sliderস্থানিয়

নলছিটি পৌরসভায় অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

মো: শাহাদাত হোসেন মনু ঝালকাঠি: ঝালকাঠির নলছিটি পৌরসভায় গত এক দশকে রাজস্ব, উন্নয়ন বরাদ্দ ও বিভিন্ন প্রকল্পে অন্তত ৩০ কোটি টাকার অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মিজানুজ্জামানের বিরুদ্ধে এসব অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে তার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাবেক দুই কাউন্সিলর।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) নলছিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক কাউন্সিলর মো. এনায়েত করিম মিশু ও সরোয়ার হোসেন তালুকদার এসব অভিযোগ করেন। সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দ, ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারা সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং মাঠপর্যায়ে তদন্তের দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০১৭-১৮, ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাওয়া বিভিন্ন নথিপত্র পর্যালোচনা করে পৌরসভার বিভিন্ন খাতে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের দাবি, গত এক দশকে রাজস্ব ও উন্নয়ন বরাদ্দসহ বিভিন্ন খাতে অন্তত ৩০ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে।

সম্প্রতি সিটিসিআরপি প্রকল্পের আওতায় চারটি রাস্তা নির্মাণে ১০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে দরপত্র আহ্বান করা হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়। ২০২৬ সালের মার্চে দরপত্র আহ্বানের পর ছয় মাসেও সিদ্ধান্ত না হওয়ায় ঠিকাদাররা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গু মশক নিধনে ৩১ লাখ ৩ হাজার টাকা এবং করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এছাড়া কবরস্থান সংস্কারসহ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন খাতে প্রায় ৭ কোটি ৫১ লাখ টাকার বেশি বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তব কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তারা।

এদিকে ২০২০-২১ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ১৩টি প্যাকেজে প্রায় ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকার কাজের অধিকাংশেরও বাস্তব অস্তিত্ব নেই বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়।

জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিলের প্রায় ২ কোটি টাকা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়। সংবাদ সম্মেলনকারীদের দাবি, ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১১৯টি সোলার স্ট্রিট লাইট ও ৫০টি গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হলেও এসব প্রকল্পের অধিকাংশের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কিছু পরিত্যক্ত সড়কবাতিতে অন্য প্রকল্পের স্টিকারের ওপর জলবায়ু ট্রাস্টের স্টিকার লাগানোর অভিযোগও করেন তারা।

সবচেয়ে বড় অভিযোগ তোলা হয় গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২ নিয়ে। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, প্রকল্পটির ১২টি প্যাকেজে ৯ কোটি ৯২ লাখ ১৫ হাজার ৫৯৪ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। কাগজপত্রে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা উত্তোলন করা হলেও সরেজমিনে রাস্তাগুলোর ২০ শতাংশ কাজও সম্পন্ন হয়নি বলে দাবি করেন তারা।

প্রকল্পের আটটি রাস্তা অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে এবং সেগুলো বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়।

এছাড়া প্রকল্প-সংক্রান্ত ফাইলপত্র, মেজারমেন্ট বুক, চেক রেজিস্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষিত নেই বলে দাবি করা হয়। বিভিন্ন নথিতে প্রায় ৬ কোটি টাকার বিলের হিসাব পাওয়া গেলেও আরও প্রায় ৩ কোটি টাকার সুস্পষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন সংবাদ সম্মেলনকারীরা।

নলছিটি পৌরসভার রাজস্ব তহবিল নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করা হয়। তাদের দাবি, প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের তথ্য থাকলেও ওই অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব পাওয়া যায়নি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উন্নয়নকাজ না হলেও তহবিলে থাকা ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকার হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, এসব অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন সময় দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ ও তদন্তের মধ্যেই বিষয়গুলো সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে দাবি করেন সংবাদ সম্মেলনকারীরা।

সাবেক কাউন্সিলর মো. এনায়েত করিম মিশু ও সরোয়ার হোসেন তালুকদার বলেন, সরকারি বরাদ্দের অর্থে পৌরবাসীর জীবনমান উন্নত হওয়ার কথা থাকলেও অনিয়মের কারণে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু হিসাব এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button