রতন ঘোষ, কটিয়াদী প্রতিনিধি: হাটের চারিদিকে শুধুই ঢাকিদের মহড়া। কোথাও ঢাকের আওয়াজ, কোথাও ঢাকের তালের সঙ্গে মিশেছে ঢোল, সানাই,বাঁশিরসুর। নানা বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত সুরে,ভিন্ন রকম উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে এই হাটে। স্থানীয় ভাবে এই ব্যতিক্রমী হাটের নাম “ঢাকের হাট”।প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে বসে এই হাট। বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই হাট শেষ হবে শুক্রবার সন্ধ্যায়।
কথিত আছে ষোড়শ শতাব্দীতে স্থানীয় সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় তার রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন । উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের চাড়িপাড়া গ্রামে ছিল ওই রাজার প্রাসাদ। তখন পূজায় ঢাক ঢোল বাঁঁশিসহ সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে অংশ নিতে বিক্রমপুরে (মুন্সিগঞ্জ) বাদ্যকরদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই সময়ের নৌপথে অসংখ্য ঢাকি ও বাদক দল আসেন পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে উপজেলার মসুয়া ইউনিয়নের যাত্রাঘাট নামক স্থানে। তারপর রাজা নিজে সবার বাজনা শুনে বেছে নেন সেরা দলটিকে। সেই থেকেই এখানে ঢাকের হাট শুরু। পরবর্তীতে পূজার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে, তখন বিভিন্ন জমিদারদের মধ্যে ঢাকের হাটের স্থান নির্ধারণ নিয়ে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। অবশেষে যাত্রা ঘাট থেকে স্থান পরিবর্তন করে কটিয়াদী পুরাতন বাজারে গড়ে ওঠে ঐতিহ্যবাহী এই ঢাকের হাট। স্থানীয়দের বক্তব্য থেকে জানা যায়, প্রায় পাঁচশত বছর ধরে চলে আসা এটি কেবল হাট নয়, হয়ে গেছে এই অঞ্চলের সংস্কৃতির অংশ ও। জানা যায় ঢাক ছাড়া হিন্দুদের দুর্গাপূজা অসম্পূর্ণ থাকে এবং ঢাক ছাড়া পূজা কল্পনাই করা যায় না। মহাষষ্ঠী থেকে বিসর্জন সর্বক্ষেত্রেই চাই ঢাকের আওয়াজ। তাই পূজার সময় ঢাক -ঢোলের কদর বেড়ে যায়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে জীবিকার টানে ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, গাজীপুর সুনামগঞ্জ সহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকি ও বাদ্য বাদকরা আসেন এই হাটে। পাশাপাশি তাদের ভাড়া করে নিয়ে যেতে, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে, পূজার আয়োজকরা আসেন এই হাটে।
যদিও নামে ঢাকের হাট হলেও এখানে ঢাক বা বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। বাদ্যযন্ত্র, বাদকেরা অর্থের বিনিময়ে কেবল পূজা চলাকালীন বাজানোর জন্য পূজা আয়োজকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। কার চুক্তির মূল্য কত হবে, তা নির্ধারণ হয় বাদ্যবাদকদের দক্ষতার উপর। সাধারণত ২০ হাজার টাকা থেকে লাখ টাকার উপরে ও নির্ধারিত হয় তাদের চুক্তি মূল্য। ১৪ অক্টোবর বিকেল থেকে ঢাক আসা শুরু হয়। ১৫ অক্টোবর সরজমিনে দেখা যায় দুর্গাপূজার আগেই ঢাকেরহাটে উৎসবের সুর। শতশত বাদ্যযন্ত্রের বোল আর সুরে মুখরিত হয়ে উঠেছে আকাশ বাতাস। এই হাটে বাদ্য বাদকেরা একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঢাক-ঢোল, ড্রাম, বাঁশি, সানাই, ঝনঝনি সহ বাহারি বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছেন। বাদ্যের তালে তালে চলছে সুরেলা লড়াই। আর পূজা আয়োজকরা যাচাই করে দেখছেন, সঙ্গে চলছে দরদামও।
দোহার নবাবগঞ্জ থেকে তিনজনের একটি বাদক দলের নেতা হয়ে হাটে গেছেন বিনয় রায়। তিনি জানান এবার পূজার আয়োজন বেশি হওয়ায় বাদক দলের চাহিদা ও বেড়েছে। কেউ কেউ তার দলের পারিশ্রমিক ৫০ হাজার টাকা বলেছেন। তবে তারা ৮০/৯০ হাজার টাকার কমে যাবেন না বলে তিনি জানালেন । কথা হলো আরো একজন বাদক দলের নেতার সাথে, যিনি কিশোরগঞ্জ সদর থেকে মোহাম্মদ রুকন। তিনি ঢাক ঢোল সহ সাত জনের একটি দল নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন এটি তার মূল পেশা না। শখ আর বাড়তি আয়ের জন্য তিনি এসব করেন। নরসিংদি মনোহরদী থেকে আটজনের একটি বাদক দলের নেতা ফারুক মিয়া জানান এক যুগ ধরে তারা এই হাটে আসেন। তার দলের পারিশ্রমিক কেউ কেউ এক লক্ষ টাকা বলেছেন। তবে তারা দেড় লাখ টাকার কমে যাবেন না বলে জানালেন।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া থেকে বাদক দল বায়না করতে এসেছেন উৎপল কুমার। তিনি বলেন এই হাটে শত শত ঢাকি ও বাদকদের একসঙ্গে পাওয়া যায়। বাড়তি পাওনা হিসেবে আমরা এখান থেকে বাজনা পরখ করে নিতে পারি। এই হাট থেকে প্রতিবছরই ঢাক-ঢোল বায়না করে নিয়ে যাই। এবারও এসেছি । এই হাট চলবে ১৬ অক্টোবর শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত।
উল্লেখযোগ্য যে এখানে ঢাকিদের আবাসন ব্যবস্থা আজও অসমাপ্ত অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে এখানে বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক হাট বসে। যে কারণে ঢাকিদের পুরাতন বাজার থেকে চলে আসতে হয় পার্শ্ববর্তী শ্রীশ্রী লক্ষী নারায়ন জীওর আখড়া প্রাঙ্গন সহ প্রয়াত রামদয়াল ঘোষ মহাশয়ের বাড়ির প্রাঙ্গনে।
এ ব্যাপারে কিশোরগঞ্জ-২ সংসদীয় আসনে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন বলেন, এই ঢাকের হাটটি কটিয়াদীর একটি ঐতিহ্যবাহী হাট। আমরা দ্রুতই ঢাকের হাটের আবাসনের অসমাপ্ত কাজ শীঘ্রই সম্পন্ন করব। তবে ঢাকের হাটের ঢাকিদের একটি মানসম্মত টয়লেট নির্মাণের জন্য সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গ্রামীন অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার কর্মসূচির আওতায় টেস্ট বিলিফের খাত থেকে এক লক্ষ্ ২০ হাজার টাকার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, ঢাকির হাটের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাছাড়া ঢাকিদের আবাসনের অসমাপ্ত কাজ দ্রুতই সম্পন্ন করা হবে।