
পতাকা ডেস্ক: শোষন ও লুটপাট করে যারা পালিয়ে যায় দেশের সেসব শত্রুদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ২য় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আজ সকাল ১১ টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে দলের পক্ষ থেকে আয়োজিত আলোচনা সভায় নেতৃবৃন্দ এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই অভ্যুত্থানের সংগঠকগণ বক্তব্য রাখেন। আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য ছিল; “আত্মোপলব্ধি ও আত্মপর্যালোচনায় অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের দীপ্ত শপথ”। সভায় সভাপতিত্ব করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ আলতাফ হোসাইনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী আখতার হোসেন এমপি, জুলাই শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম এমপি, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, শহীদ আরাফাত হোসেনের বড় ভাই হাসান আলী, এবি পার্টির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. আব্দুল ওহাব মিনার, নারী উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক ফারাহ নাজ সাত্তার এবং সাংবাদিক সালাহউদ্দিন লাভলু প্রমূখ।
বক্তব্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফিরে আসার কোনো রাজনৈতিক বাস্তবতা নেই। পৃথিবীর কোনো দেশও তাকে গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়নি। তিনি বলেন, গণভবন দখলের মতো ঘটনা ইতিহাসে বিরল, যা জনগণের চূড়ান্ত অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। তাই বাংলাদেশের জনগণ শেখ হাসিনাকে আর কখনোই গ্রহণ করবে না। তবে এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে। তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও রাজনীতির পরিবর্তন কখনোই রাতারাতি আসে না; পরিবর্তন ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বাংলাদেশও সেই পথেই এগোচ্ছে।
ড. রিপন অভিযোগ করেন, ফ্যাসিবাদী আমলে লুটপাট ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার জন্য আপিল বিভাগকে ব্যবহার করে সেখান থেকে নির্দেশনা আনা হয়েছিল, যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মূলে কুঠারাঘাত। পতিত ফ্যাসিবাদের হাতে আর কখনোই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা কোনো ধরনের অস্ত্র তুলে দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী দলীয় নেতার সমালোচনা করে বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচনের কারচুপির অভিযোগ তুলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও বিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
জামায়াতের এসিসটেন্ট সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, জুলাই জাতির জনআকাঙ্ক্ষার প্রতীক এবং অন্যায় ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিজয়ের নাম। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সেই জনম্যান্ডেট উপেক্ষিত হচ্ছে। তিনি বিচারহীনতার অবসান, মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন এবং জনগণের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার আহ্বান জানান।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, জুলাই সনদের একটি সংস্কারও বাস্তবায়িত হয়নি। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন ছাড়া ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব নয়। মানুষ এখনো জুলাইকে ভুলে যায়নি এবং প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার মধ্য দিয়েই জুলাইয়ের অঙ্গীকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন;
জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি সরকার পতনের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠন, ন্যায়বিচার ও জনগণের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক অঙ্গীকার। দুই বছরের মাথায় জুলাইয়ের পরাজিত শক্তি পরিকল্পিতভাবে জুলাইকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তারা বলে, ‘জুলাই, জুলাই করিস না’ পীঠের চামড়া থাকবেনা, কিন্তু আমরা বলি,জুলাই জুলাই করবো, জুলাই ধারণ করেই মরবো।’ শেখ হাসিনা আসবেওনা, দেশের মানুষ হাসবেওনা বরং শেখ হাসিনা ফাঁসবে, বাংলাদেশ হাসবে।
শহীদ জননী রোকেয়া বেগম এমপি বলেন, সাংবাদিকদের সাহসী ভূমিকা না থাকলে জুলাই আন্দোলন সফল হতো না। শহীদদের আত্মত্যাগের উদ্দেশ্য ছিল ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা; তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আর টালবাহানা চলতে পারে না।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন এমপি বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন জনগণের সর্বস্তরের অংশগ্রহণে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যাবে না। তিনি দাবি করেন, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো থেকে মুক্তির জন্য জনগণের দেওয়া সংস্কারের ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, জুলাইয়ের শক্তিকেই আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণ করতে হবে। যারা গণহত্যা, গুম, আয়নাঘর ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের প্রত্যেকের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। জুলাইয়ের শপথ হলো,কেউ যেন হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পার না পায়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, এই লড়াই শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক ছিল না; এটি ছিল বিচার, সংস্কার ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের আন্দোলন। বাতিল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার অধ্যাদেশগুলো পুনরায় আইনে পরিণত করা, জুলাই জাদুঘর খুলে দেয়া এবং নতুন প্রজন্মের কাছে জুলাইয়ের ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী গণঅভ্যুত্থান। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে হয়নি; দেশের তরুণরাই এর নেতৃত্ব দিয়েছে। জুলাইয়ের অর্জনকে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত করতে হবে, যাতে আর কখনো ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে।
আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূইয়া, অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল মামুন রানা,শ্রম বিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন,সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী নাসির, যুব পার্টির সদস্য সচিব হাদীউজ্জামান খোকন,কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক সফিউল বাশার পাঠাগার ও গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার ফারুক এবং স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক কেফায়েত হোসাইন তানভীর।




