sliderস্থানিয়

২ কোটি ৮৪ লাখ টাকার সেতু ঝুলে আছে পাঁচ বছর, চরম দুর্ভোগে ২০ হাজার মানুষ

মোঃ জাফর আহমেদ কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা: ১১ জুলাই শনিবার কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের খোচাবাড়ী তালেরতল এলাকায় নির্মাণাধীন ৪২ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু যেন উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতির এক নির্মম প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে তিন বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও সেতুর নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। ফলে প্রায় ২০ হাজার মানুষ প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ড্রামের ভেলায় ছড়া পারাপার করতে বাধ্য হচ্ছেন। শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য, ধর্মীয় কর্মকাণ্ডসহ জনজীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘসূত্রতা ও দায়িত্বহীনতার কারণে বছরের পর বছর ধরে তারা চরম দুর্ভোগের শিকার হলেও সংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় অতিরিক্ত স্রোতের কারণে তালেরতল এলাকার পুরোনো সেতুটি ভেঙে পড়ে। একই সঙ্গে সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ফলে কয়েকটি গ্রামের মানুষের সঙ্গে উপজেলা সদরের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সে সময় এলাকাবাসীর চলাচলের জন্য অস্থায়ীভাবে দড়ি ও কাঠের সাঁকোর ব্যবস্থা করা হয়। পরে ২০১৯ সালের বন্যায় সেতুর দুই পাশের মাটিও আবার ভেঙে যায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২১ সালে নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হলেও আজও তা সম্পন্ন হয়নি।

স্থানীয় প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২১ সালের ১৯ এপ্রিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে এবং ২০২২ সালের ১৮ এপ্রিলের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার তিন বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও প্রকল্পটি এখনো অসমাপ্ত রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, তিনটি স্প্যানের মধ্যে মাত্র একটি স্প্যানের ডেক (স্ল্যাব) নির্মাণ শেষ হয়েছে। বাকি দুটি স্প্যানের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। নির্মাণসামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও শ্রমিকদের উপস্থিতি ছিল খুবই সীমিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সংখ্যক শ্রমিক নিয়োগ না দিয়ে মাত্র ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। ফলে নির্মাণকাজের অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। তাদের দাবি, পর্যাপ্ত জনবল, যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করে দ্রুত সেতুর কাজ সম্পন্ন করা হোক।
সেতু নির্মাণ শেষ না হওয়ায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ, রোগী ও শিক্ষার্থীসহ শত শত মানুষ প্রতিদিন পাশের অস্থায়ী ড্রামের ভেলায় ঝুঁকি নিয়ে ছড়া পারাপার করছেন। বর্ষা মৌসুমে পানির স্রোত বেড়ে গেলে ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়। প্রায়ই ভেলা উল্টে মানুষ পানিতে পড়ে যায়। অনেক সময় শিক্ষার্থী, নারী ও বৃদ্ধরা আতঙ্কের কারণে পারাপার করতেই সাহস পান না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিকল্প কোনো রাস্তা না থাকায় বসতবাড়ি, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার কিংবা উপজেলা সদরে যেতে হলে এই ছড়া পার হওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। বিকল্প হিসেবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (ওয়াপদা) একটি রক্ষা বাঁধ থাকলেও সেটি অনেক দূরের পথ এবং চলাচলের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। বর্তমানে ওই বাঁধেরও মেরামতকাজ চলায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
কৃষকদের ধান, পাট, ভুট্টাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ছোট ছোট ভেলা বা ড্রামের ভেলায় করে বাড়িতে আনতে হচ্ছে। একইভাবে গবাদিপশুও পারাপার করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিরও মুখোমুখি হচ্ছেন তারা।

স্থানীয় অভিভাবকরা জানান, খোচাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ আশপাশের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছড়া পার হতে হয়। বন্যা, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। অনেক সময় ড্রামের ভেলায় ওঠানামার সময় পানিতে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মতিয়ার সরকার বলেন,
“প্রায় ২০ হাজার মানুষ এই ছড়া পারাপারে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এর প্রভাব শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা ও কৃষিক্ষেত্রে পড়ছে। আমার প্রতিষ্ঠানের ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা বন্যা, ঝড়-বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার সময় ঝুঁকির কারণে নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত হতে পারে না। চার বছর আগে সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হলেও কাজের অগ্রগতি খুবই ধীর। আমরা দ্রুত সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার দাবি জানাচ্ছি।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল মালেক বলেন,
“সেতুর কাজ শুরু হলেও মানুষের পারাপারের জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়নি। তাই ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমি একটি ড্রামের ভেলা তৈরি করেছি। কিন্তু এটি দিয়ে এত মানুষের নিরাপদ পারাপার সম্ভব নয়। ঠিকাদারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোনো ফল পাইনি। উল্টো আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। দ্রুত কাজ শেষ না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
নদীপাড় এলাকার বাসিন্দা রুহুল আমিন সর্দার বলেন,
“প্রায় প্রতিদিনই ড্রামের ভেলায় পারাপারের সময় দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক সময় ভেলা উল্টে মানুষ পানিতে পড়ে যায়। সাইকেল, মোটরসাইকেল, টাকা-পয়সাসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পানিতে ভিজে যায়। গবাদিপশুও ভেলায় করে পারাপার করতে হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঈদের সময় ঈদগাহে যেতেও একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়। প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছড়া পার হতে হচ্ছে।”

এ বিষয়ে ঠিকাদারের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে নির্মাণকাজে দীর্ঘসূত্রতার কারণ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার বহু বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ না হওয়ায় তারা চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন। তাদের দাবি, দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী বাড়িয়ে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি বিলম্বের কারণ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি দ্রুত সম্পন্ন না হলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button