিরাবাদ শিল্পাঞ্চল, কালুরঘাট ভারী শিল্প এলাকাসহ বিস্তীর্ণ নগর হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যায়।
এ সময় দীর্ঘণ পানি আটকে থাকায় সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বিভিন্ন বাজার, দোকানপাট ও নিচতলার বাসাবাড়ি নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।
পানিবন্দী অবস্থায় চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়। কোথাও কোথাও সড়কে জমে থাকা পানিতে বাস-অটোরিকশাসহ যানবাহন আটকে গিয়ে ভোগান্তি আরো চরম আকার ধারণ করে। বৃষ্টিপাতের কারণে বেশির ভাগ শিাপ্রতিষ্ঠানে শিার্থীদের উপস্থিতি ছিল একেবারেই নগণ্য।
ভারী বর্ষণের সতর্কবাণী : সক্রিয় মওসুমি বায়ুর প্রভাবে গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।
ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধসের সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া রংপুর, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং সিলেট অঞ্চলের ওপর দিয়ে দণি/দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫-৬০ কিমি. বেগে বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টিসহ অস্থায়ীভাবে দমকা/ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এসব এলাকার নদীবন্দরকে ১ নম্বর সতর্ক সঙ্কেত দেখাতে বলা হয়েছে।
চট্টগ্রামে ড্রেনে পড়ে সরকারি কর্মকর্তার মৃত্যু : নগরীতে ড্রেনে পড়ে পানির স্রোতে তলিয়ে যাওয়া শীলব্রত বড়ুয়া স্বপন (৬৪) নামে সাবেক এক সরকারি কর্মকর্তার মৃত্যু হয়েছে। গতকাল দুপুরে তার লাশ পাওয়া গেছে নগরীর মিয়াখাননগর এলাকায় চাক্তাই খালে। গত রোববার রাতে নগরীর দামপাড়া এলাকায় ড্রেনে পড়ে গিয়ে তিনি নিখোঁজ হন। পানির স্রোতে তার লাশ ভেসে অন্তত ছয় কিলোমিটার দূরে চাক্তাই খালে চলে যায় বলে জানায় পুলিশ।
মৃত শীলব্রত বড়ুয়ার ছেলে শান্তু বড়ুয়া জানান, তার বাবা কাউখালী উপজেলার হিসাব রণ কর্মকর্তা হিসেবে দুই বছর আগে অবসরে যান। তাদের বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। রোববার রাতে তিনি পরিবারের সদস্যদের সাথে আত্মীয়ের বিয়ে খেতে নগরীর এম এম আলী রোডের রয়েল গার্ডেন কমিউনিটি সেন্টারে আসেন। রাত সাড়ে ১১টায় কমিউনিটি সেন্টার থেকে বেরিয়ে রাস্তায় থাকা বাসে উঠতে গিয়ে নালায় পড়ে যান। এর পর অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তাকে পাওয়া যায়নি।
বাকলিয়া থানার ওসি প্রণব কুমার চৌধুরী বলেন, মোহাম্মদ আলী রোডে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমিসংলগ্ন রয়েল গার্ডেন কমিউনিটি সেন্টারের পাশে বড় একটি নালায় পা পিছলে পড়ে যান শীলব্রত।
ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন জানান, রোববার রাতে ও সোমবার ভোরে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক টিমের ডুবুরিরা শীলব্রত বড়ুয়ার খোঁজে তল্লাশি চালায়। বেলা পৌনে ১১টায় মিয়াখান নগর এলাকার চাক্তাই খালে তার লাশ ভেসে ওঠে।
আলীকদম (বান্দরবান) সংবাদদাতা জানান, দুই দিনের অব্যাহত ভারী বর্ষণে বান্দরবানের আলীকদমে উপজেলায় পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। আলীকদম-লামা-ফাঁসিয়াখালী সড়কের কয়েকটি পয়েন্টে পানি ঢুকে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। পানির নিচে রয়েছে কয়েক শ’ বাড়িঘর। পানিবন্দী রয়েছে হাজারো মানুষ।
গতকাল সোমবার বিকেলে সরেজমিন পরিদর্শনে মাতামুহুরী নদী তীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যাপরিস্থিতি দেখা গেছে। নয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফোগ্যা মার্মা জানান, বন্যায় তার ইউনিয়নসহ উপজেলার মংচা পাড়া, রোয়াম্ভু, বশির কারবারী পাড়া, যোগেন্দ্র পাড়া, মোস্তাক পাড়া, রেপার পাড়া বাজার পাড়া, ছাবের মিয়া পাড়া, আমতলীর চরসহ বেশ কিছু এলাকায় কয়েক শ’ ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। প্রায় দুই হাজারেরও বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়েছে।
উপজেলা পরিষদের আশপাশের রাস্তায় পানি ঢুকে পড়েছে। রোববার থেকে অব্যাহত বর্ষণে পানি বেড়েছে মাতামুহুরী নদীতে। পাশাপাশি বিভিন্ন খাল ও ঝিরিতে পানি টইটম্বুর। এতে পানিতে তলিয়ে গেছে নদীর তীরবর্তী ও নিচু এলাকার শত শত বাড়িঘর।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: নায়িরুজ্জামান বলেন, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের পূর্ব থেকেই বলা আছে যে, বন্যাপরিস্থিতির অবনতি হলে সাথে সাথে বন্যার্থদের যেন নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়। প্রয়োজনে বিদ্যালয়গুলো খুলে দেয়া হবে। এ ছাড়া বন্যাপরবর্তী চেয়ারম্যানদের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য ত্রাণ ও অর্থ চাহিদা করা হবে। সুত্র : নয়া দিগন্ত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button